বাকশাল ও গণতন্ত্রের প্রথম মৃত্যু

তাজউদ্দীন বাকশাল বা একদলীয় শাসনের বিরোধী ছিলেন। বাকশাল থেকে শুরু করে দেশ চালানো বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীনের দূরত্ব তৈরি হয়। তাই তো তাজউদ্দীন বলেন- ‘মুজিব ভাই, এই জন্যই কি আমরা ২৪ বছর সংগ্রাম করেছিলাম? যেভাবে দেশ চলছে, আপনিও থাকবেন না, আমরাও থাকবো না, দেশ চলে যাবে রাজাকার- আলবদরদের হাতে।’

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শামসুল হক। কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে সবচেয়ে বড় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭৫ সালে মুজিব নিজে একটি দল সৃষ্টি করেন যার নাম “বাকশাল”। বাকশাল মুজিবের জীবনে বিতর্কিত কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে একটি। আওয়ামী লীগের নেতারা বাকশালের পক্ষে অনেক সময় অনেক কথা বললেও তারা নিজেরা কখনো বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি করা বাকশালের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকি উদযাপন করেনি। ১৯৭৫ সালের ২৪ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রায় সব দল বিলুপ্তি করে দ্বিতীয় বিপ্লবের নামে বাকশালের যাত্রা শুরু হয়। এবং বাকশালের ধারাবাহিকতায় ৬ জুন, ১৯৭৫ বাকশাল ব্যবস্থায় দেশে চারটি দৈনিক ছাড়া আর সকল সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়। ঐ চারটি ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য বাংলাদেশ টাইমস, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার।[

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী উত্থাপন করেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে প্রচলিত সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা বাতিল করে বাকশাল ব্যবস্থা চালু করা হয়। সংসদে উত্থাপনের মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে এই বিল সংসদে পাশ হয়। বাকশাল ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য রাজনৈতিক দল ভেঙে দিয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) নামে জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই দলের চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু নিজে এবং সম্পাদক হন এম মনসুর আলী। বাকশাল ব্যবস্থার অধীনে কোন অদলীয় শ্রেণী ও পেশাভিত্তিক সংগঠন এবং গণসংগঠন করার কোন অধিকার নেই। ট্রেড ইউনিয়ন মাত্রই তাকে বাকশালের অঙ্গদল শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এই ব্যবস্থায় জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় মহিলা লীগ, জাতীয় যুবলীগ এবং জাতীয় ছাত্রলীগ বাদে কোন শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, যুব ও ছাত্র সংগঠন থাকতে পারবে না। আর উপরিউক্ত সংগঠনগুলি হচ্ছে বাকশালেরই অঙ্গ সংগঠন (অষ্টাদশ ধারা)।

যদিও ১৫ আগস্টের পর বাকশালের কুশীলবরা “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” নামে পুনরায় রাজনীতিতে আসেন তবুও বাকশাল ১৯৮৬ সালে “নৌকা” এবং ১৯৯১ সালে “বাইসাইকেল” প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়। পরবর্তীতে দলের বেশীরভাগ সদস্য আওয়ামী লীগে যোগ দিলে দলটি চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয়। 

বাকশাল সম্পর্কে জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলাম কী ভাবতেন তা এম আর আখতার মুকুল-এর ‘মুজিবের রক্ত’ লাল বইতে উল্লেখ আছে (পৃ. ২৬৩)।

” সেদিন (১৩ই কিংবা ১৪ই আগস্ট ১৯৭৫) নজরুল ইসলাম ভাই গম্ভীর হয়ে চুপচাপ পায়চারী করছেন। আমিও উনার সঙ্গে পায়চারী করছি। কোনো কথা বললেন না। নজরুল সাহেবকে আমরা সবাই শ্রদ্ধা করতাম। বঙ্গবন্ধুও ওনাকে ‘স্যার’ বলতেন। মোশতাক, তাজউদ্দীন, কামরুজ্জামান বা মনসুর বলতেন, আমরাও স্যার বলতাম।

