মধ্যযুগের ইহুদি বৈদ্য ধর্মীয় মতপার্থক্য পারস্পরিক সম্পর্ককে যতই তিক্ত করে থাক, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মধ্যযুগের খ্রিস্টান ও মুসলমান সমাজ ইহুদি নির্ভরশীলতা কাটাতে পারেনি। ইহুদিদের চিকিৎসাচর্চা দীর্ঘদিনের। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধিকাংশ তথ্য ইহুদি ধর্মগ্রন্থ টোর্যায় সংকলিত হয়েছিল। তার চর্চা পুরুষানুক্রমে বজায় থেকেছে। লাশকাটা খ্রিস্টানধর্মে নিষিদ্ধ হলেও ইহুদিধর্মে ছিল না। ব্যাপারটা অবশ্য খুব সুনজরেও দেখা হয়নি। শিশুপুত্রের সুন্নত প্রথায় ইহুদি শল্য চিকিৎসার সূত্রপাত। খ্রিস্টপূর্ব নবম শতক থেকে ইহুদি বৈদ্য অনেক রকমের কাটা ছেঁড়ায় হাত পাকিয়েছে, বিশেষ করে যুদ্ধে আহত সেনাদের উপর। জীবাণু নিরোধক হিসেবে মদের ব্যবহার, শল্যচিকিৎসায় রোগীকে অজ্ঞান করার ওষুধ তারা জানত। খ্রিস্টীয় শতকে সিজারিয়ান ও অ্যাপেন্ডিসাইটিস অস্ত্রোপচারের দক্ষতাও অর্জন করে ইহুদি শল্য চিকিৎসক। শল্যচিকিৎসা পদ্ধতির পুস্তক লেখে, শল্য চিকিৎসার চমৎকার যন্ত্রপাতি তৈরি করে। হার্টের অসুখ সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল এবং হৃৎপিণ্ডের ফুটো মেরামতি করার অসফল শল্যচিকিৎসাও ইতিমধ্যে করেছে। ঈশ্বরের উদ্দেশে যে পশুবলি হত তার অর্ধেক ভোজ্য ছিল। এই পশুবলি সম্পূর্ণ ধর্মীয় আচার মেনে করা হত ফলে নির্দেশ ছিল যে একমাত্র সুস্থ সবল পশুই বলি দেওয়া যাবে। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলিদাতা থাকত। কসাইদের অবগতির জন্য বিস্তারিত বর্ণনাসহ পশুদের বিভিন্ন রোগ নথিভুক্ত হয়। পশুরোগ নির্ণয়ে কাঁটাছেঁড়ায় হাত পাকানো ইহুদি বৈদ্য বোঝে রোগের বাহ্যিক লক্ষণগুলি আসলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোষকলার পরিবর্তন অথবা ক্ষয়ের ফল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই অভিনব তত্ত্বের প্রথম বিকাশ ইহুদি র্যাবাইদের হাতে। ইহুদি বৈদ্যরা যাকে নিবিড় অধ্যয়ন করেছে, চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপ্পোক্রেটসও এমন বৈপ্লবিক তত্ত্ব লিখে যাননি। প্রাচীন ইহুদিরা কাটাছেঁড়া সেলাইয়ে অত্যন্ত পটু ছিল। তারা ছিন্ন ধমনী ও শিরা জোড়া দেবার দক্ষতাও অর্জন করে। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ট্যালমুডে ফুসফুসে ছত্রাক গজানো নিয়ে র্যাবাইদের আলোচনা আছে। দু’হাজার বছর আগে র্যাবি জেকব আলোচনা করছেন মেরুদণ্ডের আঘাত সম্পর্কে। আলোচনা রয়েছে পুঁজ তার রং ও তার অর্থ বিষয়ে। যকৃতের কাজ, অসুখ, মস্তিষ্কের অসুখ, বিকলাঙ্গতা ইত্যাদি নানাবিধ রোগের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা ট্যোরা ও ট্যালমুডে পাওয়া যায়। জোঁক দিয়ে রক্তমোক্ষণ, রক্তমোক্ষণ কাচের ব্যবহার, প্লীহা, রুগ্ন অন্ডকোষ বাদ দেওয়া, ক্ষত সেলাইয়ের সময় শরীরের নষ্ট মাংস বাদ দেওয়া, আঘাতের ফলে পেট চিরে বেরিয়ে আসা পাকস্থলী পুনস্থাপন, নাকের ভিতরের মাংসপিণ্ড বাদ দেওয়া এসবই জানত ইহুদি বৈদ্য। এছাড়া তলোয়ার ও বর্শার আঘাতের চিকিৎসা যিশুর আমল থেকেই ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টান ও মুসলমানের চিকিৎসক ইহুদি তার পেশাকে সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। চিকিৎসক সর্বদা নিরপেক্ষ বিবেচিত হয়েছে এবং সে কারণে দূতেরই মতো অবধ্য। চিকিৎসক হত্যা প্রকারান্তরে আত্মহত্যা। মধ্যযুগের