বাংলার দুর্ভিক্ষ:আমি চালের আড়তকে নারীর নগ্নতা বলে ভ্রম করি

ফেব্রুয়ারি মাসে (১৯৭২) একটা প্রস্তাব এসেছিল, খুব সম্ভব কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে; ‘তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গ্রাম কর্মীবাহিনী’ হিসেবে গ্রাম উন্নয়ন প্রচেষ্টায় নিয়োগ করার। এই পরিকল্পনা পাশ হয়নি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বাইরে যুদ্ধের অভিজ্ঞতালব্ধ এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত এ রকম একটি ‘বাহিনী’র হাতে কখনও গ্রামকে ছেড়ে দেওয়া যায় না!… দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইংল্যান্ডে সমাজতন্ত্রের স্তম্ভ ছাড়াই রানীকেও সপ্তাহে একটিমাত্র ডিম খেতে দেওয়া হতো। আমাদের নেতৃবৃন্দ এটুকুও পারলেন না। খুব শিগগির স্পষ্ট হয়ে যায়, কোন আশা নেই। -আনিসুর রহমান, অর্থনীতিবিদ, স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ০১১

১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ (ছিয়াত্তরের মন্বন্তর), ১৮৭০ দশকের খাদ্যাভাব, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ (পঞ্চাশের মন্বন্তর) এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ একমাত্র ঘটনা যেটি উপনিবেশিক শাসনের বাহিরে সংগঠিত হয়েছিল। অতীতে যতগুলো দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে অনাবৃষ্টির সাথে সাথে ব্রিটিশদের শাসনব্যবস্থার দায় ছিল। ’সোনার বাঙলা শ্মশান কেন’ এই স্লোগানের জন্মের ইতিহাস হল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। কারণ ১৭৭০ সালের মন্বন্তরের কারণে বাংলাদেশ ’শ্মশানে’ পরিণত হয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষের একশ বছর পরে উইলিয়াম হান্টারের ’দ্য এনালস অব রুরাল বেঙ্গল (১৮৬৮) থেকে জানা যায়: ১৭৭০ সালের মে মাসের পূর্বেই বাংলার এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ীই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বঙ্গিকচন্দ্রের আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসের মূল তথ্যভিত্তি ছিল হান্টারের এই বই। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমি বোঝার জন্য বঙ্কিমের এই উপন্যাস আজও পাঠ করা যেতে পারে। উপন্যাসটি বিভিন্ন দোষে দুষ্ট হওয়ার পরও ছিয়াত্তরের বাংলার জনজীবন কেমন ছিল তা জানার জন্য আজও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এই বাঙলায়ও পড়েছিল। আর এতেই সংগঠিত হয় পঞ্চাশের মন্বন্তর। আর ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামায়। খাজা নাজিমউদ্দীন সরকারও খাদ্য মজুদ ও মুনাফায় মেতেছিল। সে সময় ৬ টাকা বেশি দরে খাদ্য বিক্রি করে বাংলার মুসলিম লীগ সরকার ৭৫ লাখ টাকা মুনাফা করে। সেই সময়ের দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছিলেন বিখ্যাত জয়নুল আবেদিন। আর মাহবুব আলম চৌধুরীর স্মৃতিচারণ বই ” স্মৃতির সন্ধানে” বইতে দুর্ভিক্ষের বিভিন্ন ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অনেকগুলো গবেষণা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ গবেষণার বই ইংরেজিতে যেগুলোর বাংলা অনুবাদ সম্ভবত হয়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বইগুলো হল- অমর্ত্য সেনের Poverty and Famines, মহিউদ্দীন আলমগিরের লেখা Famine in South Asia: Political Economy of Mass Starvation, মার্টিন র‍্যাভালিয়নের Markets and Famines, অধ্যাপক নুরুল ইসলামের Making of a Nation Bangladesh: An Economist’s Tale এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহানের Politics of Food and Famine in Bangladesh (প্রবন্ধ)।

“লগ্নিকারী, মুনাফাবাজ, এবং কালোবাজারিদের জন্য এই সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে” – দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ই মে, ১৯৭৪।

৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের আগেই বাংলায় ভুখা মিছিল, দুর্ভিক্ষ আসবে এমন ভবিষ্যতবাণী ও রাজনৈতিক বক্তব্য শুরু হয়েছিল। যদিও ৭২ সাল থেকেই সরকার বলে আসছিল দেশে অভাব আছে তবে দুর্ভিক্ষ হওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের সব কিছু মিথ্যে করে দিয়ে ব্রহ্মপুত্র সে বছর ফুঁসে উঠেছিল। বন্যায় আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়া সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ফলে কিছু জেলায় শস্যের ভাল উৎপাদন এমনকি আগের বছর থেকে বেশি উৎপাদন হওয়ার পরও দেশে দুর্ভিক্ষ আটকানো যায়নি। এছাড়া ডলারের রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিউবায় পাট রপ্তানির কারণে মার্কিন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের কবলে পড়ে। তারা খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে দেয়। যদিও মিশর কিউবা রপ্তানি করেও একই দোষে দুষ্টু হয়েও নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয় নাই। কারণ তৎকালীন আনোয়ার সাদাতের সাথে মার্কিন প্রশাসনের ভাল সম্পর্কের দরকার ছিল। এছাড়া বেসরকারি খাতের মজুদদারি প্রবণতা খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্যকে আরো বেশি উস্কে দেয়। ব্রায়ান রেডাওয়ে সীমান্ত এলাকায় গবেষণা চালিয়ে দেখান যে, বিডিআর কর্তৃক চোরাচালানির সময় ধৃত মালামালের মধ্যে খাদ্যশস্যের স্থান ছিল ৬ষ্ঠ অথবা ৭ম স্থানে। এছাড়া বাংলাদেশ অপেক্ষায় ভারতের চালের দাম কম থাকায় চাল পাচারের যৌক্তিকতা কমই হওয়ার কথা।

মওদুদ আহমেদের বইতে আছে শেখ মুজিব সে সময় কোন জনসমাবেশ করেননি। দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার সরকারের উপর জনতার ক্ষোভ ছিল আর তাতে ঘি ঢালে সম্ভবত শেখ মুজিবের দুই ছেলের বিয়ে। কারণ দুর্ভিক্ষ শেষ হওয়ার পর অপুষ্ঠি শরীর নিয়ে জনগণকে ধুমধাম করে বিয়ে দেখতে হয়েছিল। বিদেশী ডকুমেন্টারিতেও এই বিয়ে নেগেটিভভাবে উপস্থাপিত হয়। ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে কত মানুষ মারা গেছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সরকার বলেছিল ২৭ হাজার। তবে বিভিন্ন গবেষণায় ২-৫ লাখ, অনেক জায়গায় ১৫ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা আছে।

ফষ্টি নষ্টি বাদ দে
শক্ত মুঠোয় হাত দে
দাবীর ভাষা চেঁচিয়ে বলুক
হারামজাদা ভাত দে।
(পল্টনের ছড়া- আবু সালেহ)

৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণে কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন ”ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো” কবিতা। নির্মলেন্দু গুণ ৭৩ সালেই অমীমাংসিত রমণী কাব্যগ্রন্থের সর্বগ্রাসী, হে নাগিনী কবিতায় লিখেছিলেন- ”আমি চালের আড়তকে নারীর নগ্নতা বলে ভ্রম করি”। শামসুর রাহমান লিখেছিলেন- ’দুঃসময়ের মুখোমুখি’, আবুল হাসান লিখেছিলেন কাব্যগ্রন্থ ’রাজা যায় রাজা আসে’, আবু সালেহ লিখলেন পল্টনের ছড়া। আর ৭৮ সালে শহীদ কাদরী লিখেন ’কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’। আর হাসান আজিজুল হকের কিছু গল্পে ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের মানুষের কথা উঠে এসেছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ’মধ্যরাতের কাব্যি’ ও ’সরল হিংসা’। কবি ফররুখ আহমদেরও মৃত্যুর দুই মাস আগে বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে কবিতা লিখে যান। অনেকের হয়তো স্মরণে থাকবে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা বেগ-বাস্টার্ড সিরিজের বাস্টার্ডের জন্ম ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময়।

এবার বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে মজার একটা তথ্য দিই। বাংলাদেশে ৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় এতে সরকারী হিসাবে ২৭ হাজার মানুষ আর বেসরকারী হিসেবে ২ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। অথচ এই ৭৪ সালেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি (৭২-৭৩) দেখানো হয়েছিল ৯.৬! মানে সরকারী ডাটা যে কতো বড় ভাঁওতাবাজি এর জলজ্যান্ত প্রমাণ এই রিপোর্ট। মানুষ যখন মারা যাচ্ছিল তখন তাদের ঘাড়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯.৬ শতাংশ। কয়েক বছর আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী সেই প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংসদে দাঁড়িয়েও গর্বও করেন!

“বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন আমলে। দেশের প্রথম বাজেট দেয়া হয় ১৯৭২-৭৩ সালের অর্থবছরে। এরপর ১৯৭৪ সালে দেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭.৭ শতাংশ মতান্তরে ৯.৬ শতাংশ। এরপর আর কোন বছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়নি। জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় এসব কথা উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।”

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতিতে আসে আমূল পরিবর্তন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে; দাম কমে খাদ্যশস্য, কাপড়-চোপড় ও শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের। এ সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা একেবারে আড়ালে চলে যান। ওই বছর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রেখে শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে। (বণিকবার্তার লেখা থেকে)

“… আজ কুড়ি বছর পর স্পষ্ট-অস্পষ্ট স্বপ্নগুলোর কথা মনে হয়। ফিরে এলেন শেখ মুজিব। সবাই তার পিছে কাতারবন্দী। আর কোনো দেশে কোনো মানুষ এতোটা ভালোবাসা পেয়েছিলেন কিনা জানি না। আর কোনো দেশে কোনো মানুষ সাড়ে সাত কোটি লোককে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন কিনা তাও জানি না। শেখ মুজিব যখন ফিরে এসেছিলেন, সাধারণ মানূষ তেমন কিছু চাননি তার কাছে। এমনকি আওয়ামী লীগ শাসন শুরু করলেও বৈধতা নিয়ে জোরালো কোনো প্রশ্ন কেউ উঠায়নি।

কিন্তু সে সময়ই স্বপ্নগুলো গুঁড়িয়ে যেতে লাগলো। শাসকদের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন না তাদের অবস্থা কেমন ছিল? সম্পদ, কর্তৃত্বের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের মনে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, আমরা জানি তখন কি উদ্ধত ব্যবহার করেছিল ছাত্রলীগ। যেমন, আমার বিধবা ফুপুর জমির এক টুকরো লিখে দিতে হয়েছিল এক যুবনেতাকে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুনয় করেও কোন ফলোদয় হয়নি।

এ প্রসঙ্গে একথাও বলা দরকার — সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে আমলের শেখ মুজিবের সরকারের কৃতিত্বকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আমরা হয়েছিলাম অপমানিত। সাধারণ মানুষের কথা বাদ দিই । তাদের সঙ্গে, যে কথা আগেই বলেছি, কেউ ছিল না, এখনও নেই। এই আমরা কারা? রণজিৎ গুহের ভাষায় বলতে হয়, যারা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত নন, ক্ষমতার বিন্যাস: অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক/প্রশাসনিক মতাদর্শগত দিকের সঙ্গে যারা যুক্ত নন — তারা।