তিনি খুব লার্নেড লোক ছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে খুব মন খারাপ করে অভিমান করে থাকতেন। তার কারণ যখনই তিনি দেখলেন বঙ্গবন্ধু কারও প্রভাবে এমন একটা পথে গেছেন, যে-পথ আমাদের কারও জন্য ভালো বা কল্যাণ বয়ে আনবে না, তখনই তিনি অভিমান করে দূরে সরে থাকতেন। সেটা আরও খারাপ হলো আমাদের জন্য। বঙ্গবন্ধুর অন্তরের বন্ধু, প্রকৃতপক্ষে সৈয়দ সাহেব ছিলেন।”

১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দি নিউ ইয়র্ক টাইমসে বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত হয় প্রতিবেদন – Bangladesh: It’s Run by God and the Telephone।

ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশে একই ধরনের রাজনীতি থাকার পরও কেন শুধু পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সামরিক শাসক ফিরে আসছে সেটা ভাবার দরকার আছে। অথচ ভারতে কোন সেনা অভ্যুস্থান হয় নাই। কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ক্ষমতায় এসে নিজেই জয়প্রকাশ নারায়ণকে ডেকে বিরোধী দল তৈরি করতে বলেন। দেশে রাজনৈতিক দলগুলো যখন একটিভ থাকে এবং সংবিধান মেনে চলে তখন ক্ষমতার পালাবদলের জন্যে সেনা অভ্যুস্থানের দরকার হয় না।

খুব সহজ প্রশ্ন; কেউ জোর করে ক্ষমতায় থাকলে তাকে সরানোর উপায় কী? উত্তর হল; গণঅভ্যুস্থান কিংবা সেনা অভ্যুস্থান। এছাড়া আর একটি পথ হল; অন্য দেশের সেনা বাহিনী দিয়ে হামলা করানো। যেটা আমেরিকা ইরাক, লিবিয়াতে করছে।

দেশ স্বাধীনের পর শেখ মুজিব নেহেরুর মতন হয়তো কিছু করবেন অনেকে তাই ভেবেছিল। কিন্তু তিনি সেই পথে যান নাই। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কণ্ঠে সেই হতাশা শোনা যায়-

“নাইনটিন সিক্সটি নাইন থেইক্যা সেভেন্টি ওয়ান পর্যন্ত সময়ে শেখ সাহেব যারেই স্পর্শ করছেন, তার মধ্যে আগুন জ্বালাইয়া দিছেন। হের পরের কথা আমি বলবার পারুম না। আমি গভর্নমেন্টের কারো লগে দেখাসাক্ষাৎ করি না। সেভেন্টি টুতে একবার ইউনিভার্সটির কাজে তাঁর লগে দেখা করতে গেছিলাম। শেখ সাহেব জীবনে অনেক মানুষের লগে মিশছেন ত আদব লেহাজ আছিল খুব ভালা। অনেক খাতির করলেন। কথায়-কথায় আমি জিগাইলাম, আপনের হাতে ত এহন দেশ চালাইবার ভার, আপনে অপজিশনের কী করবেন। অপজিশন ছাড়া দেশ চালাইবেন কেমনে। জওহরলাল নেহেরু ক্ষমতায় বইস্যাই জয়প্রকাশ নারায়নরে কইলেন, তোমরা অপজিশন পার্ট গইড়্যা তোল। শেখ সাহেব বললেন, আগামী ইলেকশনে অপজিশন পার্টিগুলা ম্যাক্সিমাম পাঁচটার বেশি সিট পাইব না। আমি একটু আহত অইলাম, কইলাম, আপনে অপজিশনরে একশ সীট ছাইড়্যা দেবেন না? শেখ সাহেব হাসলেন। আমি চইল্যা আইলাম। ইতিহাসে শেখ সাহেবরে স্টেটসম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।”-অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক,

তথ্যসূত্রঃ ‘যদ্যপি আমার গুরু’- আহমদ ছফা, মাওলা ব্রাদার্স,১৯৮৮, ঢাকা,পৃষ্ঠা.৭৩

২০ জুন ১৯৭৫

গণতন্ত্রে দলের নেতা যেন স্বৈরশাসক হয়ে না উঠতে পারেন তার জন্যে নেতার অন্যায় প্রস্তাবের ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই সুযোগটুকু বন্ধ করে দিয়ে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।”

বাকশালের দর্শন বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন দেশের সবক’টি সংবাদপত্র বিলুপ্ত করেন। শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার এবং বাংলাদেশ টাইমস—এ চারটি পত্রিকা সাময়িকভাবে প্রকাশনার সুযোগ দেয়া হয়।

