একদিকে বিশ্বে পাটের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে আমাদের দেশের পাট শিল্পের শ্রমিকদের নাকি ছাটাই করা হবে। বলা হচ্ছে সরকার লস দিচ্ছে অথচ বেসরকারী পাট সংস্থাগুলো কিন্তু ঠিকই লাভ করে যাচ্ছে। সরকারের এই বয়ান শুনে পুরাতন পাটের আলাপ মনে পড়ে গেল। পাট ছিল সোনালী ফসল। আর এই শিল্প ধ্বংস হল কেন এর কারণ ছোট বেলা থেকে জেনে এসেছি; এগুলো সরকারী থাকার কারণে লস হইছে, আর বামপন্থীরা গুদামে আগুন দিত।
সরকারী জিনিস কীভাবে কাদের কারণে ধ্বংস হয় এটা বুঝিয়ে বলতে হয় না। সরকারী প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের নেতাদের কারণে সরকারী হরিলুট সবসময় ছিল। আর এসব আড়াল করতে তৎকালীন বামপন্থীদের ঘাড়ে সব দোষ চাপানো হয়। অথচ পত্রিকার পাতায় বামপন্থীরা আগুন দিছে এমন কিছু পাই নাই। উল্টো শ্রমিকরা বলছে কারখানার উপরের লোকজন এই আগুন দিছে। প্রতিটি আগুন লাগার ঘটনাকে রহস্যজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পত্রিকায় বিভিন্ন কর্মকর্তার গ্রেফতারের সংবাদও ছাপা হইছে।
বিএনপি আদমজী বন্ধ করেছে আওয়ামী লীগ করবে অন্যগুলো। তবে করোনা অনেকের জন্যে আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। করোনার ঘাড়ে ব্যাংক লুট থেকে শুরু করে সব কিছুর দায় দেওয়া যাবে। ৭৪ সালে সব কিছুর মূলে ছিল আমেরিকার ষড়যন্ত্র ও বামপন্থীরা আর ২০ সালে এসে সেটা হইছে করোনা।
(৭৪ সালের কয়েকটা সংবাদ মাত্র)
“এ পর্যায়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকার ২৪ বছর পূর্ববাংলার অর্থনীতি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মতোই ধনতান্ত্রিক। হঠাৎ করে সেখানে জাতীয়করণের অভিঘাত ছিল স্বাভাবিকভাবে ভূমিকম্পতুল্য। নানানভাবে অর্থনীতিকে বেসামাল করে তোলে তা। বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরির ক্ষেত্রে পাটখাত নিয়ে সরকারের আত্মঘাতি নীতি-কৌশল সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল। যেখানে ১৯৭০ সালে পূর্বপাকিস্তান থেকে পাট রপ্তানি হয়েছিল ৩৫ লাখ বেল, ১৯৭৪-৭৫ সালে সেই রপ্তানির পরিমাণ নেমে আসে ১৫ লাখ বেলে। এটা আবার বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি করে। ফলে সময়মতো ইউরিয়া সার আমদানি করা যায়নি তখন। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী ৬.খ উপ-অধ্যায়েও কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। স্বাধীনতাকালে বাংলাদেশের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সামর্থ্য ছিল- যার মধ্যে ৮০ ভাগ হিস্যা ছিল পাট খাতের। কিন্তু ১৯৭২-৭৩ সালে পাট খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে মাত্র ১০৪ কোটি টাকার সমপরিমাণে।
বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের জন্য জাতীয়করণ নীতিই স্পষ্টত দায়ী ছিল। কারণ এই নীতির কারণে এসময় বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বহিষ্কৃত হন। দ্বিতীয়ত, পাট রপ্তানিতে পাকিস্তান সরকার যে বাড়তি প্রণোদনামূলক সহায়তা দিত সেটা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার বন্ধ করে দেয়। সরকারি এই সিদ্ধান্তের সরাসরি সুবিধাভোগী ছিল ভারত। সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পাটের প্রতিযোগী ছিল পূর্ব-পাকিস্তানের পাট। শেষোক্তদের রপ্তানি কমে যাওয়া মাত্রই ভারত পুরো বাজারের ওপর কর্তৃত্ব পেয়ে যায়। ফলে ভারতে পাটের চাহিদা বিপুলভাবে বেড়ে যায় এসময়। আর তার যোগান দিতে বাংলাদেশ থেকে স্রোতের মতো পাটের চোরাচালান শুরু হয়। এসময় ভারতের বাজারে প্রতি বেল (১৮০ কেজি) পাটের দাম ছিল বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১৩ টাকা বেশি। চোরাচালান, জাতীয়করণের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্ট দুর্নীতি, অবাঙালি ও রাজাকারদের ঘরবাড়ি দখল ইত্যাদির মাধ্যমে এসময় রাতারাতি একদল মানুষ ধনী হয়ে ওঠে। লুণ্ঠনের স্বার্থেই এরা ছিল ‘আওয়ামী লীগপন্থী’। ‘অবাঙালিদের প্রায় ৬০ হাজার বাড়ি এ সময় সরকার সমর্থকরা অধিকারভুক্ত করতে পেরেছিলেন’। ধ্বংস ও দারিদ্রের মাঝে সরকারি দলের একদল সমর্থকের এরূপ লুণ্ঠন প্রক্রিয়া সমাজে যে বিষক্রিয়ার জন্ম দেয় তা জাসদ গঠনে বিশেষ সামাজিক জ্বালানি হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল।”
[তথ্যসূত্র: মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ: আলতাফ পারভেজ পৃ. ৩৫৩]




