সিরাজ সিকদারকে কারা ধরিয়ে দিয়েছিল?

সিরাজ সিকদার কীভাবে ক্রসফায়ারারে নিহত হলেন তা অনেকেই জানি। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করা এই নেতা কীভাবে ধরা খান ও কারা তাকে ধরিয়ে দেন তা নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয়। আজ আমরা দেখব সিরাজ শিকদারকে কারা ধরিয়ে দেন।

এক লাইনে যদি উত্তর হল- তার নিজের পার্টির লোকেরা। শওকত  মাসুমের লেখা ’বিপ্লবের ভেতর-বাহির’ সিরিজ ও ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত কে. এ. কবিরের ’সিরাজ সিকদার হত্যার নেপথ্য কাহিনী’ লেখায় বিশ্বাসঘাতকদের বিভিন্ন পরিচয় মেলে। দুই লেখার কিছু অংশ এখানে উপস্থাপন করা হল।

১৯৭৫ সালের প্রথম দিন, ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামে হালিশহরের কাছে এক গোপন শেল্টার থেকে একজন পার্টি কর্মীসহ সিরাজ শিকদার যাচ্ছিলেন আরেকটি শেল্টারে। বেবিট্যাক্সি নিয়েছেন একটি। সিরাজ শিকদার পড়েছেন একটি দামী ঘিয়া প্যান্ট এবং টেট্রনের সাদা ফুল শার্ট, চোখে সান গ্লাস, হাতে ব্রিফকেস। যেন তুখোড় ব্যবসায়ী একজন। বেবি ট্যাক্সিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একজন অপরিচিত লোক এসে তার কাছে লিফট চায়, বলে তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ্, ডাক্তার ডাকা প্রয়োজন, সে সামনেই নেমে যাবে। শিকদার বেশ কয়েকবার আপত্তি করলেও লোকটির অনুনয় বিনয়ের জন্য তাকে বেবিট্যাক্সিতে তুলে নেন। চট্টগ্রাম নিউমার্কেটের কাছে আসতেই অপরিচিত লোকটি হঠাৎ লাফ দিয়ে বেবিট্যাক্সি থেকে নেমে ড্রাইভারকে পিস্তল ধরে থামতে বলে। কাছেই সাদা পোশাকে বেশ কয়েকজন অপেক্ষমান পুলিশ স্টেনগান উঁচিয়ে ঘিরে ফেলে বেবিট্যাক্সি। স্বাধীন বাংলাদেশের দুর্ধর্ষ বিপ্লবী, যথেষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও তার দলের সদস্যেরই বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে। সিরাজ শিকদারকে হাতকড়া পড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ডাবল মুরিং থানায়। সেদিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ ফকার বিমানে তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা। তাকে রাখা হয় মালিবাগের স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসে। সরকারের ত্রাস, বহুল আলোচিত, রহস্যময় এই মানুষটিকে এক নজর দেখবার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্য, আমলাদের মধ্যে ভিড় জমে যায়। ৩ জানুয়ারি সারা দেশের মানুষ পত্রিকায় পড়ে, ‘বন্দি অবস্থায় পালানোর সময় পুলিশের হাতে নিহত হন পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত একটি গুপ্ত চরমপন্থী দলের প্রধান সিরাজুল হক শিকদার ওরফে সিরাজ শিকদার’। ছাপানো হয় সিরাজ শিকদারের মৃতদেহের ছবি।

এক ব্যক্তি নির্ভর দল:

১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বহারা পার্টি পুরোপুরি এক ব্যক্তি নির্ভর হয়ে পড়ে। ওই সময়ে দলে এক সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই একমাত্র সদস্য হলেন সিরাজ সিকদার। এই একক নেতৃত্ব নিয়েই দলের মধ্যে গ্রুপিং ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ধরা পড়েন তিনি এবং নির্মমভাবে নিহত হন। তাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার জন্য দায়ী করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। তিনিও নিহত হয়েছিলেন বাকশাল গঠনের পর। এই বাকশালও ছিল এক ব্যক্তি নির্ভর।