চতুর্থ সংশোধনী বিষয়ে ওই সময় বিশ্বনেতাদের কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কোনো মন্তব্য পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায়নি। তবে এসব ঘটনায় তখন দিল্লিতে গণতন্ত্রমনারা ভীষণ মর্মাহত হন এবং ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মী, তাত্ত্বিক, সমাজতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ এক বিবৃতিতে বলেন, মুজিবকে আমরা গণতন্ত্রের বরপুত্র হিসেবে জানতাম। আমাদের ধারণা, ভারতের পরামর্শে তিনি এটা করেছেন। তার এ বক্তব্যের সত্যতা মেলে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার দিনই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর অভিনন্দন বার্তার মাধ্যমে।এ বিষয়ে ১৯৭৫ সালের ২৬ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর অভিনন্দন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি : নয়াদিল্লী, ২৫ জানুয়ারী (বাসস)- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাঁহাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করিয়াছেন। বঙ্গবন্ধুর নিকট আজ প্রেরিত এক বাণীতে মিসেস গান্ধী বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ও সাফল্য কামনা করিয়াছেন।

“মুজিব বাহিনী তাদের আদর্শ হিসেবে যে ‘মুজিববাদ’-এর কথা বলত মুজিব নিজে তাকে যে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সম্মিলিত এক রূপ হিসেবে মনে করতেন সে বিষয়ে এই গ্রন্থের অন্যত্র বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো ১৯৭৫-এ এসে ‘মুজিববাদ’-এর এই নতুন সংস্করণ, যাকে মুজিব বলেছেন second revolution- তার বাস্তব চেহারা পুরোদস্তুর একনায়কতান্ত্রিক রূপ নেয়। কারণ বাকশাল নামক এই second revolution-এর কর্মসূচি অনুযায়ী :

ক. দেশে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল থাকবে, সেটি হলো বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ বা বাকশাল। আসলে বাকশাল ছিল আওয়ামী লীগেরই পরিবর্তিত নাম। যদিও এই দলে সিপিবি ও ন্যাপও যোগ দিয়েছিল, কিন্তু কার্যনির্বাহী কমিটিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোন দলের প্রতিনিধি ছিল না। নতুন দলটির প্রতীকটিও ছিল আওয়ামী লীগের প্রতীক- নৌকা। ১১৫ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে অপর দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব ছিল অতি নগণ্য- যেমন সিপিবি’র সদস্য ছিলেন মাত্র এক জন (মো. ফরহাদ, ৭৭ নং সদস্য) ২০৮।

খ. চতুর্থ সংশোধনী অনুযায়ী দেশে যে ‘একটিমাত্র’ দল থাকবে তাতে চেয়ারম্যানই হবেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী; যদিও ঐ চেয়ারম্যান কীভাবে নির্বাচিত হবেন তার কোনো বিধান করা হয় নি। অর্থাৎ শেখ মুজিব নিজেই যে হবেন নতুন দলের চেয়ারম্যান- এটা এত বেশি স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় যে, তার জন্য কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উল্লেখ করারও প্রয়োজনবোধ করেন নি নতুন দলের উদ্যোক্তরা।

গ. চেয়ারম্যানের পর সবচেয়ে ক্ষমতাসম্পন্ন কাঠামো হলো একক দলটির কার্যনির্বাহী কমিটি- সাধারণ সম্পাদকসহ যার ১৫ জন সদস্যের সকলকে চেয়ারম্যানই মনোনীত করবেন;

ঘ. একক এই দলের শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মহিলা ও যুব বিষয়ে অঙ্গ সংগঠন থাকবে; তার বাইরে দেশে আর কোনো শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মহিলা ও যুব সংগঠন থাকতে পারবে না;

ঙ. পার্লামেন্ট নির্বাচনে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে, তাকে চেয়ারম্যানের, অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমতি নিতে হবে। চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে গঠনতন্ত্র পাল্টাতে পারবেন এবং চেয়ারম্যানই গঠনতন্ত্রের একমাত্র ব্যাখ্যাদানকারী হবেন;

