নামের বিড়ম্বনা, গোলাম আযম ও অন্যান্য

মাঝরাতে ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীবের একটা বই খুঁজে পেলাম। তোয়াহা বিন হাবীব ছিলেন পাকিস্তানপন্থী ধনী রাজনীতিবিদ। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলীয় ঐক্য জোটেরও জয়েন্ট সেক্রেটারী ছিলেন। ছিলেন মুসলিম লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারীও। যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব সংক্ষেপে হোয়াহা বিন হাবিব। এই লোককে নিয়ে গুগলে তেমন কোন তথ্য খুঁজে পেলাম না। তার বই- এ হ’লো ইসলাম বইতেও লেখক পরিচিতি নেই। স্বাধীনতার পর তোয়াহা কেন্দ্রীয় মজলিশে সুরা বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন দলের সদস্য হন। একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থের ৮০ পৃষ্ঠায় বলা আছে, ‘খেলাফত আন্দোলনের বর্তমান ও সাবেক কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় সকলেই স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন। এদের মধ্যে কুখ্যাত দুজন হচ্ছেন তোয়াহা বিন হাবিব এবং আখতার ফারুক। দুজনই কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।’ এই দুইজনের কবর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানেও আছে। তা নিয়ে অনেকে আবার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যদিও তোয়াহা বিন হাবিব কী কী অপরাধ করেছেন তার কোন বিস্তারিত বর্ণনা নেই। তবে তোয়াহা বিন হাবিব নিজের বইতে স্বীকার করেছেন যে অনেক চেষ্টা করেও তিনি তার ছোট দুই ভাইকে জামাতের রাজনৈতিক ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে পারেন নাই। ফলে ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানীদের পক্ষে আলবদর দলে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন।

ইসলামপন্থী রাজনীতি করার কারণে ইসলামপন্থীদের সাথে তার যোগাযোগ সবসময় ছিল। আর এই কারণে তার বইতে ইসলামপন্থী নেতাদের অনেক অজানা ইতিহাসের সন্ধান মেলে। জামাতের লোক কীভাবে তার টাকা মারল, বাঙালির অর্থহীন নাম, গোলাম আজমের পরিবারে মাথা খারাপের রোগের ইতিহাস থেকে বিভিন্ন ইন্টারেস্টিং ঘটনার বর্ণনা আছে। বইটি মূলত নবী মুহাম্মদ ও ইসলামের ইতিহাস দিয়ে শুরু। তারপর কীভাবে ইসলামের নামে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ল তা লেখক বর্ণনা করেছেন। লেখক আব্বাসী খেলাফত থেকে শুরু করে ওহাবী ও বর্তমান ইসলামকে খুবই কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। আরবের জোব্বাকে সামনে রেখে যে ইসলামের বিস্তার হচ্ছে তা যে নবী মুহাম্মদের ইসলামের মূল স্পিরিট নয় তাই লেখক বার বার বলার চেষ্টা করেছেন। সেই সাথে ইসলামের দুশমনেরা কীভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের নষ্ট করেছে সেগুলো নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। পাকিস্তান ভাগ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও ছিল তীব্র ক্ষোভ। আর এসব ইতিহাস ও আলাপের ফাঁকে বিভিন্ন মানুষ ও ইতিহাস নিয়েও আলাপ করেছে সেই আলাপের কয়েকটি ইতিহাস এখানে তুলে ধরছি।

আরবি নামের বিড়ম্বনা

“আমাদের “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” ওয়ালা মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতের নাম মুহিবুল হাসান, জুলমত আলী ও হায়েজুর রহমান। এদের নামের অর্থ জানলে এরা ঘর থেকে বের হতে লজ্জাবোধ করতো। আমাকে একবার মোহাম্মাদ কোতব আমাদের দেশের নামের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলো যে তোমাদের দেশে যে আরবি নাম রাখে, তার অর্থ বোঝার মতো লোকও কি তোমাদের দেশে নেই? গোলাম আযম, সাজ্জাদ হোসেইন, গোলাম হোসেইন ও মুহিবুল হাসান এ সমস্ত নাম কি করে ডাকা যায়?

চিন্তা করে আমি খুবই লজ্জিত হই। সে সময় জিয়াউর রহমানের এক মন্ত্রী সৌদি আরব সফররত ছিলো। হতভাগার নাম ছিলো মুহিবুল হাসান। অর্থাৎ যে হাসানকে ভয় দেখায়। গোলাম আযম অর্থৎ মহা দাস, সাজ্জাদ হোসাইন অর্থাৎ সর্বদা যে হোসাইনকে সিজদা করে। সে সময় পাকিস্তানবাদী আওয়ামীলীগ নেতা জুলমত আলী লন্ডন থেকে মক্কা এসে আমার কাছে উঠে। তাকে মানুষের কাছে পরিচিত করতে গিয়েই বিপদে পড়ি। আলীকে আরবরা জ্ঞানের নগরী বলে জানে। আর আমাদের বাঙ্গালী জুলমত আলী, আলীর মূর্খতার অন্ধকার! অধ্যাপক গোলাম আযমও মক্কায় একবার দুঃখ করে আমাকে বলেছে যে আরবদের নিকট তার নাম বলতে তার লজ্জা বোধ হয়। আমার সামনেই তাকে তার গাড়ীর আরবি ড্রাইভার “ইয়া গোলাম” বলে ডেকেছে। মক্কায় তার ও টেলিফোন বিভাগে কার্যরত এক বাঙ্গালী ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে তার অফিসে তুলকালাম কাণ্ড বাধে। উত্তরবঙ্গের এ লোকটির নাম ছিলো হায়েজুর রহমান। সাধারণ অর্থে “আল্লাহর মাসিক”। লোকটি আমার কাছে আসলে আমি আরবিতে তার নামটি “হাজত” অর্থাৎ “প্রয়োজন” ধাতু থেকে তৈরি বলে তাকে কোনো প্রকার মুখরক্ষার পথকরে দেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালীন ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ সাজ্জাদ হোসাইন তখন মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীরত। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা গোলাম আযম তখন মক্কার ইখওয়ানী ও ইসলামী সার্কেলে একজন পরিচিত ব্যক্তি।” (পৃ.৩৮২)

গোলাম আযম ও চাঁদা আদায়ের খয়রাতী নেটওয়ার্ক

“ভাষা আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের উপর, জীবিত কী মৃত, আল্লাহ গযব ও লানত হোক। অবশ্য এর মধ্যে গোলাম আযমও একজন। শয়তানের প্ররোচনায় জাতিকে মূর্খ ও বর্বর রাখার জন্য ভাষা আন্দোলন করে আমাদের হাজার বছর পিছিয়ে রেখেছে।”

“গোলাম আযম মিথ্যা কথা বলেছে যে সে তার শিক্ষকরা আরবিতে ক্লাসে লেকচার দিতে পারেনি বলে সে আরবি ত্যাগ করে পুনঃ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়ালেখা করে সময় নষ্টের ফলে অনার্স পড়তে পারেনি। আসলে সে বিয়েপাগল হয়ে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে শিক্ষা বছরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। ফলে অনার্স ছাড়াই তাকে পাস কোর্সে গ্রাজুয়েট হতে হয়েছে। তার ছোটো ভাই মাহদী ১৯৬৩-৬৪ সালে বিয়েপাগল হলে পর তার চাচা শফীকুল ইসলাম আমাকে অধ্যাপক আযমদের চার ভাইয়ের মধ্যে ডাঃ গোলাম মোয়ায্যম ব্যতীত তিন ভাইয়ের পাগল হওয়ার ঘটনা সবিস্তারে বলেছে। ঐ সময়ে একদিন আমি সম্মিলিত বিরোধী দলের অফিসে বসা। এক অল্প বয়সী ব্যক্তি আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করে “শফীক মিয়া আছে, শফীক মিয়া”? আমি তার বয়স ও শফীকুল ইসলামের বয়স তুলনা করে একটু হতভম্ব হয়ে গিয়ে ভিতরে গিয়ে তাজুদ্দীন সহ অন্যান্য নেতাদের সাথে বৈঠকরত শফীক সাহেবকে খবর দিলে শফীক সাহেব বের হয়ে এসে তার এক ভাতিজাকে বাসায় টেলিফোন করে আরেক ভাতিজা গোলাম মুকাররামকে ডেকে এনে মাহদীকে বাসায় পৌঁছিয়ে দেয়। তারপর শফীক সাহেব তার ভাতিজাদের পাগল হওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করে।”

[এ হ‌’লো ইসলাম-ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ. ৩৭৩]

