ছয় দফা নিয়ে অন্য নেতারা যা ভাবতো

শেখ মুজিব যখন ছয় দফার কথা মিটিংয়ে উপস্থাপন করেন তখন আওয়ামী লীগের নেতারাই সর্বপ্রথম এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু শেখ মুজিব ছয় দফা থেকে পিছু হটেননি। তৎকালীন ছাত্রলীগ, নিউক্লিয়াসসহ অনেকেই শেখ মুজিবের ছয় দফা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করতে কাজ করেন। অন্যদিকে ছয় দফার বিরোধীতার জন্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে হাত মিলিয়ে অনেক নেতাও মাঠে নামেন। এছাড়া কেউ কেউ ছয় দফাকে সিআইএর বানানো দফা বলে প্রচার করতে শুরু করেন। ১৯৬৬-র ফেব্রুয়ারিতে উত্থাপিত হয় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা। ছয় দফা ও এর সমর্থনে আওয়ামী লীগের ডাকা ’৬৬-র ৭ জুন হরতালের দিন পুলিশের গুলিতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। বইয়ে ছয় দফা নিয়ে বিভিন্ন নেতার অবস্থান ও মতামত এই লেখায় তুলে ধরব।

“আইয়ুব-ভাসানী সমঝোতার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল শেখ মুজিবের ৬-দফার বিরোধিতা করা। এ সময়ে যারা ৬-দফার বিরোধিতা করতেন তাঁরা ছিলেন মূলত চীন ও রুশপন্থি। ছাত্র ইউনিয়ন ৬-দফার বিরোধিতা করত। ছাত্র ইউনিয়ন ও জামায়াতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রসংঘ ৬-দফাকে পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র এবং আমেরিকা বা সিআইয়ের দলিল হিসেবে চিত্রিত করত। তারা বলত, আমেরিকা ৬-দফার মাধ্যমে পাকিস্তানকে দুই টুকরো করে স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানকে একটি মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করতে চায়। তারা এও বলতে থাকে যে, ৬-দফা আসলে শেখ মুজিব বা বাঙালিদের কেউ তৈরি করেনি, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অর্থনীতিবিদ ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর যৌথ চিন্তার ফসল। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে তারা মার্কিন সাম্রাজ্যের দালাল বলতো। আমরা সে সময় তাদের সে অপপ্রচারের জবাব দেবার চেষ্টা করতাম। পঞ্চাশ বছরেরও পরে আজ আমরা কী দেখছি? সেদিন যারা ৬-দফার পক্ষে জীবন দিয়ে সংগ্রাম করেছিলাম, বাংলাদেশকে স্বাধীনতা করার জন্যে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলাম, তাদের অধিকাংশই আজ ক্ষমতা এবং রাজনীতির মূলধারা থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েছে। অথচ ৬-দফাকে সিআইয়ের দলিল এবং শেখ মুজিবকে সিআইয়ের দালাল বলা রাশেদ খান মেনন-মতিয়া চৌধুরীরা অনেকেই মন্ত্রী এবং অন্যান্য পর্যায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। এর আগের সরকারগুলোয় ইসলামি ছাত্রসংঘের তৎকালীন সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী এবং আরেক নেতা আলী আহসান মুজাহিদ পূর্ণমন্ত্রী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।” (কিন্ডেল পৃ. ৫৮)

“শেখ সাহেবের ৬-দফা কর্মসূচী ঘোষণা দেশের মানুষের কাছে যেমন, তেমনি আমাদের কাছেও ছিল আকস্মিক একটি ঘটনা। পরবর্তীকালে শুনেছি ৬-দফা প্রণয়ন-এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কাজী আহমেদ ফজলুল রহমান, রুহুল কুদ্দুস ও শামসুর রহমান খান (জনসন)। এঁরা তিনজনই ছিলেন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এ ছাড়া তাজউদ্দীন সাহেব তো ছিলেনই। শেখ মুজিবের সম্মতিক্রমেই এই ৬-দফা প্রণয়নের কাজটি শুরু হয়। তিনিই তাজউদ্দীন ভাইয়ের এই কাজে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকার ব্যবস্থা করেন। উপরোক্ত সিএসপি কর্মকর্তাদেরও তাজউদ্দীনের এই অন্তর্ভুক্তির কথা জানানো হয়। আরও দুজনের অন্তর্ভুক্তির কথা শুনেছি। কিন্তু তাঁরা কারা জানতে পারিনি। মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ হলেও তিনিও আমাকে এই তিনজনের বাহিরে আর কারও নাম বলেননি।” (কিন্ডেল পৃ. ৬৩)