চ. বাকশালের অধীনে জেলার মূল প্রশাসক হিসেবে যেসব গভর্নর নিয়োগ হবেন তারাও হবেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের মনোনীত। নতুন দেশে নতুন দল ও নতুন রাজনীতির উপরোক্ত ধাঁচের বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল পুরোপুরি এক ব্যক্তিনির্ভর এবং গণতন্ত্রের মৌলচেতনার বিরোধী, বিশেষত যে জাতি গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে তাদের জন্য পুরোপুরি (পৃ.১৪১)

বাকশাল গঠনকালে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভঙ্গি তাঁর নতুন শাসনতান্ত্রিকক কর্মসূচির মতোই ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল। যার এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ দেখা যায় সাংবাদিক নির্মল সেনের জবানবন্দিতে। বাকশালের যখন পত্তন হয় নির্মল সেন তখন ঢাকায় সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। বাকশাল পদ্ধতি চালু হওয়া মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা রেখে বাকি সব বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় (এবং ১৯৭৫ সালের জুন থেকে তা কার্যকরও হয়)। বিষয়টি নিয়ে গণভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের এক আলোচনার পর বৈঠকের বিবরণ দিচ্ছেন নির্মল সেন এভাবে:

শেখ সাহেব কথা শুরু করলেন। তিনি বললেন, বাকশাল গঠন করেছি। চারটি দৈনিক পত্রিকা থাকবে। পরবর্তীকালে আরও দুটি বের হবে। কিছু সাপ্তাহিক-মাসিক থাকবে। এসব হবে বিনোদনমূলক কাগজ।… আমরা চুপ করে শেখ সাহেবের কথা শুনছিলাম। আমার সঙ্গে গিয়াস কামাল চৌধুরী, কামাল লোহানী ও রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। শেখ সাহেব জিজ্ঞাস করলেন, কোন কথা বলছেন না কেন। আমি বললাম, বলার কিছু নেই, সাংবাদিক ইউনিয়নের সভা ডাকবো। যা সিদ্ধান্ত হয় আপনাকে জানাবো। শেখ সাহেব তীব্র কন্ঠে বললেন, দেশে এখন কোন ইউনিয়ন- টিউনিয়ন নেই। সব বাতিল হয়ে গেছে। আপনাদের ডেকেছি সমস্যা সমাধানের জন্য। অন্যকিছু বলার অবকাশ নেই। মিটিং করুন। কিন্তু-সংবাদপত্রে কোন বিজ্ঞপ্তি যাবে না। এ যেন মনে থাকে। (পৃ.১৪৪)

বাকশাল গঠনকালে জাতীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে এক ধরনের একনায়কতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক বিকৃতির সৃষ্টি হয়েছিল তারই এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় সাহিত্যিক আহমদ ছফার সেসময়কার এক লেখায়। ছফা লিখেছেন:

যে কেউ ইচ্ছা করলে সরকারি দলে (বাকশালে) যোগদান করতে পারবে, এটা ছিল সরকারি ঘোষণা। আসলে যোগ না দিয়ে কারো নিস্তার পাওয়ার উপায় ছিল না। ভেতরে ভেতরে সমস্ত সরকারি- বেসরকারি দফতর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকার সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিলো- সবাইকে জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার আবেদনপত্রে সই করতে হবে। কর্তৃপক্ষ যাকে বিপজ্জনক মনে করেন সদস্যপদ দেবেন না, কিন্তু বাংলাদেশে বাস করে চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করে বেঁচে-বর্তে থাকতে চাইলে জাতীয়দলের সদস্যপদের আবেদনপত্রে সই করতেই হবে। সর্বত্র বাকশালে যোগদান করার একটা হিড়িক পড়ে গেল। শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালের কেন্দ্রীয় দফতর ২১৮ উদ্বোধন করতে এলেন এঁকে স্বাগত সম্ভাষণ জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে গোটা দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক, কৃষক সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে হাজির থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেদিন ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। অবিরাম ধারাস্রোতে প্লাবিত হয়ে ভেজা কাকের মতো সুদীর্ঘ মানুষের সারি- কীভাবে রাস্তায় তারা অপেক্ষা করছিলেন, যারা এ দৃশ্য দেখেছেন ভুলবেন না। মহিলাদের গাত্রবস্ত্র ভিজে শরীরের সঙ্গে একশা হয়ে গিয়েছিল। এই সুবিশাল জনারণ্যে আমাদের দেশের নারীকুলকে লজ্জা-শরম জলাঞ্জলি দিয়ে সশংকিত চিত্তে তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা করতে হচ্ছিলো। পৃ.১৪৪

