পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত, ভারতের প্রথম শবব্যবচ্ছেদ  ও প্রথম মেডিক্যাল কলেজ

১.

শৈশবে পড়াশুনায় পণ্ডিত মধুসূদনের মনোযোগ ছিল না। এজন্য একদিন তাঁর পিতা তাঁকে ভৎসনা করেন। মনের দুঃখে তিনি বাড়ি ছাড়েন। বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময় তিনি বলেছিলেন মানুষ না হয়ে তিনি বাড়ি ফিরবেন না।

কলকাতায় এসে তিনি সংস্কৃতি কলেজে ভর্তি হন। তিনি সংস্কৃত সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ১৮২৬ সালে সংস্কৃত কলেজে বৈদ্যক শ্রেণি খোলা হলে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নে মন দেন। মেধার গুণে তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বৈদ্যক শ্রেণির অধ্যাপক ছিলেন ক্ষুদিরাম বিশারদ। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে মধুসূদন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। সংস্কৃত কলেজে তিনি থাকার সময় মধুসূদন হুপারের ’অ্যানাটমিস্টস অ্যাডেমেকাম’ গ্রন্থটি সংস্কৃতে অনুবাদ করে পারিতোষিক পান এক হাজার টাকা। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে নিজের ছাত্রদের সাথে ফাইনাল পরীক্ষায় বসে উত্তীর্ণ হন। এত দিন মধুসূদন ছিলেন ডাক্তারি ছাত্রদের শিক্ষক পণ্ডিত, এবার নিজেও হলেন ডাক্তার।

২.

১৮২২ সালের ২১ জুন পাশ্চাত্য চিকিৎসার শিক্ষার জন্য কলকাতায় স্কুল ফর নেটিভ ডক্টরস স্থাপিত হয়। এই স্কুলের ছাত্রেরা ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেনাবাহিনীর ডাক্তারদের সঙ্গে থেকে চিকিৎসাকার্যে সহায়তা করত। এরপর ১৮২২ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় মেডিক্যাল ক্লাস এবং সংস্কৃতি কলেজে বৈদ্যক শ্রেণি খোলা হয়। এখানে ইংরেজি ভাষার বইগুলো আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করা হত। সংস্কৃত কলেজের কাছে একটি বাড়িতে একটি হাসপাতালও খোলা হয়। কিন্তু কোথাও শব ব্যবচ্ছেদের ব্যবস্থা ছিল না। অতীতের ইউরোপের খ্রিস্টানদের মতন ভারতের হিন্দু মুসলিমরা শব ব্যবচ্ছেদের বিরোধী ছিল। ফলে শিক্ষার্থীরা হাড় নিয়ে নাড়াচাড়া করত আর পশুদেহ কেটে দেখা আর আর কিছু করতে পারত না। কারণ কুসংস্কারের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে শবদেহের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।

অতীতে সনাতন সমাজে শব ব্যবচ্ছেদ পাপ ছিল না। সুশ্রুত থেকে বাগভট পর্যন্ত শল্যবিদ্যায় অঙ্গ ব্যবচ্ছেদের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে মনুর সময়ে তা নিষিদ্ধ হয়। মনুর নির্দেশে মৃতদেহ স্পর্শ করা অশুচি বলে গণ্য করা হয়। এভাবেই এক সময় সারা দেশে শব ব্যবচ্ছেদ শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলে গণ্য হয়।