সর্বহারা পার্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা রইসউদ্দিন আরিফসহ দুজনকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল দল থেকেই। আসুন দেখা যাক, তিনি কি বলেছেন: ‘সে সময়কার সিলেট অঞ্চলের পরিচালক পার্টির তৎকালীন নেতৃস্থানীয় ক্যাডার কমরেড মনসুর নানা কারণে পার্টি নেতৃত্বের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এ ক্ষোভকে কেন্দ্র করে পার্টির ভিতরে সংগ্রাম পরিচালনার উদ্দেশ্যে মনসুর কিছু প্রস্তাব এবং পরিকল্পনা প্রনয়ন করেন। তার এ প্রস্তাব ও পরিকল্পনার বিষয়টি অবহিত করার জন্য তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক কমরেড ইকরামকে একটি চিঠি পাঠান। কিন্তু ইকরামকে লেখা এ চিঠিখানি ভুলবশত অন্য একটি প্যাকেটে পার্টির নেতার হাতে চলে যায়। ফলে মনসুর বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান। এই বিব্রতকর অবস্থার একপর্যায়ে মনসুর দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সিলেট থেকে অতিদ্রুত চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রাম এসেই নাটকীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেন কমরেড সিরাজ সিকদারকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়ার। জানা যায়, একপর্যায়ে কমরেড সিকদারের বৈঠকের স্থান ও যাতায়তের পথের বিবরণ দিয়ে ছোট্ট একখানা চিরকুট লিখে ডবলমুরিং থানায় পাঠান। সেই চিরকুটের সূত্র ধরেই পুলিশ কমরেড সিরাজ সিকদারতে গ্রেফতার পরে।’

এবার আমরা ফিরে যেতে পারি পুরোনো কিছু কথায়। দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিলেন সিরাজ সিকদার নিজেই। দলে কেউ বিদ্রোহ করলে তাকে বহিস্কার বা অন্য কোনো পথ অবলম্বন না করে খতম করার ধারাটি শুরু করেছিলেন সিরাজ সিকদার নিজেই। ফজলু-সুলতান গ্রুপকে খতম করার মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায় শুরু হয়েছিল। আবার স্মরণ করতে পারি রইসউদ্দিনের আরিফের সেই কথাগুলো। ‘পার্টিতে বাহাত্তর সালে ফজলু খতম হয়েছিল আকস্মিকভাবে। পার্টির স্থানীয় কর্মী ও গেরিলারা কেন্দ্রের অনুমোদন ছাড়াই ফজলুকে খতম করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি পরে ফজলু খতমের বিষয়টিকে অনুমোদন করে এবং এহেন কাজকে অভিনন্দিত করে। অথচ আমার মতে সে সময়ে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সঠিক করণীয়টি ছিল একদিকে ফজলু-সুলতান চক্রের পার্টিবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সংগ্রাম জোরদার করা এবং একই সাথে ফজলু খতমের ঘটনাকে নিন্দা করা। পার্টি যদি সেদিন এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালনে সক্ষম হতো, তাহলে সর্বহারা পার্টির ইতিহাস লিখিত হতো ভিন্নভাবে।’ চট্টগ্রামের মনসুর জানতেন দলে বিদ্রোহ বা বিক্ষুব্ধ হওয়ার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। ফলে যখন সে জানলো তার চিঠিটি অন্যহাতে পড়েছে তখন তার জন্য আর কোনো বিকল্প ছিল না। নিজে বাঁচার জন্যই যে মনসুর সিরাজ সিকদারকে ধরিয়ে দিয়েছিল তা দলের ভেতর থেকেই স্বীকার করা হয়। ফলে পুরানো কথাটাই আবার বলি, ফজলু-সুলতান গ্রুপকে খতম করা না হলে হয়তো সর্বহারা পার্টির ইতিহাস অন্যরকম হতো, হয়তো বেঁচে থাকতেন সিরাজ সিকদার। হয়তো বেচে থাকতেন কবি হুমায়ুন কবিরসহ আরও অনেকেই।

