ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর (R&AW) সরাসরি তত্ত্বাবধানে গঠিত মুজিব বাহিনীতে কতজন মানুষ ট্রেনিং নিয়েছে তা নিয়ে মতভেত আছে। তবে বিভিন্ন গবেষক ও মুজিব বাহিনীতে ট্রেনিং নেওয়া মানুষদের বয়ানে জানা যায় ৭১-এ মুজিব বাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে ৯-১২ হাজার মানুষ। কিন্তু ১৯৭২-এর ৩১ জানুয়ারি মুজিব বাহিনীর সদস্যরা যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে ‘প্রতিকী অস্ত্র সমপর্ন’ করছে তখন তাদের সংখ্যা ৭০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়। ঢাকা স্টেডিয়ামে ‘সত্তর হাজার মুজিব বাহিনী সদস্যের অস্ত্র সমর্পণ’-এর ঐ ঘোষণাটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক নৈরাজ্যের এক প্রাথমিক পদক্ষেপ, কারণ মুজিব বাহিনীর ঘোষিত সদস্যদের শেখ মণি ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব তসলীম আহমদের স্বাক্ষরে সেসময় মুক্তিযোদ্ধার সনদও দেওয়া হয়। বাস্তব সংখ্যা ও ঘোষিত সংখ্যার এইরূপ দুস্তর ব্যবধান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ চিরতরে দুঃসাধ্য করে দেয়। অন্যদিকে সনদ দানকারী দু’জনের অন্যতম তসলীম আহমদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না। উপরোক্ত ‘প্রতীকী অস্ত্র সমর্পণ’ আরেকটি কারণেও প্রশাসনিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল।
অস্ত্রসমর্পণ শেষে তার বিরাট অংশই আবার বিভিন্ন জেলায় মুজিব বাহিনী সদস্যদের কাছে ট্রাকে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মুজিব বাহিনীর চার শীর্ষ নেতা নিজেদের মাঝে আলোচনার ভিত্তিতেই ‘ভবিষ্যৎ প্রয়োজন’-এর কথা বিবেচনায় রেখে এরূপ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কারণ তখনও এই বাহিনীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ স্পষ্ট ছিল না। বর্তমান লেখক অন্তত একটি জেলায় (মানিকগঞ্জ) অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ঢাকা স্টেডিয়ামে অস্ত্রসমর্পণ শেষে ঐ জেলায় দুই ট্রাক অস্ত্র ফেরত এসেছিল সরাসরি শেখ মণি’র নির্দেশে। পরে অবশ্য ঐ জেলা থেকে ফজলুল হক মণি সমর্থক মুজিব বাহিনী সদস্যরা তাঁদের নেতা মফিজুল ইসলাম খান কামালের মাধ্যমে অনেক অস্ত্র ফেরত দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব বাহিনীর জাসদমুখী অংশ (ঐ জেলায় যাদের নেতৃত্বে ছিলেন আনিসুর রহমান খান) তাঁদের অস্ত্র আর ফেরত দেয়নি। এভাবে প্রায় প্রতি জেলাতে মাঠ পর্যায়ে বিপুল অস্ত্র থেকে যায়- যা পরে জাসদের সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’র সঙ্গে ‘রক্ষীবাহিনী’ ও ‘লাল বাহিনী’র সংঘর্ষে ব্যবহার হয়েছে। (পৃ.২৪০)
অধ্যাপক সৈয়দ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ তাঁর গবেষণাগ্রন্থে লিখেছেন : Most of the 1972 and 1973 recruits lacked such qualification and personal traits as high academie achievements, caliber, integrity and leadership generally demanded of a civil servant.
১৯৭২ সালের জুনে এবং জুলাইয়ে এসে দুটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল এইরূপ ‘স্পেশাল সুপিরিয়র সার্ভিস’-এ নিয়োগের জন্য। প্রথম বিজ্ঞাপন ছিল শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য; দ্বিতীয়টি ছিল শুধু অমুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। একই পদের জন্য হলেও দুটি বিজ্ঞাপনে প্রার্থীদের জন্য শর্ত ছিল ভিন্ন। যেমন অমুক্তিযোদ্ধা প্রার্থীদের জন্য বয়সের শর্ত ছিল ২১ থেকে ২৭; কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সেই শর্ত ছিল অনেক নমনীয়- ২১ থেকে ৩৫ বছর। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিজ্ঞাপনে ৩৫০টি পদের উল্লেখ থাকলেও নিয়োগ পেয়েছিলেন সেখানে ১ হাজার ৩১৪ জন। মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণের শর্তও ছিল অনেক নমনীয়। সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়কের প্রমাণপত্রের বদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের (যে নিজেই যুদ্ধ করে নাই) দেওয়া সনদপত্র হলেও যে কোনো প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত হতেন। (পৃ.২৫৩)
বই: মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ- আলতাফ পারভেজ