চিকিৎসক দেবতুল্য। যৌনতা বিষয়ে খ্রিস্টধর্মের মাত্রাছাড়া স্পর্শকাতরতা মানবদেহের উপর যে-কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অসম্ভব করে তুলেছিল। ফলে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। মধ্যযুগের অশিক্ষিত খ্রিস্টান চিকিৎসক বা হাতুড়ে বস্তুত নাপিত ছাড়া অন্য কিছু নয়। অপরপক্ষে ইহুদি বৈদ্যের হাতেখড়ি হিপ্পোক্রেটসের চিকিৎসাশাস্ত্র দিয়ে। হিপ্পোক্রেটসের লেখা বই আরবি ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। ইহুদিদের অধিকাংশ গ্রিক, ল্যাটিন, আর্মায়িক, আরবি ভাষা জানত। গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের রচনার সঙ্গেও তারা পরিচিত ছিল। বিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘মেডিকেল ক্যানন’-এর রচয়িতা একাদশ শতকের আরবি চিকিৎসক আভিসেন্না-র বিষয়েও অবগত ছিল ইহুদি বৈদ্য। দ্বাদশ শতকে চার্চের ভাষা ল্যাটিন হবার কারণে ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিক ভাষা অজানা ছিল ইউরোপে। ইহুদি ছাড়া হিপ্পোক্রেটস, গ্যালেনের নাম অন্য কেউ শোনেনি। অষ্টাদশ থেকে দ্বাদশ শতক অবধি বাগদাদ ও অন্যান্য মুসলিম শহরে আরব চিকিৎসকদের সমমর্যাদা পেয়েছে ইহুদি চিকিৎসক। হারুন আল রশিদ (৭৬৩-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) বাগদাদে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে আরবি ও ইহুদি চিকিৎসকরা একসঙ্গে চিকিৎসা করেছে। মুসলমান শাসিত স্পেনে অন্তত একশো নামি ইহুদি চিকিৎসকের কথা জানা যায়। এদের একজন আবু মেরওয়ান চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থও লেখেন। ১৪৯২-তে রানি ইসাবেলা মুসলিমদের হাত থেকে স্পেনের ক্ষমতা দখল করে ইহুদিদের বিতাড়িত করেন। ইহুদি চিকিৎসকরা চলে যায় ইটালি, আফ্রিকা, তুরস্ক, পর্তুগাল, জার্মানি, হল্যান্ড এবং আমেরিকায়। সম্ভবত কলম্বাসের ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রায় সঙ্গী ছিল ইহুদি বৈদ্য। পর্তুগিজ রাজপরিবারের লোকজন ইহুদি বৈদ্য ছাড়া হাঁচি কাশি সর্দি জ্বরের চিকিৎসাও করাত না। নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ইটালির প্রতি শহরে ইহুদি চিকিৎসক পাওয়া যেত। ফ্রান্সে ইহুদি চিকিৎসকদের উপর চার্চের বিবিধ আইনি নিষেধ চাপানো হয়। নিজেদের মধ্যে ডুয়েল ও নানারকমের মারদাঙ্গায় হরহামেশা ক্ষতবিক্ষত ফরাসি অভিজাতকূল সেসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইহুদি চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হত অস্ত্রোপচার, সেলাই ফোঁড়াইয়ের জন্য। জাল ধর্মান্তকরণ, মিথ্যাভাষণ, লুকিয়ে রাখা, ছদ্মবেশ দেওয়া এমন নানাবিধ কৌশলে ইহুদি চিকিৎসকদের গণনির্বাসন থেকে রক্ষা করত ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানির অভিজাতরা। সবক্ষেত্রেই যে নিস্তার মিলত তা নয়। মধ্যযুগের ইউরোপে বিউবনিক প্লেগের মতো কালন্তক মহামারি প্রায়ই ছড়াত। আর যখনই তা হত ইহুদি চিকিৎসকদের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠত যে তারা কুয়োর জলে বিষ মিশিয়েছে। জার্মানিতে বহু ইহুদি চিকিৎসক ছিল। বেলজিয়াম, হল্যান্ডে তাদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত। পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়ার অ-খ্রিস্টানদের চোখে ইহুদি চিকিৎসক ছিল জাদু ক্ষমতাসম্পন্ন সন্ত। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত পূর্বের দেশগুলির সঙ্গে একচেটিয়া ঔষধ ব্যবস ছিল ইহুদিদের। তারা ছিল ওষুধ তৈরির যাবতীয় কলাকৌশল জানা ইউরোপের একমাত্র ফার্মাসিস্ট।