শৃঙ্খলা লংঘন:

১লা জানুয়ারি সিরাজ সিকদার নিজেই শৃঙ্খলা লংঘন করেছিলেন। তার লেখা পার্টির সাংগঠনিক দলিলে উল্লেখ ছিল, কোনমতেই দিনের বেলা কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী প্রোগ্রাম করতে পারবে না। এ শৃঙ্খলা সিরাজ সিকদারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য ছিল।’ ৭৪-এর ১৬ ডিসেম্বর সফল হরতালের পর সরকারি বাহিনী হন্যে হয়ে উঠেছিল, তখন সমগ্র পার্টির কর্মীরা সিরাজ সিকদারের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ উদ্বিগ্ন ছিল। স্ব-আরোপিত শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তিনি পহেলা জানুয়ারি ম….. এর সঙ্গে বৈঠকে দিনের বেলায় উপস্থিত ছিলেন। দিনের বেলায় ঐ বৈঠকে যদি না যেতেন, তাহলে সরকারি বাহিনীর পক্ষে তাকে ট্রেস করা দুঃসাধ্য ছিল।

বিশ্বাস হন্তা চিঠি সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তারের প্রচলিত ধারণার মাঝে একটি বিশ্বাস হন্তা চিঠির অস্থিত্ব ঘুরে ফিরে এসে পড়ে। সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনৈক ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসার বিভিন্ন জায়গায় গল্পচ্ছলে এরকম একটি চিঠির ধারণা দিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, স্বাক্ষর বিনে চিঠির প্রেরক পার্টির ভেতরের লোক। চিঠির হাতের লেখা মেয়েলি ধাঁচের। পার্টি’র অভ্যন্তরের লোক না হয়ে সিরাজ সিকদারকে ধরিয়ে দেয়া সহজ নয়, এটা বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু প্রেরক মেয়ে এই যুক্তি অনেকাংশে টেকে না। এ ধরনের প্রচারণা খুবই স্বাভাবিক। তবে একটা বিশ্বাস হন্তা চিঠি সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তারের জন্য দায়ী, তা আরো অনেক সূত্র সমর্থন করে। চিঠির প্রকৃত ভাষাটা কি তা জানা না গেলেও বিষয়বস্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে কিছুটা আঁচ করা যায়। সম্বোধন এবং স্বাক্ষরবিহীন চিঠিটা ৭৪-এর ৩০ ডিসেম্বর নাকি পুলিশের হাতে আসে। যতটুকু জানা যায়, চিঠিতে সিরাজ সিকদারের গোপন শেল্টার এবং বৈঠকের জায়গার আশেপাশের রাস্তার উল্লেখ ছিল। তাছাড়া প্রেরক সিরাজ সিকদারের শারীরিক বর্ণনারও উল্লেখ রয়েছে। এমনকি তার সামনের দাঁতের মাঝখানের ফাক, হাতের এটাচি এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ধরনও উল্লেখ রয়েছে। চিঠির শেষ দিকে সিরাজ শিকদারের নাম উল্লেখ না করে প্রেরক জানিয়েছে এই লোক একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক। পাওয়া যাবার সময়ও চিঠিতে উল্লেখ ছিল। একজন প্রভাবশালী আমলা দাবি করেছেন, তিনি চিঠিটি নিজের চোখে দেখেছেন। তাঁর মতে চিঠির প্রেরক মহিলা না পুরুষ এ ধারণা করতে পারেনি তবে প্রেরক রাজনৈতিক কর্মী।

