১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর: গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন

১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর দেশের দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একত্র হয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে।  ১০ নভেম্বর (১৯৮৭) স্বৈরাচার বিরোধী নিহত হোন ৪ জন (বাংলাদেশ টাইমস-এ তিনজন)। নূর হোসেন সেই নিহতের মধ্যে একজন। আহত হোন সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মীসহ শতাধিক। শহরের বিভিন্ন জায়গায় বোমা, পুলিশের গুলিতে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। সরকার থেকে প্রেস-নোট দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়; জনগণের জানমাল রক্ষার রক্ষার্থে ও ৪ জনের বেশি সমাবেশের অনুমতি না থাকায় সরকার কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিরোধী দলগুলো ১১ ও ১২ই নভেম্বর সারা দেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করে। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। শহরে বোমাবাজির সাথে সাথে আমেরিকান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে।স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন, ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আরোও ত্বরান্বিত হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

2

3

এরশাদ পদত্যাগ করলে বাংলাদেশে দুটি হ্যাঁ-না ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এতে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর এক বছর পর (১৯৯২) সরকারের পক্ষ থেকে নূর হোসেন এর মৃত্যুর দিনটি সরকারীভাবে উদযাপনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দিনটিকে প্রথমে ঐতিহাসিক “১০ই নভেম্বর দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা হলেও আওয়ামী লীগ এটিকে “শহীদ নূর হোসেন দিবস” করার জন্য সমর্থন প্রদান করে এবং এই নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে।পদত্যাগের পর এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সাথে একত্রে মহাজোট গঠন করে। ১৯৯৬ সালে এরশাদ, নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য জাতীয় সংসদে অফিসিয়াল ভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তার দল জাতীয় পার্টি এখন ১০ই নভেম্বরকে গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করে।

1

স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ৫,৭ ও ৮ দলীয় জোটের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী পালিত হয়। এদিন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে জিপিওর সামনে জিরো পয়েন্টে নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। গুলিতে আরো শহীদ হন যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের ক্ষেতমজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটোও। নূর হোসেন আওয়ামী যুবলীগের কর্মী ছিলেন। নূর হোসেন মিছিলে প্রতিবাদ হিসেবে বুকে পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে নেন: ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ।

shohid-nur-hosain-91

তৎকালীন জাসদের স্থানী কমিটির  মহাসচিব আ স ম আব্দুল রব ১০ নভেম্বরের জন্যে দুই নেত্রীকে দোষারোপ করেন। তিনি অভিযোগ করেন বলেন দুই নেত্রীর জোট ও লক্ষ্যহীন রাজনীতি এর জন্যে দায়ী। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া আন্দোলন সফল হয়েছে বলে বক্তব্য দেন, অন্যদিকে সরকার আন্দোলন ব্যর্থ বলে বক্তব্য প্রচার করেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনা থেকে খালেদা জিয়া এগিয়ে যান। আপোষহীনতার কারণে জনগণের মধ্যে খালেদা জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। ফলে এরশাদের পতনের পর নির্বাচনে খালেদা জিয়া জয় লাভ করেন।

noor_hossain_on_sheikh_hasinas_rally_taged
শেখ হাসিনার গাড়ির পাশে নূর হোসেন

১০ নভেম্বরের ঘটনার পূর্বেই ঢাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছিল। ৮ নভেম্বর কার্জন হলে পুলিশের সাথে স্বৈরাচার বিরোধী কর্মীদের সাথে সংঘর্ষ হয়। পুলিশের একটি ভ্যানও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ১১ নভেম্বর দুই নেত্রীকে সরকার গৃহে অন্তরীয় রাখা হয়। হরতালের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১২ নভেম্বর পুলিশসহ ৩ জন নিহত হোন। এরশাদের সরকার আরো কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেন। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজিতে লিপ্তদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়।

4
১২ নভেম্বর

২০১২ সালে এরশাদ প্রকাশ্যে বলেন “আপনারা আমাকে সরাতে লাশ নিয়ে এসেছিলেন, কারণ আন্দোলন চাঙ্গা করতে এটা দরকার ছিল।” এছাড়া ২০১৪ সালে এরশাদের দাবি করেন, অন্য রাজনৈতিক দলগুলো নূর হোসেনের পরিবারের খোঁজ না রাখলেও তিনি রেখেছেন। তিনি বলেন-“নূর হোসেন মারা গেল, সবাই তাকে স্মরণ করে। কিন্তু তার পরিবারের খোঁজ খবর কি কেউ রেখেছে? আমি রেখেছি। জেল থেকে বের হওয়ার পরই আমি খুঁজে খুঁজে তার বাসা বের করেছি। তার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করেছি, সান্ত্বনা দিয়েছি। প্রতি মাসে আমি নূর হোসেনের বাবাকে পাঁচ হাজার করে টাকা দিয়েছি।”কেবল নূর হোসেন নয়, সেই আন্দোলনের সময় পুলিশের গাড়ি চাপা পড়ে নিহত দেলোয়ারের বাড়িতেও গিয়েছেন বলে দাবি করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। তবে এরশাদের কথা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ খালেদা জিয়া হোসেনের বাবাকে অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নূর হোসেন স্মরণে স্মারক ডাক টিকেট প্রকাশ করেছিলেন। জিরো পয়েন্টের নাম পালটে আনুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ নূর হোসেন চ্বত্তর রেখেছিলেন।।

92477_17450_61021

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ইতিহাসের আরেক শহীদ ডাক্তার মিলন। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে নিহত হোন। ডাক্তার মিলনের স্মরণে ১৯৯৪ সালের ২৭ বাংলাদেশ ডাক বিভাগ শহীদ ডাক্তার শামসুল আলম খান মিলনের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে মাহবুব আকন্দের নকশায় ২ টাকা মূল্যের একটি ডাকটিকিট অবমুক্ত করে।

kobid_164141752550b5ac8bf3b1c4-84564654-jpg_xlarge
২০১৩ সালে ডাক্তার মিলনের স্মরণ সভায় আমন্ত্রণ পাননি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মিলনের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির আয়োজিত স্মরণসভায় সাধারণত প্রধান অতিথি থাকেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে এবারই প্রথম এই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। উল্লেখ্য, সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ নির্বাচনকালীন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। ডাক্তার মিলন হত্যার বিচার সম্পর্কে ডাক্তার মিলনের মা সেলিনা আখতার বলেন-“বিচার চাইতে চাইতে আমি ক্লান্ত। এখন আর বিচার চাই না। আমি জানি বিচার হরে না। স্বৈরাচারের সাথে যারা সরকার গঠন করে, তাদের কাছে বিচার চাওয়া বাতুলতা মাত্র।”

আজকাল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নিহতদের অন্যদের সাথে সাথে এরশাদও শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে। নূর হোসন, ডাক্তার মিলনের রক্ত এরশাদের হাতে লেগে থাকার পরও রাজনৈতিক মাঠে এরশাদ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম দল আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূতে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা কী কখনো ভেবেছে; তাদের রক্তের সাথে বেইমানী করে রাজনৈতিক দলগুলো স্বৈরাচারী এরশাদকে রাজনৈতিক মাঠে এতোটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে?

472255156_3764512463860873_8131573613787660429_n

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.