(ইহুদিদের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষেপে জানতে চাইলে এই চমৎকার বইটি পড়ে যেতে পারে।)
ওয়ান্ডারিং জু
ইউরোপের অনেক শহরে ছিন্নমূল, আর্থিক বিধ্বস্ত ইহুদিদের প্রবেশ অধিকার ছিল না। তাদের বৃহৎ অংশ ভাত কাপড়ের সংস্থানে ফেরিওয়ালা বনে যায়। জন্ম নিল ‘ওয়ান্ডারিং জু’, দাড়িওয়ালা, অতিবৃদ্ধ, জীর্ণ পোশাক, বিষণ্ণ ভবঘুরে ইহুদির মিথ। অভিশপ্ত ‘ওয়ান্ডারিং জু’ দুর্ভাগ্যের প্রতীক। কাহিনিটির উৎস গ্রিক বাইবেল। যিশু তাঁর ক্রুশ বহন করে বধ্যভূমির দিকে হেঁটে গিয়েছিলেন যে পথে, পুরনো জেরুজালেম শহরের সে পথই খ্রিস্টানুরাগীদের দুঃখের সরণী ‘ভায়া ডোলারোসা ‘ (Viadolorosa)। কথিত, পথে তিনবার মাটিতে পড়ে যান যিশু। দম নেবার জন্য শ্রান্ত যিশু এক ইহুদি চর্মকারের বাড়ির উঠোনে বসেন। গ্রিক বাইবেল অনুযায়ী ওই চর্মকার যিশুকে আঘাত করে এবং গালি দেয়। যিশু তাকে শাপ দেন যে তার মৃত্যু হবে না। হতদরিদ্র, জরাগ্রস্ত সে যুগযুগান্ত এক দেশ থেকে অন্যদেশ ঘুরে ফিরবে। কোথাও তার বিশ্রাম মিলবে না, মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে না। ইহুদি বিরোধী এ কাহিনির সত্যতা স্বীকার করে না যিশুর জীবনপঞ্জী ‘গসপেল’। ঘটনাটি মধ্যযুগের প্রক্ষেপণ বলে মত গবেষকদের। যখন ফেরিওয়ালা বৃত্তি গ্রহণ করা নিরুপায় ইহুদিরা এক রাষ্ট্রীয় সীমান্তহীন ভবঘুরে জনগোষ্ঠী হয়ে যায়।
ইহুদিদের প্রতি মার্টিন লুথারের দৃষ্টিভঙ্গী
মার্টিন লুথারের রিফরমেশন বা নয়া প্রোটেস্ট্যান্ট তত্ত্ব গোড়ায় আশান্বিত করে ইউরোপের ইহুদিদের। রোমান ক্যাথলিক চার্চকে আক্রমণ করে মার্টিন লুথার বললেন, ইহুদিদের সঙ্গে চার্চের অমানবিক ব্যবহারের প্রতিবাদে বহু ভালো খ্রিস্টান নিজ ধর্মত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণের চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছে। লুথারের মতে যে ধর্ম তাদের উপর অপরিসীম অত্যাচার করেছে সে ধর্মে স্বাভাবিক কারণেই ইহুদিদের কোনো আকর্ষণ জন্মায়নি। লুথার ভেবেছিলেন, প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম যিশুর জীবন কাহিনি মার্জিত, আদিরূপে প্রকাশ করায়, ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হবে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনিই পারবেন ইহুদিদের ধর্মান্তরিত করতে। যখন দেখলেন বস্তুত তা অসম্ভব, লুথারের ইহুদি প্রীতি রাতারাতি ঘৃণায় পরিণত হল। তাঁর কলম শানিত হল ইহুদি বিদ্বেষী প্রচারে। ১৫৪৩ সালে লেখা লুথারের পুস্তিকা “On The Jews And Their Lies”। চারশো বছর বাদেও এই বই নাৎসি জার্মানির ইহুদি হত্যায় ইন্ধন জুগিয়েছে। ভীষণ হতাশ লুথার তাঁর অনুগামীদের প্ররোচিত করলেন ইহুদিদের সঙ্গে নির্মম ব্যবহার করতে, সিনাগগ পুড়িয়ে দিতে। মৃত্যুর কিছু আগে সব খ্রিস্টান রাজাকে তাদের দেশ থেকে ইহুদি বিতাড়নের নির্দেশ দিয়ে গেলেন লুথার। প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ তৈরির পিছনেও ইহুদি চক্রান্ত দেখেছে রোমান ক্যাথলিক চার্চ। ইহুদি ধর্মতত্ত্বই যে খ্রিস্টান চার্চে ভাঙন ধরাবার মূলে এই রায় দিয়ে ইহুদিদের ইউরোপের জনজীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার ডাক দেয় ক্যাথলিক চার্চ। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার বিরোধী কাউন্টার রিফরমেশন শুরু হওয়া মাত্র ক্যাথলিক দুনিয়ায় ইহুদিদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে।