এখানে বলে রাখা ভাল- অনেকের জানা থাকার কথা, গোলাম আজম রংপুরের কারমাইকেল কলেজে কয়দিন শিক্ষকতা করেন। তিনি কখনো অধ্যাপক হয় নাই। কিন্তু গ্রামের মানুষ কলেজের প্রভাসক ও অধ্যাপকের তফাৎ কী তা জানে না। ফলে তারা বেবাককেই ভুল করে অধ্যাপক ডাকে। তবে সারা জীবন ইসলামের নামে রাজনীতি করা গোলাম আযম কখনো বলে নাই তিনি যে অধ্যাপক না। অর্থাৎ অধ্যাপকের মিথ্যা টাইটেল তিনি উপভোগ করতেন আর সেই অধ্যাপকের উপাধী নিয়েই কবরে গেলেন।

“অধ্যাপক গোলাম আযমের সাথে, তার চাচা মরহুম শফীকুল ইসলামের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট সম্পর্কের সুবাদে প্রায় পারিবারিক জানাশুনার মতো পরিচয় হলেও মুসলিম লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারী হিসেবে যখন আমি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলীয় ঐক্য জোটেরও জয়েন্ট সেক্রেটারী হই, তখন অধ্যাপক গোলাম আযম জেনারেল সেক্রেটারী হয়। তখন আমরা পরস্পরকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চিনার সুযোগ পাই। আর উভয়ের পারিবারিক ইসলামী ঐতিহ্যের ফলে আমাদের উভয়ের সম্পর্কে প্রায় ভাই ভাইর মতো ঘণিভূত হয়। আমাদের উভয়ের মাঝে পড়ে আব্দুস সালাম খান ইসলামী চরিত্রের লোকদের প্রতি প্রায় দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু জামাতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে কেন্দ্রীয় নেতাদের মনোভাব জেনে আমি তাদের সঠিক পরিমাপ বুঝে ফেলি। পশ্চিম পাকিস্তান সফর করে ওদের সাথে মিশে ওদের ব্যাপারে আমার ধারণা আরো পাকা হয়। তাই মওদুদী সহ পশ্চিম পাকিস্তানী জামাত নেতাদের আমি আউটকাষ্ট বলে ধরে নেই। কিন্তু একাত্তরে আমি অধ্যাপক গোলাম আযম ও তার নেতৃত্বে জামাতে ইসলামীর কর্মকান্ডে প্রায় বজ্রাহত হই। একাত্তরে অধ্যাপক গোলাম আযমের ভূমিকা সম্পর্কে আমি “আমার একাত্তুর পূর্ব ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের” আলোচনায় কিছুটা বিস্তারিত আলাপ করবো আশা রাখি। তাতে এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করবো, ইনশা আল্লাহ্। এখন আমি আমার মক্কী জীবনের বর্ণনায় ফিরে যচ্ছি। আমি অধ্যাপক আযমের মৌলিক ইসলামী ভিত অনির্ভরযোগ্য জেনে মক্কা কেন্দ্রিক কাজে মাওলানা আব্দুর রহীমকে সঙ্গে পেতে চাই। শেষ পর্যন্ত মাওলানা আব্দুর রহীম নেপাল থেকে মক্কা আসলো। তাকে দেখে তার কথা-বার্তা, চলাফেরা ও আচরণ দেখে আমি হতবাক হয়ে যাই। মাওলানা স্যুট-টাই পরা, খালি মাথা! একের পর এক চুরুট ফুঁকছে। চেনা লোকেরা সালাম করে দু’ হাত বাড়িয়ে মুসাফাহা করতে চাইলে মাওলানা এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলে “আমি মিষ্টার আব্দুর রহীম, মাওলানা আব্দুর রহীম নই, ইত্যাদি!” পরে বুঝলাম যে বাংলাদেশ হওয়ার পর মাওলানা পাকিস্তানী শাসকদের সাথে জামাতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও সমান ভাবে দায়ী করায় পাঞ্জাবী ও মুহাজির জামাতীরা তার সাথে দুর্ব্যবহার করায় মাওলানা তাতে বেঁকে গিয়ে ভারসাম্যতা হারিয়ে ফেলে। এটা নিশ্চয়ই এদের জামাতী চরিত্রে আল্লাহর সাথে বৈষয়িক লেনদেনের সম্পর্ক মুখ্য এবং আব্দ ও মাবুদের সম্পর্কহীনতার কারণে। এ রোগেই ইয়াহুদীরা অভিশপ্ত হয়েছে। আল্লাহর সাথে বান্দার দাস-মনিবের সম্পর্ক হতেই হবে। তবেই রূহানী তাঈদ বা সমৃদ্ধি নসীব হয়। আমি যতো জামাতী নেতা, পাতিনেতা ও যুবককর্মীকে দেখছি, এ দানে সবাই দেউলিয়া। তখনো, এখনো। আমার সাথে অধ্যাপক গোলাম আযম ও মাওলানা আব্দুর রহীমকে না পেলেও ভেবেছিলাম যে যেহেতু মাওলানা আব্দুর রহীম আলেম মানুষ, ঘটনার আকস্মিতায় শোকাহত হয়েছে বটে, পরে হয়তো আরেক ধাককা খেয়ে শুধু প্রকৃতস্থই হবেনা, বরং রূহানী দিকে দর্শনের দিগন্ত ও উম্মোচিত হবে। মাওলানা ঐ অবস্থায় মক্কা থেকে পুনঃ কাঠমুন্ডু চলে এলো। তারপর বাংলাদেশে চলে এলো। ও দিকে অধ্যাপক গোলাম আযম তার পাকিস্তানপ্রীতি ও পাকিস্তানীদের, বিশেষ করে পাকিস্তানী জামাতে ইসলামীর আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও চাঁদা আদায়ের খয়রাতী নেটওয়ার্কের খাতিরে আমাকে খুব মাইন্ড ভাবে বুঝাতে দু’একবার এ্যাটেম্পট নিলো যে, পাকিস্তানের ভুল ও ইয়াহইয়া খান ও তার সৈন্য বাহিনীর লুচ্চামী লাম্পট্যের প্রসঙ্গটা বাদ দিলে হয়না? আমি দৃঢ় দীপ্ত ভাবে তাকে জানালাম যে, এ কথা না বললে পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য আল্লাহকে দায়ী করা ছাড়া উপায় নেই! কারণ, তাতে প্রমাণ হয় যে, জিন্নাহ থেকে ইয়াহইয়া খান পর্যন্ত সবাই ভালো ছিলো। আল্লাহ্ অন্যায় ভাবে না হলেও, অন্ততঃ খাম-খেয়ালী করে ইসলামী বা রিপাবলিক অফ পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দিয়েছেন! আল্লাহ্র পর ধরাতে ইসলামী পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য বাঙ্গালীরা ও শেখ মুজিবুর রহমান দায়ী। পশ্চিম পাকিস্তানীরা কেউ দায়ী নয়!? আমাকে পূর্বেও অধ্যাপক আযম মোটামুটি চিনতো। এবার নখ দিয়ে চিমটি কেটে দেখলো যে আমার সত্য বলে সত্যের উপর অটল থাকা চামড়ার উপর তাদের মতো প্রসাধনের প্রলেপ নয়, হাড় মজ্জার টনটনে ফিত্রাত। তাই প্রফেসর আযম তার ভিক্ষার থলেটা নিয়ে কাবায় করা শপথ ভেঙ্গে “রিয়েল পথ ত্যাগ করে রিয়াল, দীনার, ডলার ও পাউন্ডের” আকাশে পাখা মেললো। এখন মনে হয় সে পাখা ভেঙ্গে সত্যের মাটিতে নামার সময় আসছে। তাই আল্লাহ্ তাঁর বান্দাকে দিয়ে তা লেখাচ্ছেন। তাই এ লেখা কেরামান কাতিবীনের ডাইরীর পাতা

[এ হ‌’লো ইসলাম-ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ. ৩৪৫]

এদের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেনো এরা ইসলামী পড়া লেখা করে মহাভুল করেছিলো। তাই বাপদাদার ইসলামী বিদ্যায় কিছু ইসলামী কথাবার্তা বলে এবং সে মতো কিছু সাহিত্য সৃষ্টিকরে তা প্রচারের মাধ্যমে লোক জড়ো করে কিছু অর্থ উপার্জন করে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন করে তওবা করেছে যে, তাদের বংশে আর কোনো মোল্লা বানাবেনা। যেমন গোলাম আযমের বাপদাদা কাজীগিরি করে পয়সার মুখ দেখে তাদের ছেলেদের একজনকেও আর মাদ্রাসায় পড়িয়ে আলেম বানায়নি। কারণ তারা দেখেছিলো যে মোল্লাদের বিয়ে পড়ালে নির্ধারিত ফীর উর্ধ্বে উপরি পাওয়া যায় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে মূল ফী পেতেও কষ্ট হয়। তাই ছেলেদের প্রফেসর, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে আখের গুছিয়ে নিয়েছে। তারপর ধর্মীয় জলসা ও তাফসীর মাহফিল করার জন্য পয়সার জোরে মাওলানা সাঈদী, কামালউদ্দিন জাফরী ও আবুল কালাম আযাদের মতো কিছু মোল্লা রিজার্ভ করে কাজ চালানোর বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। ঈমান ও ইসলাম কারো ভিতরে প্রবেশ করলে তো সারা দুনইয়ার চেয়ে বেশি গর্বের বস্তু হয় তার নিকট দ্বীনি ইলম! প্রত্যক্ষ ক্বোরআন শিক্ষার চেয়েও কি কোনো ইলম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে? কখনো নয়। ইসলাম বনী আদমের সাম্যতা শিক্ষা দেয়। তাক্বওয়ার ভিত্তিতে ইমামত দান করে। দ্বীন ও দ্বীনি শিক্ষার চেয়ে কেউ যদি অন্য শিক্ষাকে সম্মানজনক মনে করে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করেন বলে রাসূল সঃ বলেছেন। দ্বীনি ইলম বর্জিত শিক্ষিত লোকদের ক্যাডার তৈরি করে গদী দখলের রাজনীতির ফল একাত্তরের পরাজয় এবং বর্তমান শোচনীয় পরিণতির কারণও তা বললে কি তাকে ভুল মূল্যায়ন বলা যাবে? মূল ক্বোরআন ধরে রাসূল সঃ এর আদর্শ অনুসরণ না করলে ইসলামী আল্ল বা ন্যায় নীতি মজ্জায় ঢুকেনা। যেমন কোরেশীদের মধ্যে প্রবেশ করেনি।