কারণ হস্তাক্ষর পোস্টার লিখিয়েদের মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এ চিঠির অস্তিত্ব যদি বাস্তবে থেকে থাকে তাহলে বিনা দ্বিধায় ধরে নিতে হবে চিঠির প্রেরক সিরাজ সিকদারের ঘনিষ্ঠ এবং পার্টির উচ্চপদস্থ কর্মী। কারণ নিচের স্তরের কর্মীর পক্ষে সিরাজ সিকদারের বৈঠকের সময়, তাঁর শারীরিক বর্ণনা এবং শেল্টার চেনা কোন মতেই সম্ভব ছিল না। সিরাজ শিকদারের সঙ্গে শেল্টারে অবস্থানকারী কয়েকজন এবং শেল্টারের বাইরের স্বল্পসংখ্যক কর্মীরাই শুধু বৈঠকের খবর জানতো। সংগত কারণেই এরাই শুধু সন্দেহের আওতায় পড়ে। সিরাজ শিকদারের শেল্টার তখন কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তার সঙ্গে থাকত কেন্দ্র হিসাবরক্ষক আ..আ… সিরাজ সিকদারের সঙ্গেই গ্রেপ্তার হন। সে জীবিত না মৃত আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। তবে এটা সঠিক, সে জেলে নেই। আ….. ছাড়া ছিল চার মহিলা। তারমধ্যে সিরাজ শিকদারের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী জাহানারা হাকিম এবং সদ্য বিবাহিত তিন নম্বর স্ত্রী ও অন্য দুইজন মহিলা কর্মী। এই দুই কর্মী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অনুবাদ, কপি এবং ফাইল সংরক্ষণের কাজ করতেন। এছাড়া পহেলা জানুয়ারির বৈঠকের সময়সূচী এবং স্থান জানতো ম…, খ….এবং ই…….। চিঠিটা কে সত্য ধরে নিলে এরা প্রায় সবাই সন্দেহভাজন ব্যক্তি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন চিঠিটা সঙ্ঘবদ্ধ কোন কাজ নয়, এটার প্রেরক একজনই। উল্লেখিত সন্দেহভাজনদের প্রায় প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ ছিল। তাদের সঙ্গবদ্ধ হয়ে এমন মারাত্মক আত্মঘাতী কাজ করার কোন কারন ঘটেনি এবং এটা ছিল রিস্কি গেম।

আকবর কী পুলিশকে তথ্য দিয়েছিল?

সিরাজ সিকদার এর সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কেন্দ্রিয় হিসাবরক্ষক আকবর। গ্রেপ্তারের পর এ পর্যন্ত তার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। অনেকের ধারণা, আকবরই বিশ্বাসঘাতক। সে যোগসাজশ করে এ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। পরে রক্ষীবাহিনী এটা ধামাচাপা দিতে গিয়ে তাকেও মেরে ফেলেছে। সর্বহারা পার্টির অনেক কর্মীর ধারণা, আকবর বেঁচে আছে। সে মোটা চাকরি নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছে। আকবরের পদ ছিল প্রায় সাহায্যকারীদের সমপর্যায়ের। আবার সে ছিল সিরাজ সিকদারের প্রিয়ভাজন ব্যক্তি। সে কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটাবে তার মোটিভ সম্পর্কে তেমন যুক্তিসঙ্গতঃ কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে সরকারি প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়ে কিছু করা বিচিত্র কিছু নয়। তার বিপক্ষে সন্দেহ দৃঢ় হওয়ার মতই আরো কিছু কারণ রয়েছে। সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর বরিশালের সর্বহারা পার্টির এক নেতৃস্থানীয় কর্মীর কাছে আকবরের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় রিপোর্ট করে রাতে আকবরের লাশ কে বা কারা আকবরের ঘরের সামনে ফেলে রেখে গিয়েছিল। সকালে রক্ষীবাহিনী সে লাশ নিয়ে যায়। উক্ত কর্মীর সন্দেহ হওয়ায় সে রিপোর্টের সত্যতা যাচাই করতে চেষ্টা করে। তবে এই রিপোর্টের পক্ষে কারো কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া যায়নি। আকবরের আত্মীয় যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আকবরের মৃত্যুর খবর প্রচার করে, তাহলে ধরে নেয়া যায় আকবর দোষী। কিন্তু আকবরের বিপক্ষ থেকে পক্ষেই যুক্তি বেশি। আকবর যদি যোগসাজশ করে, তাহলে চিঠি আসে কোথা থেকে? আর চিঠির প্রেরক যদি সে হয়, তাহলে সে ঘটনার সময় সিরাজ সিকদারের সঙ্গে ছিল কেন? যোগসাজশ করলে আর একটা প্রশ্ন থাকে। পুলিশ শুধু সিরাজ সিকদারকে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকত না। সিরাজ সিকদারের লেটার এবং আকবরের জানা সব তথ্য বের করে নিত। স্পষ্টতই বোঝা যায়, এরকম হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত পুলিশ ট্রেস করতে পারেনি সিরাজ সিকদারের বৈঠক কোন বাড়িতে ছিল অথবা শেল্টার কোনটা ছিল? আকবর বেঁচে আছে কি নেই এই রহস্য টা বের করতে পারলে সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর রহস্য টা অনেক সহজ হয়ে উঠবে।