মাল্টায় ইহুদিদের দাস হিসেবে বিক্রি
ভূমধ্যসাগরে অটোমান তুর্কি বনাম খ্রিস্টান নৌবহরের হরহামেশা যুদ্ধে বন্দী ইহুদি বণিকরা ক্রীতদাস বাজারে বিক্রি হয়ে যেত। ইহুদি নীতি ছিল তুর্কি মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। স্পেন, পর্তুগাল থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা কনস্টানটিনোপলে আশ্রয় পায়। বিনিময়ে তারা অটোমন তুর্কিদের যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে সাহায্য করে। এ্যাড্রিয়াটিক ও ইজিয়ান সমুদ্রে বহু ইহুদি বণিক ছিল। ভেনিসের ইহুদিদের সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক ভেনিসের বাণিজ্যে তাদের গুরুত্ব বাড়ায়। নেপলস, জেনোয়া, লেগহর্ন প্রভৃতি বন্দর থেকে বাণিজ্য করেছে ইটালির ইহুদিরা। এমন বাণিজ্যতরী খুব কম ছিল যাতে ইহুদি বণিক থাকত না। মাঝ দরিয়ায় এইসব বণিক বিপন্ন হত তুর্কি এবং খ্রিস্টান নৌবহরের যুদ্ধে। উভয়পক্ষের কাছেই যুদ্ধবন্দী হিসেবে ইহুদির দাম বেশি ছিল। তারা জানত বন্দী ইহুদি বণিকের আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক, তাকে ছাড়িয়ে নিতে ইহুদি সম্প্রদায় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিতে প্রস্তুত। খ্রিস্টান জাহাজ থেকে বন্দী করা ইহুদি বণিকের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি হত কনস্টান্টিনোপলে। তুর্কি জাহাজ থেকে বন্দী ইহুদির মুক্তিপণ দিত ভেনিসে ইটালি ও পর্তুগালের ইহুদিদের যুগ্ম সংস্থা যাদের কাজই ছিল পণবন্দী ইহুদিকে মুক্ত করা। এই ইহুদি কেনাবেচায় মুখ্য ভূমিকায় ছিল সেন্ট জনের নাইটরা। তাদের দাস বাজার ছিল মালটা। ওরা বেছে বেছে ইহুদি বণিক তুলে নিত। এমনকি খ্রিস্টান জাহাজ থেকেও। যুক্তি ছিল, ওই ইহুদিরা অটোমন তুরস্কের প্রজা। নাইটরা বন্দী ইহুদিদের ব্যারাকে আটকে রাখত যতদিন না ভালো খদ্দের পাওয়া যায়। ভেনিসের ইহুদি সংগঠনের একজন এজেন্ট সর্বদা মজুত থাকত যার কাজ ছিল মালটায় নিয়ে আসা ইহুদি যুদ্ধবন্দীদের হিসেব রাখা এবং পর্যাপ্ত অর্থ মজুত থাকলে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়া। এই দাসদের খ্রিস্টান মালিকরা ইহুদি মুক্তি সংগঠনগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করে চড়া অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করত। পঁচাত্তর বছরের জুডা সারনাগোকে একটি ছোট সেলে মাসাধিক কাল আটকে রাখে তার মালিক। বৃদ্ধ অন্ধ হয়ে যায়। উঠে দাঁড়াবার শক্তি ছিল না তার। তার খ্রিস্টান মালিক হুমকি দেয় দু’শো ডুকাট যদি ইহুদি এজেন্ট না দেয় তবে লোকটির দাড়ি এবং চোখের পাতা উপড়ে নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত দু’শো ডুকাট দিতে হয় ইহুদি এজেন্টকে। দর বাড়াবার অন্য এক কৌশল ছিল এজেন্টের সামনে বন্দী ইহুদিকে চাবুক মারা। এভাবে মৃত্যু হত অনেক বন্দীর। তিনশো বছর মালটার এই নিষ্ঠুর ইহুদি দাস বাজার বেঁচে গেল। পুরানো রেকর্ড দেখায় যে 1768 সালে ইংল্যান্ডের ইহুদিরা একদল ইহুদি দাসকে মুক্ত করার জন্য মাল্টায় আশি পাউন্ড পাঠিয়েছিল। তিরিশ বছর পর নেপোলিয়ন এই অমানবিক কার্যকলাপ বন্ধ করে দেন।