[এ হ‌’লো ইসলাম-ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৩৪]

জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে

ইরানের শিয়া মুস্তাকবির মোল্লা আয়াতুল্লাহদের “তাক্বিয়া” নামের মুনাফেকীর ফলে আল্লাহ তাদেরও ইরানের চৌহদ্দীর মধ্যে বন্দী করেছেন। আফগানিস্তানের সুন্নী মোল্লাদেরও গৃহ বিবাদে লিপ্ত করে আল্লাহ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এ সুযোগে সকল বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদমুক্ত যায়দ ও উসামাহদের মুস্তাদআফ বাহিনী তৈরীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আফগান সীমান্ত থেকে পূর্বে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিশ্বমুক্তির মুস্তাদআফ সৈনিক তৈরীর পথে প্রধান বাধা তিনটি। তা, যথাক্রমে মুয়াবিয়া, মারওয়ান ও ইয়াযীদের সুন্নী তালেবান, মওদূদীবাদের গণতন্ত্রী তথা রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের ইসলাম ও ভারতীয় রামরাজ্যের শিবসেনা। গভীর অর্থে সত্যকথা বললে এ তিনটি একদল ও এরা পরস্পরের সহায়ক “হিবুশ শয়তান”, সাম্প্রদায়িক শির্ক থেকে এদের জন্ম। সাম্প্রদায়িক তাওহীদী ঐক্যের পথে এরা সমভাবে বাধা। এদের মধ্যে ইসলামের নাম নেয়া মওদূদী জামাত ও তালেবান জামাত “খেলাফত আলা মানহাজিন্ নবুওত” অর্থাৎ নবী সঃ এর আদর্শে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিদার। এদের ব্যাপারটি সোনার পিল্লা কলস”। নবুওতের আদর্শে খেলাফত কি করে হয়??!! নবী তো কোনো খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে যাননি? তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইমামত ভেঙ্গে যে খেলাফত নামের বর্ণবাদ দাঁড় করা হয়েছিলো, তার সাথে নবী সঃ ও তাঁর নবুওতের সম্পর্ক কোথায়? এ তো ঘোড়ার ডিম! নামে আছে, কামে নেই। এ ডিমে তা দিয়ে দীর্ঘ ১৪১২ বছর ধরে কোনো ঘোড়ার বাচ্চা হয়নি। ঘোড়ার বাচ্চার নামে হিংস্র নেকড়ে ও হায়নার পাল জন্ম দিয়ে এ যাবত মুসলিম উম্মাহকে তাদের খাদ্য রূপে ব্যবহার করা হয়েছে। আর নয়। উপমহাদেশে সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য আল্লাহর রহমতের ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লবী উত্থানের পথে যেমন মুঘল পাঠান বাদশাহ ও সুলতানদের বিকৃত ইসলাম ছিলো, তারই প্রেতাত্মা মওদূদী জামাত ও সুন্নী কট্টর মোল্লাদের তালেবান টাইপ সন্ত্রাসী ধ্যান ধারণা। তন্মধ্যে মওদূদী জামাত রাজনৈতিক ক্ষমতা লোভ ও অর্থনৈতিক ভোগবাদের এক বিকৃত সামাজিক ব্যাধি। সত্যিকারের ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকায় উপনিবেশবাদের আস্তাকুঁড়ে জন্মানো দেশীয় চোর বাটপারদের উপনিবেশীয় দুঃশাসনে নিরাশ ইসলামী যুবশক্তিকে বিকৃত মুখরোচক মওদূদীর হাকীকত সিরিজের চটিবই দিয়ে এদের শিকার আরম্ভ হয়।

ইখওয়ান ও জামাতীরা ১৯২৪ সালে উৎখাত হওয়া তুর্কী সুলতানাত ও ভারতের মুঘল-পাঠান দস্যুলুটেরাদের শাসনকেও ইসলামী শাসন বলে মানে ও প্রচার করে। মুস্তাদআফ চিন্তাধারাহীন এদের বই পুস্তক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড, এদের মধ্যেই মুস্তাদআফ ও মুস্তাকবির সৃষ্টির একটি নির্লজ্জ জঘণ্য পৈশাচিক প্রক্রিয়া। এদের কেন্দ্রীয় নেতারা চরম প্রাচুর্যের জীবন যাপন করে তাদের ছেলে- মেয়েদের ব্যয়বহুল লেখা পড়া করায়। নেতাদের ছেলে ও মেয়েদের বিয়ে-শাদীতে তাগুত মুস্তাকবিরদের লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে দাওয়াত দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। তাদের বিয়ের মজলিসে কাফের মুশরিকদের মতোই উলঙ্গ নরনারীর বেপর্দা মাংস প্রদর্শনী হয়। অথচ দলের মাসিক চাঁদা দেয়া নিঃস্বার্থ ত্যাগী কর্মী ও সমর্থকদের একটি খেজুর ও একগ্লাস পানি দিয়ে বিবাহ মজলিসে আপ্যায়ন করা হয়। রাজনৈতিক পেশী প্রদর্শনে এদের নেতাদের সন্তানরা আসে না। ফলে তাদের লাশও পড়েনা। তারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে দরিদ্রের লাশ পড়ার অপেক্ষায় থাকে। লাশপড়া মাত্র এদের কর্মতৎপরতা আরম্ভ হয়। জানাযা ও গায়েবী জানাযা শুরু হয়ে এক আধটি শোকসভা করে বক্তৃতারত নেতাদের ছবি তুলে নিজস্বব্যাঙ্ক-বীমার অঢেল ধনে স্মারক ও ক্রোড়পত্র ছেপে আবার নতুন লাশ পড়ার অপেক্ষায় থাকে। এদের জাহিলিয়‍্যাতের স্বার্থদ্বন্দ্বে যারা মরে ও মারে, উভয়ই সন্দেহাতীত জাহান্নামী, যেমন উষ্ট্র ও সিফফীনের যুদ্ধের সংঘটকরা ছিলো। এদের ষড়যন্ত্র না বুঝে যারা এদের দাজ্জালীর মিথ্যা প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে মারা যায়, এরাই ক্বেয়ামতের দিন এদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদী হয়ে নেতা-নেত্রীদের জাহান্নামে পাঠাবে। জামালযুদ্ধ ও সিফীনের আম্মারদের অনুসারী মুস্তাদআফদের কুচক্রী মুস্তাকবিরদের হাত থেকে রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে কুচক্রী নেতাদের মুখোশ উন্মোচন “ফরজে আইন” হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এদের স্বরূপ উদঘাটনের জন্য সূরা তওবার আলোকে এদের আড়াল করা চেহারা এ বইতে তুলে ধরা হচ্ছে। মাওলানা মওদূদী একজন ইসলামী সাহিত্যিক ছিলো। একজন লেখকের কোনো বিষয়ে কিছু জানা শোনা ও সচল কলম থাকলেই সে সাহিত্যিক হয়ে যায়। তাদের লেখনীর সাথে আসল ও চরিত্রের কোনো সামঞ্জস্যের প্রয়োজন থাকে না। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে তিনটি জিনিস সর্বপ্রথম একত্র হয়ে একাকার হয়ে যেতে হয়। তা হলো ঈমান, আমল ও রূহানিয়াত। প্রথম দু’টি ঠিক কিনা, তার প্রমাণই হলো তৃতীয়টি। তৃতীয়টি অর্জিত হলে সে ব্যক্তি ও তার অনুসারীরা কথা ও কাজে ডিগবাজী খাবে না। যেমন রাসূল সঃ গণ ও তাদের মুস্তাদআফ অনুসারীরা খায়নি। অন্যরা অহরহ ডিগবাজী মেরেছে। নবী চরিত্রের মাধুর্য বুঝে তাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে আল্ ক্বোরআনে ডুবে গেলেই সে অবস্থা ও অবস্থান সৃষ্টি হয়। তা না হলেই মিথ্যা হাদীসের আশ্রয় নিয়ে তরীকাত, মারিফাত ও হাক্বীক্বাত প্রভৃতির ভোজবাজীর দোকান ও প্রকাশনী খুলতে হয়। আসল হাক্বীকত যাদের কাছে খুলে যায়, তারা মওদূদীর হাক্বীক্বাত সিরিজের টোটকা বিজ্ঞাপন বাজারে ছাড়েনা। সরাসরি ঈমান, আমল ও রূহানিয়াতের ঘোষণা দিয়ে মানুষকে কোরআন দিয়ে আল্লাহর দিকে ডাকে। যেমন নবীরা করেছেন