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চিকিৎসক কর্মকর্তা ডাক্তার মর্তুজার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তাঁর রাজনৈতিক সমর্পকের কথাও (কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য) আমি জানতাম। সেই সুবাদে কমিউনিস্ট নেতাদের কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হবে কিনা জানতে চাইলে ড. মুর্তেজা গোপনে তাঁদের সঙ্গে আমার আলাপের ব্যবস্থা করলেন। তোয়াহা ভাই (মোহাম্মাদ তোয়াহা) ও হক ভাই (আবদুল হক) আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হলেন। একদিন রাত ১১টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত ইকবাল হলের ২/৩টি রুমে পর্যায়ক্রমে (নিরাপত্তার কারণে) মোট ছয় ঘণ্টা আলাপ হল। আলোচনায় তাঁরা ৬-দফাকে এক কথায় সিআইএ প্রোগ্রাম বলে অভিহিত করলেন। এ ছাড়া তাঁদের স্থির বিশ্বাস শেখ মুজিব হলেন ভারতের এজেন্ট। আর রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি অত্যন্ত অযোগ্য এবং নিম্নমানের। সুতরাং তাঁর নেতৃত্বে কোনো বড় কাজ করা সম্ভব নয়। তাঁরা এও বললেন, মুজিবের নেতৃত্বে ৬-দফা আন্দোলনকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে সেটা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। সেই সঙ্গে তাঁরা আবার এও বললেন, ঐ মুহূর্তে পাকিস্তানভিত্তিক রাজনীতি করলেও তাঁদের অবস্থান শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষেই। তোয়াহা ভাই বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, ১৯৪৮ সালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ছাড়া গত্যন্তর নেই- এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতেন আর সে সময়ই তিনি স্বাধীনতা চেয়ে একটি নিবন্ধও লিখেছিলেন। এসব বলে তাঁরা আমাকে বোঝাতে চাইলেন যে, তাঁরাও আসলে স্বাধীনতার পক্ষে, তবে ৬-দফা দিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে কিংবা ভারত বা আমেরিকার লেজুড়বৃত্তি করে সে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।” (কিন্ডেল পৃ. ৭৩)

“স্বাধীনতার বিষয়টি আলোচনার জন্য সর্বশেষ আমি মওলানা ভাসানীর কাছে যাই। তাঁর কথা ছিল, “আমি তো আর স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা হতে পারব না, আর আমার সঙ্গে যারা আছে তারা তো কমিউনিস্ট। কমিউনিস্টরা তো স্বাধীনতা চায় না, কমিউনিজম কায়েম করতে চায়। এই নিয়ে তাদের সঙ্গে আমার মিলে না। আর যেসব নেতা আছে, তাদের রাজনীতি হলো মন্ত্রী হওয়ার জন্য। একমাত্র শেখ মুজিবেরই বুকের পাটা আছে। তাকে তোমরা সঙ্গে পাবে।” (কিন্ডেল পৃ. ৭৫)

“আওয়ামী লীগের অধিকাংশই কার্যত ৬-দফা ও ১১-দফাবিরোধী পিডিএম-এ চলে যায়, যার নেতৃত্ব ছিলেন আবদুস সালাম খান (শেখ মুজিবের মামা) প্রমুখ। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। ‘নিউক্লিয়াস’-এর সক্রিয় সমর্থন থাকার কারণে আওয়ামী লীগ সে অবস্থা কাটিয়ে ওঠে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দল মিলে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠন করে। তাতে যেসব রাজনৈতিকদল অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেগুলো হলো আওয়ামী লীগ (৬-দফাপন্থী), আওয়ামী লীগ (পিডিএমপন্থী), কাউন্সিল মুসলিম লীগ, নেজাম-ই-ইসলাম, ন্যাপ (ওয়ালী), এসডিএফ এবং জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম। এই জোটেরও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেপথ্য ভূমিকা কালন করে ‘নিউক্লিয়াস’। ” (কিন্ডেল পৃ. ৯১)

সূত্র: আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য-শামসুদ্দিন পেয়ারা

আওয়ামী লীগের পরামর্শদাতা ও দলের মুখপত্র ইত্তেফাক-এর সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন:

‘৬-দফার কোন কোন দফা আমি সমর্থন করি না সত্য, কিন্তু ৬-দফা ভাল কি মন্দ, সেই প্রশ্ন মুলতবী রাখিয়াও আমি বলিতে চাই যে, এই কর্মসূচী সাধারণ্যে প্রকাশ করিবার পূর্বে আমার সাথে কেহ কোন পরামর্শ করে নাই। [পাকিস্তানি রাজনীতির বিশ বছর, ঢাকা, ২০০৭]

মানিক মিয়া তাঁর ইত্তেফাকের ‘রাজনৈতিক মঞ্চে’ লিখেছিলেন: ‘৬-দফা প্রস্তাবের এই বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ অবশ্য কোন ব্যক্তি এমনকি কোন দলবিশেষ নয়। আজ দেশবাসীর সম্মুখে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক সমস্যা মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে, ৬-দফার সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রামের মধ্যেই সেই বাঁচা-মরার সমস্যার সমাধানের পথ নিহিত রহিয়াছে, ইহাই সর্বশ্রেণীর জনগণের বিশ্বাস।’ [ইত্তেফাক, ২৭ মার্চ ১৯৬৬]

(বিভিন্ন বইয়ের বয়ান এই পোস্টে প্রতিনিয়ত আপডেট করা হবে।)

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.