মানসিক রোগী:

জাহানারা হাকিম ছিল সিরাজ সিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী। ‘৭৪-এর অধিবেশনে সাহায্যকারী গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হতে না পেরে তার রোমান্টিক মোহ অনেকটা ফর্সা হয়ে যায়। অতীত জীবনের কারণে পার্টির কঠোর নিয়ম শৃংখলার মধ্যে তার বিতৃষ্ণা বেড়ে গিয়েছিল। তদুপরি পার্টির গ্ল্যামারহীন জীবন সে সহজভাবে নিতেও পারেনি। সিরাজ শিকদারকে একবার পিস্তল দিয়ে তারা করেছিল। এ কাহিনী কতটুকু সত্য, তা জানা যায়নি। তবে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছিলেন, এটা সঠিক। একজন মানসিক রোগীর পক্ষে বলা সম্ভব, তিনি ক্যান্সারের কারণ এবং ঔষধ আবিষ্কার করেছেন। এজন্য আরো বিস্তারিত গবেষণার জন্য তিনি সিরাজ সিকদার থেকে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছিলেন। এরপরই সিরাজ সিকদারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং সিরাজ সিকদার তৃতীয় বিয়ে করেন। ফলে জাহানারা হাকিমের পক্ষে ঈর্ষাকাতর হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ঈর্ষাকাতর একজন মানসিক রোগী দুর্ঘটনা ঘটাতে দ্বিধা করার কথা নয় । পুলিশ অফিসারের বক্তব্য অনুযায়ী প্রেরক যদি মহিলা হয়, জাহানারা হাকিমের বিপক্ষে যুক্তি ধোপে টেকার কথা। বলা হয় জাহানারা হাকিমের সঙ্গে বর্তমানে সিরাজ সিকদারের পরিবারের সম্পর্ক ভালো। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে সিরাজ সিকদারের সন্তান জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও তাকে বাদ দিয়ে জাহানারা হাকিমকে পুত্রবধূ হিসেবেই তারা স্বীকৃতি দিয়েছে। সিরাজ সিকদারের জীবিত কালে তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত। বলতে গেলে কোন যোগাযোগই ছিল না। সিরাজ সিকদার তার পরিবারের নিষ্ঠুর সমালোচনা করতেন।

সন্দেহের তীর:

“সিরাজ সিকদার এর মৃত্যুর পর পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির অধিকাংশ কর্মী খ.., আ…, ই…. চক্রকেই দায়ী করত। পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির দু’অংশের একাংশ এখনো তাই মনে করে। এই তিন জনের মাঝে তারা খ…কে বেশি দায়ী মনে করে। খ…এর বিপক্ষে তাকে দায়ী করার যুক্তিই বেশি। যেহেতু সে ছিল সিরাজ সিকদারের প্রায় একান্ত সচিবের মত। বাইরের কর্মীদের সঙ্গে সভাপতির যোগাযোগ এবং বৈঠকের ব্যবস্থা করাই তার দায়িত্ব। এ কারণে সে সভাপতির শেল্টার চিনত এবং পহেলা জানুয়ারির বৈঠকের খবরও জানতো। সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর সে তার সম্পর্কে আজেবাজে মন্তব্য করেছে, এথেকেই প্রমাণ হয়, সে সিরাজ সিকদারেরর প্রতি ক্রুদ্ধ ছিল। থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ এর আগে পার্টিতে বিভিন্ন কারণে তার দু’বার পদাবনতি ঘটে। তার বিপক্ষে তৃতীয় শক্তিশালী প্রমাণ হচ্ছে প্রভাবশালী আমলার বর্ণিত চিঠির হস্তাক্ষরের মত তার লেখা গোছানো ও পরিষ্কার। এতগুলো শক্তিশালী যুক্তি তার বিপক্ষে থাকলেও তাকে সন্দেহের আওতামুক্ত করা যায় শুধুমাত্র সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর তার ভূমিকার জন্য। বিশ্বাসঘাতকের জঘন্য অপবাদ এবং মৃত্যুর মতো চরম শাস্তি মাথায় নিয়ে সে অনেকদিন পর্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পার্টিতে লেগে থেকেছিল। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিরাপরাধ না হলে মৃত্যুভীতি উপেক্ষা করে এরকম দৃঢ়তা দেখানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তদুপরি সিরাজ সিকদারের প্রতি তারা যত বিতৃষ্ণায় থাকুক না কেন, তার সমমানের কোন কর্মী সিরাজ সিকদার বিহীন সর্বহারা পার্টি কল্পনা করতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ পার্টিতে আরো অনেকের মতো খ…এর নাম্বার ওয়ান শ্রেনী শত্রু ছিল ম…। সিরাজ শিকদারের গ্রেফতারের জন্য চরম শাস্তি মাথায় নিয়ে সে অনেকদিন পর্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পার্টিতে লেগে থেকেছিল। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিরাপরাধ না হলে মৃত্যুভীতি উপেক্ষা করে এরকম দৃঢ়তা দেখানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তদুপরি সিরাজ সিকদারের প্রতি তারা যত বিতৃষ্ণায় থাকুক না কেন, তার সমমানের কোন কর্মী সিরাজ সিকদার বিহীন সর্বহারা পার্টি কল্পনা করতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ পার্টিতে আরো অনেকের মতো খ…এর নাম্বার ওয়ান শ্রেনী শত্রু ছিল ম…। সিরাজ শিকদারের গ্রেফতারের জন্য খ…যদি তাই হতো তাহলে ম… কোনমতেই রেহাই পেত না। তবে এটা ঠিক, সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর পর সে নানা জায়গায় তার স্বভাবসুলভ বাচালতায় সিরাজ সিকদার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছে। এই যুক্তিও তার বিপক্ষে টেকে না। কারণ দোষ হলে অত সহজে সে মুখের লাগাম ছাড়তে পারতো না।”

আরো একটি চিঠি :