হাসানুল বান্না, সাইয়েদ কুতব ও মওদূদীরা যেহেতু রিসালাত থেকে বিচ্যুত খেলাফতী রাজনীতির ধারক বাহক, তাই তারা ক্বোরআনের মূল শিক্ষা, মুস্তাকবির ও মুস্তাদআফ সূত্রই খুঁজে পায় নি। ফলে তাদের সকল শক্তি, প্রতিষ্ঠিত মুস্তাকবির উৎখাত করে নিজেরা মুস্তাকবির হওয়ার সংগ্রামেই নিঃশেষ হয়ে পরাজয়ের পর পরাজয় ভাগ্যের লিখন হচ্ছে। মিশর, আলজেরিয়া, সুদান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যা হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে কি আমার কথা সঠিক প্রমাণ হচ্ছেনা? আমি আশ্চয্য হয়ে লক্ষ্য করেছি যে, এদের কারো লেখনী, চিন্তা ও চেতনা কোথাও বারাকাহ, যায়দ, বিলাল, ইবন মাসউদ, আম্মার, সালমান ও উসামাহ এবং তাদের মুস্তাদআফ ডায়মেনশন বা দিক দর্শন নেই!! أفلا يتدبرون القرآن أم على قلوب أقفالها এরা কি কোরআনকে কোরআনের মতো অধ্যায়ন করেনা, না এদের অন্তর সমূহে তালা মারা রয়েছে? (সুরা মুহাম্মদ- ২৪) হাসানুল বান্না ও সাইয়্যেদ কুতবরা আরবী ভাষাভাষী হওয়ায় তাদের লেখনীতে ক্বোরআনের বাচনিক কিছু ধারা দেখতে পাওয়া যায়। মাওলানা মওদূদীর তাফহীমূল কোরআন সাদা-মাটা সাহিত্যের মানে ভাসা ভাসা ক্বোরআনী জগতে পর্যটন। কোথাও স্থির অবস্থানের গভীর আকর্ষণ ও দিক নির্দেশনা নেই। কারণ, পুরো ক্বোরআনই মুস্তাকবির ইবলিস্ ও তার জামাত নমরূদ, আদ, সামূদ, আইকা, ফিরআউন, আবু জেহেল, আবু সুফইয়ান, আবু লাহাব ও বর্ণবাদী ইয়াহুদ এবং তাদের উত্তরসূরী মুস্তাকবিরদের বিরুদ্ধে মুস্তাদআফদের পক্ষে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের ওয়াদার বর্ণনা। নবী রাসূলগণ সমকালীন মুস্তাকবিরদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেরা মুস্তাদআফ হয়ে নির্যাতন ভোগ করে তারপর আল্লাহর সাহায্যে মুস্তাকবির আদ, সামুদ, নমরুদ ও ফিরআউনের এমন ভাবে নির্মূল করে গিয়েছেন যে তাদের স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর বিশ্বে তাদের কোনো চিহ্ন নেই। সে শ্রেণীর মুস্তাদআফ্ না হলে কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে মুস্তাকবির নিধনের সাহায্য আসেনা, আসবেনা। মাওলানা মওদূদী সাহিত্যিক ইসলামের সিরিজের হাক্বীকৃত চর্ম, মাংস ও অন্তর স্পর্শ করে শিহরণ জাগায় না। তাই সে সিরিজের আবেদন ইন্জেকশনের সিরিঞ্জের মতো দেহে ত্রুটিপূর্ণ ঔষধ প্রবেশ করালেও তাতে অজ্ঞতা ও জাহিলিয়্যাতের রোগ নিরাময় হয়না। ঔষধ আংশিক কাজ করেই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে রোগীকে আরো জটিল রোগের কোলে ঠেলে দেয়। একমাত্র কোরআনের সরাসরি ঔষধই মু’মিনদের নিরামায়ক ও রহমত। (2) وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ ভাষা সাহিত্যের আবেদনে দ্বীনের ভাসা ভাসা জ্ঞান আসার পর রূহানী ভাবে ক্বোরআনে প্রবেশ না করলে বস্তুবাদী টেকনিক্যাল ধার্মিক হওয়া যায়। যেমন ইয়াহুদী, খৃষ্টান, উমাইয়া, আব্বাসী ও মুঘল ভোগবাদীরা হয়ে আল্লাহর দ্বীনকে কলঙ্কিত করেছে। এরা বদ এবং এদের ধর্ম বদ্বীন। বদ্বীন বেদ্বীনের চেয়ে খারাপ। রাসূল সঃ এ বদ্বীন সম্পর্কেই তাঁর নওমুসলিম আবু বকর ও উমরদের বারবার সতর্ক ও সাবধান করে গিয়েছেন। তুলনামূলকভাবে মুস্তাদআফরা পূর্ণান্তকরণে আল্লাহর দ্বীন কুবুল করেছিলো বলে রাসূল সাঃ তাদের প্রতি বেশী আস্থাশীল ছিলেন। কোরেশী গোত্রবাদী খেলাফতের প্রবক্তা বিধায় মাওলানা মওদূদী ইসলামের মূলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি। ফলে তার অনুসারী জামাতী নেতা কর্মীদের ঈমানও মূলে গ্রথিত হয়নি। তাই তার বৃক্ষ আকাশে ডালা পালা ছড়িয়ে ফলবান হতে পারেনি। যা কোরআনে বলা হয়েছে। ঈমানের ভিত ঠিক হলে তা আকাশে বিস্তৃত হয়ে সর্বদা ফলবান হয়।

[এ হ‌’লো ইসলাম-ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ. ৩২৮-৩৩০]

