আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার উকিল আব্দুস সালাম খান কেন পাকিস্তান ভাগ হোক চায়নি

গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া আবদুস সালাম খান (১৯০৬ – ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ এবং পূর্ব পাকিস্তান বঙ্গ আই পরিষদের সদস্য। তিনি মুসলিম লীগ দিয়ে এবং পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। মতবিরোধের কারণে তিনি মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং লীগের কার্যনির্বাহী কমিটিতে নির্বাচিত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৯ সালের অভ্যুত্থানে জড়িত ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৯ সালের অভ্যুত্থানে জড়িত ছিলেন। ১৬৬৯ সালে তিনি নুরুল আমিনের পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে যোগ দেন। তিনি দলটির প্রাদেশিক ইউনিটের সভাপতি নির্বাচিত।

আব্দুস সালাম যে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন না তা মুসলিম লীগের সাবেক জয়েন্ট সেক্রেটারী ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীবের বইতে বিস্তারিতভাবে জানতে পারি। সেখানে শেখ মুজিবের পরিবার নিয়েও একটা তথ্য আছে। তিনি বলছেন- ফরীদপুরে শেখ মুজিবের পূর্ব পুরুষদের হিন্দুদের সাথে দস্তুর মতো লড়াই করে অস্তিত্ব টিকাতে হয়েছে এ কথা প্রয়াত শেখ মুজিব এক একান্ত সাক্ষাতে আমার কাছে উল্লেখ করেছে। সে সাক্ষাতে অধ্যাপক গোলাম আযমের প্রয়াত চাচা শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলো। তারা দু’জন কলকাতায় পড়া লেখার সময় একত্র মুসলিম ছাত্রলীগ করেছে।

“এখানে একটি ঘটনা বললেই ব্যাপারটি একটু স্পষ্ট হয়ে যাবে। সম্মিলিত পাকিস্তানের শেষের দিকে আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন কালে আমি সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রাদেশিক জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলাম। তখন আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম খান সভাপতি ছিলো। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতিও আব্দুস সালাম খান ছিলো। তখন শেখ মুজিব ছিলো সাধারণ সম্পাদক। পরে ৬ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে আব্দুস সালাম খান শেখ মুজিবের সাথে দ্বিমত হয়ে পৃথক হয়ে যায়। তারপরই আগরতলা ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে, ও শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়ে তার উপর দেশদ্রোহীতার মামলা শুরু হয়। আব্দুস সালাম খান নামকরা উকিল ছিলো। আমার সাথে তার খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। আব্দুস সালাম খান শেখ মুজিবের পক্ষের প্রধান কৌশলী হয়। অটুট পাকিস্তানের সমর্থণ হওয়া সত্ত্বেও আব্দুস সালাম খান শেখ মুজিবের পক্ষ অবলম্বন করে। তার কারণও খান আমাকে বলেছে যে, শেখ মুজিব তার আত্মীয়, আজীবন রাজনৈতিক সঙ্গী ও মামলাটি রাষ্ট্রদ্রোহীতার, তাই সকল রাজনৈতিক পার্থক্য সত্ত্বেও তাকে প্রধান ডিফেন্স লইয়ার হতে হয়েছে। মামলা চলাকালীন একদিন আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে আগরতলা মামলার সত্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত ইভিডেন্স বর্ণনা করলো। আমি শুনে যাচ্ছি তার কথা। আব্দুল সালাম খান রাতের বেলা চেম্বার ছেড়ে তার বাড়ীর দোতালায় এক গোপন রূমে দরজা জানালা বন্ধ করে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলার গোপন তথ্য বলছিলো। কারণ তখনো ঐ মামলার তথ্যাদি এতো টপ সিক্রেট ছিলো যে তা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে ভয় পেতো। কারণ তা ফাঁসির যোগ্য রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা। আমি তার মূল বক্তব্য শুনতে চাইলাম, যেজন্য ড্রাইভার ছাড়া নিজে গাড়ী চালিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে আমাকে গুলশানে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো।