“অবৈধ প্রস্তাব বিস্তার করে একক কেন্দ্রীয় কমিটি বানানোকে অনেক সচেতন কর্মীদের কাছে দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। এছাড়া পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে অনেক কর্মী সিরাজ সিকদারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম…এবং চট্টগ্রামের ই… ও ছিল এ দলে। দু’জনে গোপনে সিদ্ধান্ত নেয় যে এক সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবর্তে বর্ধিত এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে পার্টিতে জনমত গঠন করবে এবং পরবর্তী অধিবেশনে ব্যাপারে সভাপতি সিরাজ সিকদারকে চাপ করবে। কিছুদিন পরে এ কাজের কি ধরনের অগ্রগতি হচ্ছে, তা জানতে চেয়ে ই ..ম-এর কাছে চিঠি লেখে। চিঠিটা পড়ার পর ম…. তা হারিয়ে ফেলে। চিঠিটা হারানোর ফলে তার বদ্ধমূল ধারণা হয়, তার পাঠানো মাসিক রিপোর্টের সঙ্গে চিঠিটা ভুলক্রমে সিরাজ সিকদারের কাছে চলে গিয়েছে। সে দারুণভাবে ঘাবড়ে যায়। কারন সে জানে, চিঠিটা সভাপতির হস্তগত হলে উভয়ের মৃত্যুদণ্ডই পাওনা হবে। এমনিতেই তারা দু’জন সভাপতির বিরাগভাজন ব্যক্তি। সঙ্গে সঙ্গে সে এর পরামর্শের জন্য চট্টগ্রাম চলে আসে। দু’দিন খোঁজাখুঁজির পর ই…কে বের করে। আরো দু’দিন তারা পরামর্শ করে। ম… সিলেট ছেড়ে চট্টগ্রাম এসেছে, পার্টির আর কেউ তা জানতো না। চট্টগ্রামের পরিচালক হিসেবে দুর্ভাগ্যক্রমে ই… সভাপতির ১ জানুয়ারির বৈঠকের খবর জানতো। তাই তারা দু’জনে প্রথমে সভাপতি সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা নেয়। তবে এ পরিকল্পনা যে কার্যকর করা যাবে না, তা তারা দু’জনেই ভালো করে জানতো। প্রচন্ড ব্যক্তিত্ববান সিরাজ সিকদারের দিকে পিস্তল উচু করা তার পার্টির কোনো কর্মীর জন্য প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল। দুশ্চিন্তা এবং নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়েই তাদের দুর্বিষহ প্রহরগুলো কাটছিল। পরিশেষে তারা সিদ্ধান্ত আসে ভারত হয়ে তারা বাইরে কোথাও পালিয়ে যাবে। কিন্তু এরই মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। দুর্ঘটনার দিন রাতে এসে ম.. ই… কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে বাচ্চা ছেলের মত কেঁদে উঠে বলে, তাকে দিয়ে বিপ্লব হবে না। সে জঘন্য কাজ করেছে, সভাপতিকে ধরিয়ে দিয়েছে। এই কাহিনী জেলে একজন সহকর্মীর কাছে ই… বলেছে। এই কাহিনী অনেকাংশে বিশ্বাসযোগ্য। ব্যাপারটা চিঠির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। চিঠিতে সিরাজ সিকদারের শেল্টারের উল্লেখ না করে বৈঠকের আশে-পাশের রাস্তার উল্লেখ থাকায়ও ধারণা করা যায় প্রেরক ম….। সে সিরাজ সিকদারের শেল্টার চিনতো না। ই… থেকে বৈঠকের এবং শেল্টারের আশে-পাশের জায়গা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে। আবার ই….এর কাহিনী পুরোপুরি বিশ্বাসও করা যায় না কারণ জেলে যাওয়ার আগেও সে দুর্ঘটনা সম্পর্কে নাকি নানা ধরনের কাহিনী ফেঁদেছে। তবে হতে পারে নানা ধরনের গাল-গল্প, তার বিবেকের যন্ত্রণার প্রলাপ। ম…. বেঁচে থাকলে হয়তো ই…. কে যাচাই করে নেওয়া যেত।”

বিচিত্রায় প্রকাশিত কে. এ. কবিরের ’সিরাজ সিকদার হত্যার নেপথ্য কাহিনী’ লেখার উপসংহারে লেখেন-সিরাজ সিকদার আজ দল-মত-নির্বিশেষে কাছে একজন শহীদ দেশ প্রেমিক নেতা। সরকারি- বেসরকারি প্রায় সব দলের মৃত্যুবার্ষিকীতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করে। তাই সভাপতি দেশের আপামর জনসাধারণ একজন দেশ প্রেমিক মৃত্যুর প্রকৃত রহস্যটা জানতে চাইবে। এ ব্যাপারে সরকার এগিয়ে না আসা পর্যন্ত প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.