মওদূদী জামায়াত রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও ইসলামী পোজপাজের একটি ধুম্রজাল সৃষ্টি করে প্রকৃত ইসলামের পথে মারাত্মক বিভ্রান্তিকর বাধা হয়ে আছে। এদের তৃণমূলের নিঃস্বার্থ ও ত্যাগী যুবকদের কাল বিলম্ব না করে, ওদের পচন ধরা, চরম নির্লজ্জ অর্থলোভী ও ক্ষমতা লোভী এবং নীচ প্রকৃতির নেতা উপনেতাদের চক্রান্ত থেকে পৃথক করে ফেলতে হবে। নেতাদের গোপন চরিত্রের মূল চেহারা সূরা তওবার ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতের নিরিখে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে দিতে হবে। যাতে নেতাদের ভিতরে ঈমানের সামান্যমত ভিত থাকলেও যেনো তারা তাওবাতুন নস্হা করে মানুষ হওয়ার শেষ সুযোগ পায়। আর যদি তাও না থাকে, তাহলে তাদের আসল রূপ জেনে সাধারণ কর্মী ও সমর্থকরা দাজ্জালী থেকে মুক্ত হয়ে সত্যিকারের ইসলামী কাফেলায় যোগ দিয়ে স্বার্থক মুক্তি সেনা হতে পারে। সমাজের সাধারণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার দোষত্রুটি গোপন রাখা সওয়াবের কাজ। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজপতিদের প্রতারণামূলক গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়া “ফরজে আইন”। যেমন ফিরআউন, নমরূদ, কারুন, বালআম ইবন বাউরা, কোদার ইবন সাল্‌ল্ফ, আবু লাহাব, ওয়ালিদ ইবন মুগীরা ও আস ইবন ওয়াইলদের ব্যক্তিজীবনের গোমরও আল্লাহ্ ক্বোরআনে ফাঁস করে দিয়েছেন। কারণ এদের চারিত্রিক ভ্রষ্টতায় সমাজ নষ্ট হয়েছিলো। তাই এদের ব্যক্তি চরিত্রের দোষাবলী অমার্জনীয় ছিলো। মওদূদী মরহুম কতো সুন্দরভাবে দ্বীনের ডাকের সূত্রপাত করেছিলো। তার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও উন্নততরো ব্যবহারিক ও রূহানী জীবনে নবীদের অনুসরণে সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায়, নিজে জীবনের শেষ দিনগুলো চরম নৈরাশ্যে ভুগে আমেরিকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। তার দলের পরবর্তী নেতারা দেশে বিদেশে অসংখ্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান দাঁড় করে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানী করে আল্লাহ্ ও রাসূলকে বিক্রি করে তাদের পরিবারের সাম্রাজ্য ক্বায়েম করছে। তা দ্বারা তাদের ছেলে-মেয়েরা দেশে বিদেশে রাজার হালে ভোগ বিলাসে মত্ত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের পয়সায় ধনী ইয়াহুদী খৃষ্টানদের পার্টনার আরবদের সুদ ও হারাম পয়সার দানখয়রাত এদের ক্যাপিটেল ফরমেশনের উৎস। সে মূলধন লগ্নী করে এরা ইসলামের নব্য ইয়াহুদী পুঁজিপতি শ্রেণী। ইখওয়ানীরাও এদের আরবী সংস্করণ। মাওলানা মওদূদীর প্রতিষ্ঠা পাকিস্তানী ও বাংলাদেশী জামাতীদের বিদেশী “নেটওয়ার্ক” এর ভিত। ভারতের জামাতীদের মূলধন মওদূদী হলেও আলী হাসান আলী নাদভীর লোকেরা নাদভীকে মূলধন করে আরব তোষণ ও আরবী ইসলামের ভারতীয় এজেন্ট তার নাদওয়ার চেলারা। মওদূদী যেরূপ বাদশা ফয়সাল পুরস্কার প্রাপ্ত, সেরূপ সাইয়েদ আলী হাসান আলী নাদভীও ফয়সাল পুরস্কার প্রাপ্ত। মুয়াবিয়া ইয়াযীদদের সাম্রাজ্যবাদের সেবক। ওদের অনুদানে মওদূদীর জামাতীরা যেমন পাকিস্তানের লাহোরে মনসূরায় উপশহর গড়েছে, ভারতের লক্ষ্ণৌতে আলী মিয়ার লোকেরা তাদের সাম্রাজ্য গড়েছে। বেচারী ইসলাম এদের সবার একনিষ্ট খাদেম। বাংলাদেশে মওদূদীর সাহিত্যিক ফরযন্দ যেমন মাওলানা আব্দুর রহীম, গোলাম আযম তেমনি তার রাজনৈতিক পোষ্যপুত্র। ভারতের আলী মিয়া নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর এখন তার চেলারাই একক উত্তরাধিকারী। এরা প্রায়ই আলী মিয়ার আরবী পান্ডিত্যের উত্তরাধিকারী আরবী শিক্ষিত। আরবী খেলাফতের ও আরব শেখদের একনিষ্ট খাদেম। মাওলানা মওদূদীর সম্ভবতঃ ছ’টি ছেলে দু’টি মেয়ে। কোনো ছেলেকেই মাদ্রাসা পড়ুয়া আলেম বানায়নি। মেয়েদেরও কোনো আলেমের সাথে বিয়ে দেয়নি। ছেলে-মেয়ে সকলেরই সাইয়েদ তালাশ করে বিয়ে-শাদী দিয়েছে। বর্ণবাদী রোগে সম্পূর্ণ আক্রান্ত তার বংশধররা। বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুর রহীমের আটছেলে দু’মেয়ে। এক ছেলেকেও আলেম বানায়নি। এক মেয়েকেও আলেমের সাথে বিয়ে দেয়নি। আধ্যাপক গোলাম আযমের পাঁচ ছেলে। তার দাদার বাবা পশ্চিম থেকে আসা এক ফকীর সূফী ছিলো। নাম ছিলো শেখ সুফী শাহাবুদ্দীন। যেমন শেখ মুজিবের পূর্ব পুরুষ বাংলার বাহির থেকে আগত শেখ ছিলো। অধ্যাপক আযমের দাদা বাবাকে শেখ শিহাবুদ্দিন দ্বীনি আলেম বানিয়ে যায়। তাই পরিবারের দ্বীনের বাহ্যিক রং ও চর্চা রয়ে যায়। দাদার পূর্বে তাদের পরিবারের কয়েক পুরুষ পর্যন্ত একটিমাত্র পুত্র সন্তান রূপে বংশ চলে আসে। তাই হালাল রুযীর উপর চলার আল্লাহ্ প্রদত্ত একটি সহজ জীবন তাদের পরিবারে চলে আসছিলো। কিন্তু গোলাম আযমের দাদার আমল থেকে তাদের পরিবারের বিচ্যুতি আরম্ভ হয় যখন তার দাদা মৌলভী আব্দুস সোবহান বিয়ের কাজী হয়। তখন থেকে বেশী ছেলে মেয়ের সংসারে কাজীগিরির অনুত্তম খাদ্য তাদের পরিবারকে বিপথে নিতে আরম্ভ করে এবং বিভিন্ন প্রকারের বিকৃত চিন্তাধারা পরিবারের ইসলামী ঐতিহ্যকে ক্ষয় করতে আরম্ভ করে। পরিবারে আর খাঁটি ইসলামী শিক্ষা থাকলোনা। জগাখিচুড়ীর পরিবেশ শুরু হলো। চিন্তা চেতনায় আর স্বচ্ছতা রইলোনা। মোল্লাদের পেশার মধ্যে কাজীগিরির পেশা একটি নিকৃষ্টতম কাজ। আমার বিচারে আলেমদের মধ্যে এরা সবচেয়ে ঘৃণিত পেশার লোক। আমার জানামতে এদের পরিবারে বিকৃত চরিত্রের মানুষের জন্ম হয়। আমার মতে এর কারণ হলো যে, এরা পয়সার লোভে মানব জন্মের সবচেয়ে স্পর্শকাতর পর্যায়ে অবৈধতার সম্প্রসারণ ঘটায়। একাজটি যদি অবৈতনিক সমাজ সেবামূলক হতো, তা হলে এতে প্রভূত কল্যাণ হতে পারতো। সমাজবিজ্ঞানে এর ভালোমন্দ প্রভাবের প্রতি সাধারণ ইংগীত করে বুঝাতে বলছি যে অধ্যাপক গোলাম আযমের একটি দ্বীনি পরিবারে এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিকৃতি দেখা দেয়। পরিবারটি আর ইসলামীও রইলোনা, পুরো ফিরিঙ্গীও হলো না। হারাম খাদ্যের প্রভাবে নির্লোভ পরিবারে পার্থিব অর্থ লোভ এসে যায়। পূর্বপুরুষের ফকীরী টানে এক দিকে, দুনইয়ার লোভ টানতে লাগলো বিপরীত দিকে। খাদ্যের বিকৃতি রুচির বিকৃতি আনে, রুচির বিকৃতি চারিত্রিক বিকৃতি আনে, চারিত্রিক বিকৃতি শিক্ষার বিকৃতি আনে এবং শিক্ষার বিকৃতি মস্তিষ্কের বিকৃতির জন্ম দেয়। মস্তিষ্কের বিকৃতির মানুষ পাগল এবং পাগলের নেতৃত্বে সমাজকে পাগলের জাতে রূপান্তরিত করে। এজন্য ইসলামে হালালের প্রতি এতো গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যারা হালাল খাবে, তারা কখনো লোভী হতে পারেনা। নির্লোভ মানুষ সর্বদা আল্লাহর বান্দা ও গোলাম থাকতে চায়। পুরো হারাম খেলে মানুষ রাজা-মাহারাজা হতে চায়। আধাহালাল ও আধা হারাম খেলে দো-টানা হয়ে নামের অর্ধেক হয় গোলামের, আর অর্ধেক হয় রাজার। ফলে একই ব্যক্তির মধ্যে গোলাম ও শাহেনশাগিরির পাগলামী দ্বন্দ্ব আরম্ভ করে দেয়। লোকটি কখনো ভালো, কখনো পাগল হয়। পরকালের কল্যাণ যারা চায়, তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পার্থিব লোভকে পরিহার করে চলে। কোনো অবস্থাতেই পার্থিব স্বার্থ তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়না। কারণ ঈমান তাদের শিক্ষা দেয় যে পার্থিব সম্পদ পরকালের প্রাপ্তির তুলনায় তুচ্ছ। কিন্তু বকধার্মিক উপরে ধার্মিকতা দেখায় এবং সম্পদ জমা করে। এভাবে সম্পদ আহরণ ও জমা করাই তাদের ঈমানহীনতার প্রমাণ।

কোনো নামের মাধ্যমে তার পিতা-মাতা ও দাদা-দাদীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন একটি ব্যক্তির নাম আবদুল্লাহ হলে মনে করতে হবে যে তার পিতা-মাতা ও অভিভাবক আল্লাহর রাজত্ব ও বান্দার দাসত্বে বিশ্বাসী। ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ হলেও বুঝতে হবে যে, এদের অভিভাবক রিসালাতের অনুসারী ঈমানদার। কিন্তু যখন দেখা যাবে যে, কোনো পরিবারের লোকদের নাম, নমরুদ, ফিরআউন কায়সার, মুয়াবিয়া, ইয়াযীদ, মামুন, জাহাঙ্গীর ও সিরাজুদ্দৌলা প্রভৃতি, তখন পরিবারটি প্রচলিত মুসলমান হলেও এদের মজ্জায় আনুগত্যের চেয়েও কর্তৃত্বের নেশা প্রবল প্রমাণিত হবে। যেমন দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমার কাছে ধরা পড়েছে যে মওদূদী সাহেবের ছেলেদের সবার নামে ফারুক অবিচ্ছেদ্য। মাওলানা আব্দুর রহীমের ছেলেদের নামের সাথে সবার মুস্তাফা কমোন।

অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলেদের নাম আমীন, মামুন, আমান ও নোমান আব্দুল্লাহর সাথে যৌগিক। আমাদের নামে নবী রাসূলদের নামের প্রাধান্য। এতে বুঝা যায় যে মওদূদী সাহেবের অন্তরে উমর ইবন আল খাত্তাবের ফারুক গুণের প্রাধান্য ছিলো, আব্দুর রহীম সাহেবের হৃদয়ে আল্লাহর বাছাইয়ের সিফাতের অনুভূতি প্রবল ছিলো এবং আমাদের অভিভাবকের মানসপটে রিসালাতের প্রাধান্য সক্রিয় ছিলো। রাসূল সঃ সুন্দর অর্থবহ নাম রাখতে উপদেশ দিয়েছেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর কোনো ব্যক্তির নাম অশোভন হলে তা বদলিয়ে শোভনীয় নাম রেখে দিতেন। তাঁর কাছে প্রিয় নাম ছিলো, “উবেদা ও হুমেদা” নির্দেশক। অর্থাৎ যাতে আল্লাহর দাসত্ব ও প্রশংসা বুঝায়। যেমন আব্দুল্লাহ, উবায়দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ও আহমাদ প্রভৃতি। “বিন্দু থেকে সিন্দুর” মতো ক্ষুদ্র নির্দেশক দিয়ে মূল আবিস্কার করার শিক্ষা কোরআনের। তাই মুমিনের বিচার ও বাছনী শক্তি আল্লাহর পর অদ্বিতীয়। সে গুণ গৌণ হওয়ায় আজ মুসলিম, ইসলাম ও ইসলামী নেতৃত্বের এতো নিম্নমান। আল্লাহর এক নিরক্ষর মরু রাখালকে শুধু মাত্র কোরআন শিক্ষা দিয়ে মানব ইতিহাসের সেরা শিক্ষিত ও সকল শিক্ষকের শিক্ষক বানিয়েছেন। আমাদের দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ক্বোরআন, শিক্ষার মূলে নেই বলে এদেশ দরিদ্রতম বর্বরজাতি। জাতির পিতাকেও মেরে ফেলেছে। স্বাধীনতার ঘোষক, স্বাধীনতা অর্জনকারী যোদ্ধাকেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষিত সেনাবাহিনী মেরে ফেলেছে। তার পর নিহত পিতার মেয়ে ও নিহত স্বামীর বিধবা স্ত্রী দিয়ে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার ক্ষমতা দখল ও উচ্ছেদের খেলা ও লুট-পাট জাতির নিয়তি!

এ ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতাচ্যুতির “বিয়ে-তালাকের” কাজী সাহেব ইসলামী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম। তার আবিষ্কৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার “ক্ষমতা তালাক ও ক্ষমতা পুনঃবিবাহের” কাজীগিরির অভিনব তামাশা। এর উর্ধ্বে উঠার সকল সম্ভাবনা তার দল ও আন্দোলনের নেই। পালাক্রমে দু’নেত্রীর আশ্রয়ে জীবন, আশ্রয়ে মরণ। তারপরও সে ইসলামী নেতা তার আন্দোলন ইসলাম?! আম্মার ও ইবন মাসউদরা যখন দেখলো যে ভোগবাদী ওসমানের ছত্রছায়ায় আবু সুফইয়ান ও হিন্দাদের যুগ ফিরে আসছে, তখন প্রাণ দিয়ে ঈমান নিয়ে বিদায় নিয়েছে। খবিসদের সাথে রয় নি। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখে পরে সে রাজতন্ত্রের পুরস্কার প্রাপ্ত ও রাজতন্ত্রের আরবদের অর্থানুকূল্যে দলীয় প্রতিষ্ঠার গুরু- শিষ্যের পথও একই হলো। সব কাজেই তারা অভিন্ন। গুরু ইসলাম বাদ দিয়ে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে ফাতেমা জিন্নাহর মতো এক অপ্রকৃতস্থ মহিলার নেতৃত্ব কুবুল করার ফলে আল্লাহ্ তার শাগরিদদের কপালে দু’নেত্রীর “কবুল” লিখে দিয়েছেন। বাংলাদেশের কাজী গোলাম আযমের কপালে হাসিনা, খালেদা এবং পাকিস্তানের কাজী হোসাইন আহমদের কপালেও কুলসুম নওয়াজ শরীফ ও বেনজীর ভুট্টো “কুবুল” লিখে দিয়েছেন।

[এ হ‌’লো ইসলাম-ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ. ৩২৮-৩৩৩]

তাই সমসাময়িক যুগের হাসানাল বান্না, মওদূদী, আবুল হাসান আলী নদভী, খোমেনী, মাওলানা আব্দুর রহীম ও অধ্যাপক গোলাম আযমের ব্যাপারে আমার মূল্যায়ন কোনো সাময়িক প্রভাবে দুষ্ট নয়। ধর্ম নিরপেক্ষ শেখ মুজিব ও ধর্মদ্রোহী সমাজবাদী বা নাস্তিকদের ব্যাপারে মতামতও পক্ষপাত দুষ্ট নয়। এ সব কিছুর মূলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস কাজ করে যে পৃথিবীতে আমি আমার স্রষ্টা ও আমার সব কিছুর মনিব আল্লাহর প্রতিনিধি। তাই সর্বদা আমার স্মরণ থাকে যে পৃথিবীতে, কি দেখলাম, কি শুনলাম, কি বললাম, কি করলাম, কি ত্যাগ করলাম, কি উপার্জন করলাম, কিসে ব্যয় করলাম, কি খেলাম ও কি নিয়ে পরকালের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, তার সব কিছুর হিসেব দিতে হবে মনিবের কাছে। তাই কারো নিন্দাবাদ ও জিন্দাবাদে আমার ভ্রুক্ষেপ নেই। শুধু একটি ফ্যক্টরই সর্বদা ক্রিয়াশীল, “যদি মনীব আমার প্রতি খুশী হন, আমার প্রতি হাসেন ও আমাকে যদি কুবুল করেন, তা হলেই আমি ধন্য।” আমার আর কিছুর প্রতি খেয়াল নেই। আমার সকল মূল্যায়নে আল্লাহর নবী রাসূলগণ আদর্শ। একমাত্র ক্বোরআন আমার কষ্টিপাথর বই। তা দিয়ে ঘষে কথিত হাদীস ও সাহাবী তাবেঈ দেখি। টিক্লে থলিতে পুরি, না টিকলে ছুড়ে মেরে পরবর্তী প্রাপ্তির সন্ধানে ছফর করি। এ ফকীরের পায়ে বিরতি নেই। যে পর্যন্ত না সেপারে গিয়ে মনীবের দেখা পাই। এ বই সে বিশ্বাসে পড়তে হবে। তা না হলে লাভবান হওয়া যাবেনা। মওদূদীরা বই লিখেছে। তা দেশে বিদেশে বিক্রয় করে বহু টাকা হয়। তা নিয়ে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মামলা মুকাদ্দমা হয়। সে গুলোর পয়সা দিয়ে এদের উত্তরাধিকারীরা আল্লাহর দ্বীন বিরোধী জীবন যাপন করছে। এরা কি ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য এগুলো লিখেছে? এরা নিজেদের সন্তানদের ইসলামী বানালোনা কেনো? তারা তদের অবাধ্য হলে নূহ ও ভূতের মতো তাদের ত্যাগ করেনি কেনো? তার উত্তর খুঁজে বের করতেই হবে। মওদূদী, সাইয়েদ কুত্ব, মুহাম্মদ কুত্ব ও মাওলানা আব্দুর রহীমরা ইসলামী বই লিখে এগুলোর স্বত্বাধিকার রক্ষা করে মারাত্মক অপরাধ করেছে। তা করে তারা ইসলাম ও ঈমানের প্রচারক না হয়ে অন্যান্য ব্যবসায়ী সাহিত্যিক রচয়িতাদের মতো নিজেদের নিছক ইসলামী সাহিত্যিক রূপে প্রমাণ করেছে। এদের ক্ষমা নেই। কারণ সাধারণ ব্যবসায়ী লিখক সাহিত্যিকরা জীবিকা ও ব্যবসার জন্য বই লিখে ও প্রকাশ করে। তাই এটা তাদের ব্যবসা, ধর্ম নয়। ধর্ম দিয়ে ব্যবসা হারাম, ধর্ম ব্যবসা করা আল্লাহর আয়াত বিক্রি করা। এ করে যারা খায়, তারা আগুন খায়। আগুন জাহান্নামীদের খাদ্য। আল্লাহর বিধান: রাসূল সঃ এর রিসালাতের কাজ সম্পন্ন হলে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে সূরা তওবা নাযিল করে আল্লাহ্ মানব জাতির জন্য তাঁর চূড়ান্ত বিধান ঘোষণা করে দিয়েছেন। ক্বেয়ামত পর্যন্ত এর কোনো পরিবর্তন ও পরিবর্ধন চলবেনা। যারা করবে, তারা কাফের ও মুর্তাদ হয়ে যাবে। তিনি বলে দিয়েছেন, যে যারা তাঁর দ্বীনের সেবা করবে, তারা অন্যায় ভাবে মানুষের ধন ভোগ করতে পারবেনা। তা হলে তারা ধর্মের প্রচারক হবেনা। তারা হবে আল্লাহর পথে বাধাদানকারী। ফলে তারা জাহান্নামী হবে। পাঠকরা আমার সাথে এসো, আমরা একত্রে সূরা তওবার এ সংক্রান্ত আয়াত দুটি অধ্যয়ন করি ও বুঝি।