উত্তরে খান সাহেব বললো যে সব রাজনৈতিক পার্থক্য ত্যাগ করে দেশ প্রেমিকরা একত্র না হলে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে। সব শুনে আমি শান্ত ভাবে আব্দুস সালাম খানকে বললাম যে পাকিস্তান ভেঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান ভারতের সাথে মিলে গেলে তার অসুবিধা কোথায়? সে তো কোনো সাত্বিক মুসলিম নয়! বরং আধা হিন্দু! উত্তরে সে বললো যে সে আমার মানদন্ডে মুসলমান না হলেও ভিতরে কট্টর মুসলিম। হিন্দুদের সাথে কোনো অবস্থাতেই সমঝোতা হতে পারে না। কারণ, স্বরূপ সে তার ব্যক্তিজীবনের একটি ঘটনা বললো যে সে ফরিদপুরের প্রথম মুসলিম ছাত্র, যে এ্যান্ট্রেন্স পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বৃত্তি পেয়েছিলো। সে কৃতিত্বে তাকে ফরীদপুর শহরবাসী একটি র‍্যালে বাই সাইকেল পুরস্কার স্বরূপ দিয়েছিলো। তখনকার দিনে সে পুরস্কারটি বর্তমানে একটি দামীগাড়ি পুরস্কারের তুল্য ছিলো। সে সাইকেল চড়ে উঠতি যৌবনে ভালো জামা-কাপড় পরে শহরে যখন বের হতো, তখন নাকি শহরের মানুষরা তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। এরূপ প্রমোদ ভ্রমণে একদিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুর্ঘটনা বশতঃ একটি ব্রাহ্মণের মেয়ের সাথে তার সাইকেলের হ্যান্ডেল লেগে গেলে মেয়েটির পানির কলসি ভেঙ্গে যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাকি শহরে প্রায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। আব্দুল সালাম খান তার অভিভাকবৃন্দ ও শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে ক্ষমা চেয়েও নাকি সেবার ক্ষমা পায়নি। মেয়েটিকে গঙ্গাস্নানে পাঠিয়ে পবিত্র করে ওখানেই কোলকাতায় তাকে পাত্রস্থ করেছে। তাই হিন্দুদের সাথে কোনো প্রকারেই সহ অবস্থান অকল্পনীয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তাকে এমনভাবে বিচলিত করেছে যে সে যেনো তার ছোট্টবেলায় ঘটে যাওয়ার দৃশ্য তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। তাই সে ভাবছে যে তার সমমনা আওয়ামী লীগের সঙ্গীদের নিয়ে জামাতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে হলেও পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা করতে হবে। কারণ, মুসিলম লীগের সে সাংগঠনিক শক্তি নেই যে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে পুনঃ সুদৃঢ় করতে পারে। জামাতে ইসলামের আদর্শিক বন্ধন ও সাংগঠনিক কাঠামো পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে গেলেই পাকিস্তানকে টিকানো যাবে। তার কথা শুনে আমি বললাম যে পাকিস্তানের শাসন, সেনা বাহিনীর চাকুরী, সরকারী চাকুরী ও আন্তঃ প্রদেশীয় উন্নয়নে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ন্যায় অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ফলে ভারত পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য আগরতলা দিয়ে হাত বাড়িয়েছে। এ ন্যায্য পাওনা না দিলে ভারত, পাকিস্তান অটুট রাখতে সাহায্য করলেও অটুট থাকবেনা। মওদূদী ও তার জামাত ডিসপ্যারেটী হয়েছে এবং হচ্ছে এ সত্য স্বীকার করেনা। আর এ অভিমত সম্পর্কে আমার সরাসরি জানা ছিলো। আমি পশ্চিম পাকিস্তান সফরে গিয়ে বিভিন্ন সভায় বৈষম্য দূর করার উপর দ্ব্যর্থহীন জোর দিয়ে বক্তব্য রাখার পর তখনকার জামাতে ইসলামীর পার্লামেন্টারী কমিটির দু’সদস্য সিদ্দিকুল হাসান গিলানী ও গোলাম জিলানী তাদের তৈরী করা তথ্যের বস্তা নিয়ে আমার সাথে তর্কে বসে। আমাদের লোকেরা উর্দুতে বাতচিত করা লোকদের সাথে আলাপ আলোচনা কালে প্রায় দেখা যায় হীনমন্যতায় ভোগে। ঐ দু’পাঞ্জাবী ভেবেছিলো আমিও তাদের মতো হবো। কিন্তু শক্ত করে পাল্টা ওদের ধরলে তারা চুপ মেরে যায়। কিন্তু আমার লাভ হলো যে আমি জামাতীদের পেটের রোগ টের পেয়ে গেলাম। সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি আব্দুস সালাম খানকে আরো চিন্তা ভাবনা করতে বলে চলে আসলাম। তারপরও প্রবীন, ধীরস্থির ও বুদ্ধিদীপ্ত লোকটি আমার সাথে তার দলের আরেক ব্যক্তি জুলমত আলী খানকে নিয়ে এ বিষয়ে বিশেষভাবে আলাপ করেছে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে আব্দুস সালাম খানের মতো একজন সিকিউলার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাও পাকিস্তানের সংহতি ও অখন্ডতা নিয়ে কতোটুকু উদ্বিগ্ন হলে জামাতে ইসলামীতে যোগ দেয়ার মতো কথা ভাবতে পারে? তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় জিন্নার সাথে মিলে ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শেখ মুজিবরা কী পরিস্থিতি হলে ভারতের সাথে আগরতলা ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ বানাতে হাত বাড়ায় তা ভাববার বিষয় নিশ্চয়।”

[এ হ‌’লো ইসলাম-ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৩৫]

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.