১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আভাব, অনটন, অশান্তি, নিরাপত্তাহীনতা সবই ছিল। কিন্তু এসবের মধ্যেও তীব্র হয়ে বেজেছিল যেটি, সেটি হচ্ছে, নতুন এক অপমান। হঠাৎ দেখি সাড়ে সাত কোটির মধ্যে এক লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা। বাকি সব? কেউ বলেনি তেমন করে; কিন্তু এক ধরণের হীনমন্যতাবোধ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল আমাদের মধ্যে, যারা ছিলাম দেশের মধ্যে। নিমিষেই একথা সবাই বিস্মৃত হলো যে, আমরা না থাকলে গেরিলারা থাকতো না। বিষয়টি আরো বেদনাদায়ক হয়ে উঠলো যখন দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সনদপত্র, বিশেষ পুরুষ্কার (তা যে ফর্মেই হোক) বরাদ্দ হচ্ছে। সাত কোটি মানুষ কেমন যেন অপাংক্তেয় হয়ে গেল মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে। এরপর বাকশাল। এর দোষগুণ নিয়ে বিতর্কের অনেক কিছু হয়ত থাকতে পারে; কিন্তু একটি কথা সবার তখন মনে হয়েছিল — যে গণতন্ত্রের জন্য এতো রক্ত তা যেন হঠাৎ করে বৃথা হয়ে গেল।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিকা-ফলাফল নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনী নিয়ে অতিরঞ্জন হয়েছে অনেক, কিন্তু এর মধ্যে সত্যও যে ছিল তাতো অস্বীকার করার উপায় নেই। শুধু তাই নয়, যারা খুন করেছিল আমাদের বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনদের, তাদের অধিকাংশ মুক্তি পেতে লাগলো, এক সময় সবাই ক্ষমাও পেয়ে গেল। অথচ অনেক বিধবা, এতিমের কান্না শুকোয়নি তখনও। এর কারণ কি এই যে যারা শাসক ছিলেন তাদের সন্তান-সন্ততি বা আত্মীয়স্বজনদের প্রায় কোনো ক্ষতি হয় নি তখন?

আমরা তখন তেমন কিছু চাইনি। কিন্তু এগুলো ঘটেছিল। এগুলো ছিল এক ধরণের অপমান — যার জ্বালা মোটামুটি বোধসম্পন্ন মানুষের কাছে ক্ষুধার জ্বালা থেকে কম নয়। এ মন্তব্য একপেশে, একরৈখিক শোনাবে। আমি জানি মানুষের বঞ্চনার বিষয়টি আরো বড়; তত্ত্বের সঙ্গে তা জড়িত। আমার এ হালকা ফ্রেমওয়ার্কে বিষয়টি আসছে না। কিন্তু সাধারণ মানূষ মিছিলে যায় প্রত্যক্ষ কোনো ঘটনার অভিঘাতে। সেখানে বুদ্ধি থেকে আবেগ কাজ করে বেশি। একথা কি সত্যি নয় যে ১৯৫২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত যে অগণিত মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন তাদের সবাই ছিলেন অতি সাধারণ মানুষ। তারা কি জানতেন না যে নেতারা কখনও প্রাণ দেন না এবং কথাও রাখেন না। তবুও তো তারা গেছেন এবং প্রাণ দিয়েছেন। কারণ, প্রত্যক্ষ কোনো ঘটনা তাকে উজ্জীবিত করেছে, খুলে দিয়েছে তার ঢেকে রাখা ক্রোধ প্রকাশ্যে।

আওয়ামী লীগ শাসনের অভিঘাত এখনও লোকে ভুলতে পারেনি দুটি কারণে। প্রথমত, তখন সদ্য স্বাধীন দেশ, মানুষ দেশের জন্য কিছু করার জন্য পাগল। অধিকাংশ মানুষের তখন সোনার বাংলা গড়ার আকাঙ্খা। ফলে ছোট কোন ঘটনা, ছোট কোনো ভুল বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল মানূষের মনে। রটনা হয়েছে যথেষ্ট; কিন্তু আওয়ামী লীগ তা মোকাবেলা করতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ছিল দেশজোড়া সংগঠন — তৃণমূল পর্যায়ে। ফলে মাস্তানি বলি আর কর্তৃত্বের অপব্যবহারের কথা বলি, তা পৌঁছেছিল গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত। যদি তা না-ই হয় তাহলে মানুষ কেন নামেনি রাস্তায় স্বত:স্ফূর্তভাবে যেদিন সপরিবারে নিহত হলেন শেখ মুজিব? এ হত্যাকান্ড তো একমাত্র তুলনীয় হতে পারে হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে।

এভাবে সোনার বাংলার স্বপ্নের উপাদান — ছোট বাড়ি, দুটো কাপড়, দু’বেলা খাওয়া, রাতে নিশ্চিন্তে ঘুম, খাকিদের হাত থেকে নিষ্কৃতি, রাষ্ট্রের অকথ্য জুলুম বন্ধ — সবই যেনো আবার ফিকে হয়ে যেতে লাগলো॥”

— মুনতাসীর মামুন / ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতায় থাকা ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ । পৃ: ৮২-৮৪ ]

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.