[এ হ‌’লো ইসলাম- ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৩৮]

মওদূদীর বইর অনুবাদ করেছে, নিজের স্থল চিন্তায় যতোটুকু ইসলাম বুঝে এসেছে, তার উপর কলম চালিয়েছে। সে কলমের ফল তার উত্তরাধিকারীদের উপজীব্য। হায় হায়! যদি আত্মার চিন্তায় একবারও মৃত্যুর পর এখন যেখানে আছে, সে অবস্থান দেখতো! একটি বইও না লিখে যদি আট ঘন্টা ঘুমিয়ে, আটঘন্টা কোনো গতরখাটা শ্রম করে জীবিকা উপার্জন করে তা নিজে খেয়ে ও সন্তানদের খাইয়ে বাকি আট ঘন্টা ছেলে-মেয়েগুলোকে হাতে গুনে যায়দ, বেলাল, আম্মার, সুহাইব, ইবন মাসউদ, খাব্বাব, সালমান ও উসামাহ এবং বারাকাহ্ ও সুমাইয়ার শিক্ষা দিয়ে শুধু কোরআন হাতে তুলে দিতে সামর্থ হলেই মাওলানা আব্দুর রহীম ইহকাল ও পরকালের অফুরন্ত ভান্ডার স্বয়ং পেতো এবং জাতিকে কল্যাণের পথ প্রদর্শক দিয়ে যেতে পারতো। আটটি ছেলেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। দেখতে অমায়িক ভদ্র ও বাআদব ছেলে। আট ঘন্টা আটটি ছেলে নিয়ে মাওলানা আব্দুর রহীম চারটি ঠেলা গাড়ি বা ভ্যান গাড়ি চালিয়ে গেলেও বর্তমান অবস্থা থেকে ভালো অবস্থানে থাকতো। এ সোনার ছেলেগুলোকে মানুষ করণার্থে রোজ আট ঘন্টা নয়, সকালে দু’ঘন্টা ও বিকালে দু’ঘন্টা মোট চারঘন্টা করে কোরআন ইনজেক্ট করে গেলেই অন্তত এদের মধ্যে অর্ধেক পূর্ণ মানুষ অর্থাৎ চারটি যোগ্য সন্তান ও চারটি আধা যোগ্য হলেও তার জীবন সার্থক হতো। তা না করে অর্ধেক নিজের ও অর্ধেক মওদূদীর মতো চলতে গিয়ে দোটানায় কলম খোঁচাতে গিয়ে ছেলেগুলোকে “হংস মাঝে বক যথা” ও “বক মাঝে হংস যথা, না ঘরকা না ঘাটকা” বানিয়ে গিয়েছে। লিখতে গিয়ে বিতর্কিত নিষ্প্রয়োজনীয় বই লিখেছে। রূহানী দিক আনাবিষ্কৃত থাকায় পোষাকে-আষাকে যেমন ত্বাকওয়া ছিলোনা, ইবাদাতে আমলেও তার ছাপ ছিলোনা। সময় মতো সালাত আদায়ের প্রকৃত টান গড়ে উঠে ছিলোনা। ফলে মক্কায় গিয়ে হারাম শরীফের গা ঘেষা হোটেলে অবস্থান করে ফজরের জামাত পাওয়া দূরে থাক, ফজর নামাজই দু’দিন কাজা হয়েছে। আমি কাবায় সালাত আদায় করে মাওলানাকে কাবায় না পেয়ে হোটেলে গিয়ে ঘুম থেকে উঠিয়ে কাজা নামাজ পড়তে দেখেছি। আমার ভাগ্য বহুত খারাপ। আমার জীবনে স্বনিয়ন্ত্রিত গুছানো জীবন যাপন করে নিজের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানোর কাজ করতে হয়েছে এবং এখনো তাই হচ্ছে। এ বই তার সাক্ষ্য। স্যার খাজা নাজিমউদ্দীন ছিলেন আমার বয়সের দ্বিগুণের চেয়ে বর্ষীয়ান। বেক্সিমকো খ্যাত সুহেল ও সালমানের বাবা ফজুলর রহমানও আমার বয়সের দ্বিগুণের বেশী বয়সী ছিলো। বাংলাদশের বামবুদ্ধিজীবী বদরউদ্দীন উমরের বাবা আবুল হাশেমের বয়সও তাই ছিলো। কিন্তু নিয়তি আমাকে এদেরও খবরদারী করার পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছিলো। মাওলানা আব্দুর রহীম ও অধ্যাপক গোলাম আযম আমার রক্তমাংসের অস্তিত্বে বড়ো। কিন্তু তাওয়ার বয়সহীন তাগীদ কখনো কখনো আমাকে বাধ্য করেছে বিভিন্ন সময় এদের খবরদারী করতেও। এদের কারো সাথে আমার পার্থিব স্বার্থের সম্পর্ক মুখ্য ছিলোনা। প্রথম দু’জনের সাথে গৌণ ছিলো। বাকিদের সাথে তাও ছিলোনা। শুধু দ্বীনি দায়িত্ব ছিলো। যার ইতিবৃত্ত এখন অত্যাবশ্যক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে লিখছি। মাওলানা আব্দুল রহীম পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামের আমীর ছিলো। অধ্যাপক আযম ছিলো সাধারণ সম্পাদক। পরে মাওলানা আঃ রহীম মওদূদীর ডিপুটি হলে গোলাম আযম জামাতের আমীর হয়। রাজনৈতিক স্রোতাধারায় এদের সাথে আমার সাক্ষাত হলেও আমি যেহেতু নীরব আদি দ্বীন, দ্বীনুল ক্বাইয়েমায় অটল বিশ্বাসী, তাই রাজনৈতিক সহযাত্রায়ও আমার অন্তরে এদের সবার ভিন্নতরো মূল্যায়ন চলতে থাকে। তার ইংগিতই এ লাইন গুলোতে লিপিবদ্ধ হচ্ছে। মাওলানা আব্দুর রহীম সাহিত্যকর্মে বাঙ্গালী মওদুদী হলেও রাজনৈতিক যোগ-বিয়োগে কোথাও মওদুদীর সাথে ভিন্নমতের সৃষ্টি হয়েছিলো। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ হলে সে মতপার্থক্য উভয়কে আরো দূরে নিয়ে যায়। মওদুদী একদিকে নৈরাশ্যে ভোগে, মাওলানা আব্দুর রহীম আরেক মেরুতে নৈরাশ্যের শিকার হয়। এর চরম মুহুর্তে আমি এদের পরিবর্তন খুব গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। মক্কায় বসে মুসলিম বিশ্বের স্নায়ুবিন্দুতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি মূল্যায়নের সাথে পাক-ভারত উপমহাদেশের অবস্থা আমার কাছে বোধগম্য কারনেই প্রাধান্য পায়। তন্মধ্যে বাংলাদেশের নাটকীয় পরিবর্তন আরো গুরুত্ব পায়। মাওলানা মওদুদী ও মাওলানা আব্দুর রহীমের তুলনায় অধ্যাপক গোলাম আযম কোনো ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলোনা, এখনো নয়। অধ্যাপক আযম কলেজে পড়া, ছাত্র আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, তাবলিগী জামাত ও জামাতী পাকিস্তানী রাজনীতির স্ববিরোধী কতোগুলো দুর্বোধ্য জটের ব্যক্তি। ইসলামী গভীরতা তার কাছে আশা করাই কোনো ব্যক্তির ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার সনদ। আল্লাহর এ বান্দাটি সকল দুর্বলতা সত্ত্বেও একটি ব্যাপারে শতকরা একশ ভাগ সজাগ ও বুঝমান। তা হলো, যে কোনো মূল্যেই হোক ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতায় তাকে টিকে থাকতে হবেই! তাতে তার অভিধানে কোনো প্রকার এথিক্স্ বা আচরণ বিধির সীমাবদ্ধতা নেই। তার মধ্যে একটিই মাত্র যোগচিহ্ন আছে, তা হলো তার দাদার বাবা ও তার উর্ধ্বে কোথাও ভালো মানুষের একটি সূতা আছে, যেটা তার দাদার আমল থেকে কাটা। সে জন্য তাদের পরিবারে মস্তিস্ক বিকৃতি থেকে সকল বিকৃতি। সে কাটা সূত্র আবিষ্কার করে পুনঃ জোড়া লাগিয়ে দেয়া সম্ভব