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুটিকয়েক সন্ত্রাসী ছাত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সংখ্যায় তারা অত্যাল্প থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বশংবদ হয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভয়-ভীতির সংস্কৃতি এতটা শেকড় গাঢ়তে শুরু করে যে, পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশের সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে একটি ‘জাতীয় দল’ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সবাইকে তার সদস্য হতে পরোক্ষে চাপ প্রয়োগ শুরু হয়- তখন দেখা গেল, গণতান্ত্রিক আবহের জন্য বিখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র পনেরোজন শিক্ষক ঐ একক দলে যোগ দিতে অপারগতার কথা সাহস করে জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবুল ফজল ব্যতীত আর সকল উপাচার্যই তাঁদের কর্মচারী ও শিক্ষকদের জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ২৭৬ তিনজন উপাচার্য উল্লিখিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত হন। এরা হলেন ড. আবদুল মতিন চৌধুরী (ঢাকা বিশ্ব.), ড. মাযহারুল ইসলাম (রাজশাহী বিশ্ব.) এবং ড. মোহাম্মদ এনামুল হক (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব.)। এভাবে পঁচাত্তরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ‘সরাসরি মেঠো রাজনীতির অংশীদার’ হয়ে পড়ে- যা কার্যত শিক্ষার পরিবেশকে দারুণভাবে কলুষিত করে; যে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় থেকে বাংলাদেশ আর কখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। উপাচার্যদের যে মেয়াদ শেষের আগেই অপমানজনকভাবে দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে হয় সাম্প্রতিক এই সংস্কৃতিরও শুরু বাহাত্তর-তিহাত্তর থেকে। চারটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম দফায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের (ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ আলী আহসান, ড. ইন্নাস আলী প্রমুখ) অধিকাংশ স্বাভাবিকভাবে নিয়োগকাল শেষ করতে পারেননি। মূলত সরকার দলীয় ছাত্রদের চাপের মুখে এদের অপসারণ করা হয়। (পৃ. ১৭৯)

তথ্যসূত্রঃ মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ: আলতাফ পারভেজ

শেখ মুজিবুর রহমানের জামাতা, শেখ হাসিনার স্বামী, আণবিক শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ইতিহাসের ঐ সময়টিতে প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে প্রধানমন্ত্রীর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে যেতেন। নিয়মিত রাতের খাবারও খেতেন তিনি সেখানে। ১৯৭৫ সালে তেমনি এক সময়ের বিবরণ দিচ্ছেন তিনি আত্মজৈবনিক গ্রন্থে এভাবে: “জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা।

“আমার নিশান গাড়িটি বিক্রির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন ছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী তখন খন্দকার মোশতাক আহমদ।… আগামসি লেনে তাঁর বাসায় গেলাম।… খন্দকার মোশতাক আহমদ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার শশুর সংবিধান পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করছেন, সে সম্পর্কে তুমি কিছু জান কি না? এটা মারাত্মক ভুল হবে। বিস্তারিত জানতে চাইলে বলেন, মন্ত্রী হিসেবে সব কিছু প্রকাশ করা সঠিক হবে না। তুমি নিজে খোঁজ-খবর নাও। কিছুদিন পর আবার তাঁর বাসায় গেলে তিনি আবারও সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়টি উত্থাপন করেন। আমি বললাম, কাকা, শেখ মণি’র সঙ্গে ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করুন না কেন। তিনি বললেন, লাভ হবে না। সে তোমার শশুরের পক্ষাবলম্বন করছে। ২৪ জানুয়ারি বিকেল পাঁচটায় অফিস ছেড়ে গাড়ি চালিয়ে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাসায় যাই। গেটের কাছে পৌঁছে দেখি দরজা বন্ধ। লক্ষ্য করলাম, ঐদিন থেকে বাসায় পুলিশের অতিরিক্ত হিসেবে কিছু সেনা সদস্যও ডিউটিতে নিয়োজিত।… পকেট গেটের কাছে খন্দকার মোশতাক আহমদ সাহেবের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে গেটের নিকটস্থ আম গাছটির নিকটে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, বাবা ওয়াজেদ, আগামীকাল তোমার শশুর সংবিধানে যে পরিবর্তন ঘটাতে চাচ্ছেন তা করা হলে সেটা শুধু একটা মারাত্মক ভুলই হবে না, দেশে-বিদেশে তাঁর ভাবমূর্তিরও অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তেতলার বৈঠকখানায় গিয়ে তাঁকে একটু বোঝাও।… মোশতাক সাহেবকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিলো। সম্ভবত ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে।… সোজা তিনতলায় যাই। বঙ্গবন্ধু বৈঠকখানায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছেন। পায়চারি করতে লাগলাম কখন ওনারা যাবেন তার অপেক্ষায়। কিন্তু তা না ঘটায় স্থির করলাম রাতের খাবারের পর দেখা করবো। রাত এগারোটায় হাসিনা, আমি ও বঙ্গবন্ধু খেতে বসি। সে সময় বঙ্গবন্ধু কোন কথা না বলে শয়নকক্ষে চলে যান। ঠিক ঐ মুহূর্তে শেখ মণি সেখানে ঢুকেই ছিটকানি লাগিয়ে দেন। আমার শাশুড়িকে বাইরে রেখে মণিকে ইতঃপূর্বে কখানো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ করতে দেখিনি। রাত পৌনে একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। ততক্ষণেও তাদের আলাপ শেষ হলো না।… পর দিন সংসদে পেশ হলো চতুর্থ সংশোধনী বিল।”