ভারতবর্ষের মানুষদের কুসংস্কারে বিরক্ত হয়ে ইংরেজরা মাদ্রাসা ও সংস্কৃত কলেজে চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষাদান বন্ধ করে দেয়। তবে বন্ধ করার আগে ইংরেজরা দুই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা শিক্ষার মান যাচাই করার জন্য একটা মেডিক্যাল কমিশন গঠন করে। সভাপতি ছিলেন সি. জে. গ্রান্ট এবং সদস্য ছিলেন জি. সি. সাদারল্যান্ড, সি.জি. ট্রাভেলিয়ান, টমাস স্পেন, এম. জে. ব্রামলি এবং রামকমল সেন। ১৮৩৪ সালে তারা রিপোর্ট প্রকাশ করেন এবং রিপোর্টে শব ব্যবচ্ছেদ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জানান শব ব্যবচ্ছেদ ব্যতীত চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ থাকে। কমিশন এসকল প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষাদান বন্ধ করে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যরীতিতে চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চার জন্য একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করার সুপারিশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৩৫ সালের ২৮ জানুয়ারিতে এক আদেশ বলে ঐ বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সংস্কৃত কলেজ ও মাদ্রাসায় চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষা বিভাগ এবং স্কুল অফ নেটিভ ডক্টরস বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই একই আদেশবলে আধুনিক ইউরোপের মতন চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষাদানের জন্য একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা হয়। ১ মার্চ ১৮৩৫ সালে কলেজের সূচনাকালীন আনুষ্ঠানিকতা এবং ১ জুন পাঠ-কার্যক্রম শুরু হয়।

৩.

শুরুতেই কলেজ কর্তৃপক্ষ এক বাধার সম্মুখীন হলেন। মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ড. জোসেফ ব্রামলি এবং শল্যবিদ্যার (সার্জারি) অধ্যাপক ডা: হেনরি হ্যারি গুডিভ কলেজে শব ব্যবচ্ছেদ করার জন্য উদ্যোগী হলেন। কিন্তু এই সংবাদ জানাজানি হতেই যেন ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ল। রক্ষণশীল হিন্দুরা সমস্ত শক্তি দিয়ে বিরোধিতা করতে এগিয়ে এলেন। অনেকে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে জানালেন যে হিন্দুশাস্ত্রে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা নিষিদ্ধ। ছাত্রদেরও তাঁরা ভয় দেখালেন যে বিধর্মী অধ্যাপকদের নির্দেশে শব ব্যবচ্ছেদ করলে তাঁদের পতিত বা একঘরে হয়ে থাকতে হবে। সাময়িকভাবে ছাত্ররা পিছিয়ে গেলেন থমকে গেলেন কলেজ কর্তৃপক্ষও। শারীরবিদ্যা শিক্ষার প্রয়োজনে ডা: গুডিভকে বাহির থেকে তৈরি করে আনতে হয়েছিল কাঠ ও টিনের তৈরি একটি ভেড়ার ব্রেন এবং ছাগলের লিভারের মডেল। সুদুর ইংল্যান্ড থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ করে দুটি নরকঙ্কাল আনতে হয়েছিল।

মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভারতবন্ধু ডেভিড হেয়ার। শব ব্যবচ্ছেদ চালু করে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মতভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানচর্চা শুরু করার ব্যাপারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাবনার সময় তিনি সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের তৎকালীন অধ্যাপক পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্তকে অনুরোধ করেছিলেন হিন্দু শাস্ত্রে শব ব্যবচ্ছেদের নজির আছে কিনা খুঁজে দেখতে। মধুসূদন হেয়ার সাহেবকে জানিয়েছিলেন যে হিন্দু শাস্ত্রে শব ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে কোনরূপ বিধিনিষেধ নেই। এই ব্যাপারে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রত্যহ কলেজের শব ব্যবচ্ছেদ গৃহে গিয়ে ছাত্রদের বোঝাতেন যে শব ব্যবচ্ছেদ করলে কোনরূপ অধর্ম হবে না। ক্রমশ ছাত্রদের মনের ভ্রান্ত-ধারণা দূর হল, তাঁরা সাহস অর্জন করলেন।

অবশেষে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি। ১০ জানুয়ারি ১৮৩৬। পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত আধুনিক যুগের প্রথম ভারতীয় হিসাবে শব ব্যবচ্ছেদ করলেন। জনমানসে এই ঘটনার প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। শুধু শিক্ষা-বিপ্লব নয় এ ছিল সমাজ-বিপ্লব। অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং তথাকথিত ধর্মের নামে অধর্মের কালো মেঘ সরে গিয়ে সত্য ও জ্ঞানের আলোকে চারদিক হল উদ্ভাসিত।