তথ্যসূত্র: এম এ ওয়াজেদ মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, ইউপিএল, এপ্রিল ২০০০, ঢাকা, পৃ. ২৩৪-৩৫।

“৭৪ সালের ১৯ মার্চ রক্ষীবাহিনী গণকণ্ঠ-এর প্রেসের যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যায়- যা ছিল গণমাধ্যমের প্রকাশনা বন্ধে ঐ সময়কার এক অভিনব নজির। এভাবে, যে ধরনের মুক্ত গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা বিলুপ্ত হয় পঁচাত্তরে এসে। গণকণ্ঠ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে কী ঘটছে সে সম্পর্কে সরকারি ভাষ্যের বিকল্প উৎস বহুলাংশে নিঃশেষ হয়ে যায়। দৈনিক হিসেবে এটাই ছিল তখন বিকল্প কন্ঠস্বর। মুজিব শাসনামলে গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ যেসব কারণে সরকারের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল তার মধ্যে একটি ছিল রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রম। বস্তুত গণমাধ্যমকে ‘মুক্ত’ অবস্থায় রেখে দিলে রক্ষীবাহিনীকে কোনভাবেই এতটা ‘মুক্ত’হস্তে তাদের কার্যক্রম চালাতে দেওয়া সম্ভব হতো না। রক্ষীবাহিনীর ‘অবাধ’ ভূমিকার স্বার্থেই গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়া হয়েছিল।” [মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ: আলতাফ পারভেজ, পৃ. ২৫৩]

তবে বাকশাল নিয়ে সর্বহারা পার্টির আলাদা একটা আলাপ আছে। তাদের এক সদস্য বলছেন, আওয়ামী লীগের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে ছিলেন। ফলে মুজিব ভয়ে ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্যরা ভোট দিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য বানিয়ে দেয় কিনা। ৭৩ সালে সিকিমে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার দাবী ওঠা দেখে শেখ মুজিব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বাকশাল কামেয়ের দিকে মনোযোগী হয়। এই কারণে শেখ সব ক্ষমতা নিজের হাতে নেন।

আমার শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক সেদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, তার কাছে শেখ মুজিবের কিছু ছবি আছে, সেই ছবিতে জিন্নাহ মারা যাওয়ার পর শেখ মুজিব হাউমাউ করে কাঁদছেন। – আহমদ ছফা, কলকাতা বইমেলা ’৯৯ সংখ্যার জন্য কলকাতার স্বাধীন বাংলা সাময়িকী সাক্ষাৎকারটি বাংলাবাজার পত্রিকা (৩১ জানুয়ারি ১৯৯৯ থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯) তিন কিস্তিতে আবার ছাপে।

(এই লেখাটা অসম্পূর্ণ। তবে কিছু তথ্য সবার সামনে আনার কারণে পাবলিশ করা হল। তবে পরবর্তীতে এই লেখাটি আরো বিস্তারিতভাবে লিখব বলে আশা রাখি।)

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.