১৮৪৯ সালে মেডিক্যাল কলেজে মধুসূদন গুপ্তের একটি তৈলচিত্র প্রতিষ্ঠার সময় বেথুন সাহেব বলেন- ” দৃশ্যটি আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ব্যাপারে মনস্থির করতে মধুসূদন একটু সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি আর কোনো দ্বিধা-বোধ করেননি। মৃতদেহটি একটি গুদাম ঘরে রাখা হয়েছিল। ডা: গুডিভের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে স্ক্যালপেল হাতে মধুসূদন সেখানে ঢুকলেন। ছাত্ররা সবাই ভয়মিশ্রিত কৌতূহলের সঙ্গে ঘরের বাইরে ভিড় করেছিলেন। এই যুগান্তকারী ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করার জন্য তাঁরা ঝিলমিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলেন। মধুসূদন অকম্পিত হাতে শবটির বক্ষদেশে ছুরিটি বসিয়ে দিলেন। সমবেত দর্শকগণ উৎকণ্ঠামুক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।” (অনুদিত)

এই শব ব্যবচ্ছেদ ব্যাপারটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ফোর্ট উইলিয়ামে তোপ দাগা হয়েছিল। এই ঘটনা তৎকালীন কোনো সংবাদপত্রে উল্লিখিত হয়নি। কিন্তু জনশ্রুতি ছিল খুবই প্রবল। ১৮৩৭ সালে ব্যবচ্ছেদ করা মৃতদেহের সংখ্যা ছিল ৬০, ১৮৩৮ সালে সেটি ১২০ এবং ১৮৪৪ সালে সেটি ৫০০ অধিক সংখ্যায় গিয়ে দাঁড়ায়।

দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ’সুরধুনী কাব্যে’ মধুসূদন সম্পর্কে লেখেন- ”শিখেছিল এনাটমি আগে জাত দিয়ে”। মধুসূদনকে শব ব্যবচ্ছেদ করার জন্য জাতিচ্যুত করা হয়েছিল। মধুসূদনকে বয়কট করার ব্যাপারে কলুটোলার সেনরা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

৪.

পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত শুধু হিন্দু ছাত্রদের শব ব্যবচ্ছেদ করতে উৎসাহ দেননি, তিনি একই সাথে মুসলিম শিক্ষার্থীদেরও শব ব্যবচ্ছেদে উদ্বুদ্ধ করেন। ভিজিটার অধ্যাপক এলান ওয়েব মধুসূদনের অধ্যাপনা একই সাথে হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রদের শব ব্যবচ্ছেদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞান পুস্তক প্রণয়নে তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ। ১৮৪৯ সালে তিনি ’দি লন্ডন ফার্মাকোপিয়া’  বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন। ১৫ নভেম্বর ১৮৫৬ মধুসূদনের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। জানা যায় তিনি জায়বেটিসের রোগী ছিলেন। স্বাস্থ্যের কারণে চিকিৎসকরা তাঁকে শব ব্যবচ্ছেদ থেকে নিরস্ত থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি এই নির্দেশ শোনেননি। এই শব ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়েই তাঁর হাতে জীবাণু সংক্রমণ হয়। এর ফলে ডায়াবেটিক গ্যাংগ্রিন, যা তাঁর মৃত্যুর কারণ।

(এখানে আরেকটা তথ্য দিয়ে রাখি, প্রতি বছর মেডিক্যিল কলেজে যারা পাশ করত তাদের মধ্যে ৩ জনের বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় দ্বারকানাথ ঠাকুর বহন করতেন।)

বই‍‍: ভারতে পশ্চিমী চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বাঙালি চিকিৎসক- সুবীর কুমার চট্টোপাধ্যায়

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.