হলে এ লোকটির নসিব ভালো হলে হয়তো সঠিকপথ পাবে এবং তার বিভ্রান্তি থেকে জাতি ও দেশ মুক্তি পাবে। তা না হলে এ লোকটি বাংলাদেশের ইসলামী মুক্তির পথে হযরত মূসার কাফেলায় সামেরী সদৃশ। সে অবস্থায় তার চক্রান্ত ও চক্র থেকে বাংলাদেশের ইসলামী যুবশক্তির নাজাতের পথ দেখাতে হবে। এ ব্যাপারে যথাস্থানে অধ্যাপক আযম সম্পর্কে আরো আলোকপাত করা হবে। ইনশাআল্লাহ্। আমার একটি দোষ ও দুর্বলতা রয়েছে। তা হলো কোথাও ইসলামের পোষাক দেখলে তার মধ্য থেকে খাঁটি লোকটিকে বের করার চেষ্টা করি। কারণ, যে লোকদের পোষাক নেই, তাদের সঠিক বুঝ দিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পোষাক পরিয়ে দিলে কিছু দূর গিয়ে সে পরানো পোষাক খুলে ফেলে নিজের পোষাক পরবেই পরবে। তাই ইউনিফর্মহীন সৈনিক যেমন সৈনিক নয়, পোষাকহীন মানুষ কোনো মানুষ হয় না। তাই আল্লাহ্ একমাত্র বনী আদমকে আশরাফুল মাখলুকাত রূপে পোষাকে সাজিয়েছেন। বনী আদমের পোষাকে পূর্ণ লজ্জানিবারণ, দেখতে শোভন ও স্বভাবে কর্মে তাক্বওয়ার নিদর্শন থাকতেই হবে। অন্যথা সে শয়তানের ক্রিড়নক হবেই হবে। (দেখো সূরা আরাফের আয়াত-২৬-২৭) ইসলামে ড্রেসকোড্ বা পোষাকের বহু গুরুত্ব। অধ্যাপক আযমদের পরিবার হারানো সূতার সব হারিয়েও পোষাকের অবশিষ্টাংশ হারায়নি। তাই এ ব্যক্তিটি ও তার পরিবারের প্রতি আমার সে একটি মাত্র দুর্বলতা আছে। সেজন্য আমি তাদের কল্যাণ চাই। তাদের হারানো সূতার মাথা পেলে আমি এ পরিবারের নাম পুনঃ বিয়ের কাজী ও কুফ্রী গনতন্ত্রের অধ্যাপক বাদ দিয়ে শেখ লাগাবো। যারা সঠিক অতীতকে অস্বীকার বা ত্যাগ করে নুতন অথচ বিকৃত পরিচয় ধারণ করে, তারা আল্লাহ্র দানের অমর্যাদাকারী রূপে আল্লাহর বিরাগভাজন হয়ে অভিশপ্ত হয়ে লাঞ্ছিত হতে থাকে, যে পর্যন্ত না পূর্বের সত্যে ফেরত এসে তওবা করে। বর্তমান মুসলিম নামধারী জাতি চাল-চলন ও পোষাকে, ঈমান ও ইসলাম ত্যাগী আল্লাহর অভিশপ্ত জাতি। প্রমাণ হলো, দৈনিক ন্যূনপক্ষে সতেরো বার ফরজ নামাজে সূরা ফাতিহায় “গাইরিল মাগ্দবি আলাইহিম ওয়ালাদ্‌ দুয়াল্লীন” বলে যে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের প্রত্যাখ্যান করে, ক্যাম্প ডেভিডে গিয়ে তাদের নবীর পৃথিবী থেকে মেরাজে যাওয়ার পূর্বে সকল নবীদের জামাতের স্থল, মাসজিদুল আক্বসা ফেরত পেতে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের পায়ে পড়েও তা ফেরত পাচ্ছে না! সময় মতো করণীয় একটি মাত্র সিজদা করতে ব্যর্থ হলে অসময়ে এক লক্ষ সিজদা করেও হারানো মর্যাদা ফেরত পাওয়া যায়না। আবু বকর, উমর, ওসমান, ও আলীরা রাসূল সঃ এর ইমামকে মেনে আল্লাহকে সিজদা করতে ব্যর্থ হলে, পরে ধুঁকে ধুঁকে তাদের মরতে হয়েছে। তাদের সন্তানদের আল্লাহ্, রাসূল ও তাদের শত্রুদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। যে আব্দুল্লাহ ইবন্ উমর শেষ রক্ষার সুযোগে আলীর হাতে বায়আত হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলো, ফলে আল্লাহ্ আলীকেও উঠিয়ে নিয়ে গেলে, সে আব্দুল্লাহ নিজে নিজের কান ধরে উপযাজক হয়ে মুয়াবিয়া ও ইয়াযীদের পায়ে পড়েও প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। মুহাম্মাদী রিসালাত পূর্তির আসমানী প্রতীক উসামাহ বিন যায়দের ইমামত অগ্রাহ্য করার শাস্তি আজো আমাদের উপর চলছে। ইবন্ উমর, ইবন যুবায়র ও ইবন্ আব্বাসদের জন্য উসামাহর পেছনে জিহাদ ও সালাত কি মুয়াবিয়া ও ইয়াযীদের পেছনে জিহাদ ও সালাতের চেয়ে লক্ষগুণ শ্রেয় ছিলনা, যে উসামাহর অধীনে তাদের বাবারা সাধারণ সৈনিক ছিলো? এ মহা সত্যটি বুঝানোর জন্যই আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেপে রাখা নাজাতের পথটি উম্মোচিত করেছি ও করছি। ইসলাম সালাত কায়েমের সমাজবিধান। সালাত কায়েম হয় ইমামের পেছনে। ইমাম তাই সমাজের নেতা। সমাজের নেতা সমাজের উত্তমতম চরিত্রের যোগ্যতম ব্যক্তি হতে হবে। এ যোগ্যতার তুলাদন্ড হলো তাক্বওয়া। আল্লাহ্ ভীতি। আল্লাহ্ আমাকে সর্বদা দেখছেন। আমি তাঁর দাস। তিনি সন্তুষ্ট হলে আমি ধন্য। তিনি অসন্তুষ্ট হলে আমার সর্বনাশ! তাই আমার পিতামাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী সন্তান, গোষ্ঠি-জ্ঞাতি, পাড়া প্রতিবেশী, দেশবাসী এমন কি বিশ্ববাসীও আমার উপর অসন্তুষ্ট হলে, বা আমার উপর চাপ প্রয়োগ করলেও, আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হন এমন কোনো কাজ করবো না। এ চরিত্রের নাম তাক্বওয়া। এ গুণসম্পন্ন ব্যক্তি মুত্তাক্বী। ক্বোরআন এদের জন্ম, শৈশব, শিক্ষা, যৌবন, কর্ম, জীবন, মৃত্যু, জানাযা, দাফন, উত্থান ও পরকালের পথ প্রদর্শক কিতাব। হুদাল্লিল মুত্তাক্বীন। তাই মুত্তাক্বীরা কোনো রাজনৈতিক দলের বর্ণ ও গোত্রের, ভাষা ও সংস্কৃতির এবং সম্প্রদায়ের হতে পারেনা। হলেই আর সে মুত্তাক্বী থাকবেনা। বিশ্বজনীনতা হারিয়ে ফেলবে। বিশ্ব প্রতিপালক “রাব্বুল আলামীন” এর বান্দা ও রাহমাতুল্লিল আলামীন রাসূলের অনুসারীকে অবশ্যই বিশ্বজনীন হতে হবে। কোরেশী, ইয়াহুদী, আরবী, ইরানী, হিন্দি ও বাঙ্গালী হলে কি আর কোনো ব্যক্তি বিশ্বজনীন থাকে? থাকেনা। তারা কূপের ব্যাঙ। সমুদ্রে তাদের স্থান নেই। ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও তার দলের লোকেরা ঐ ভাষা আন্দোলনের কথিত সৈনিক। ঐ ভাষার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে যারা মানুষ হত্যা করেছে, সে ভাষা যদি কোরেশদের আরবী, বাইবেলের ভাষা আরামিট ও তাওরাতের ভাষা হিব্রও হয়, তা হলেও তারা মুত্তাক্বী দূরে থাক, মানুষই নয়। কারণ, তারা বিশ্বমানবতা মানেনা। তাদের আদি পিতা আদম মানেনা। আদমের স্রষ্টা রাব্বুল আলামীনকে মানেনা। খন্ডিত আল্লাহ্, খন্ডিত আদম ও খন্ডিত মানবতায় বিশ্বাসী মুশরিক, বিবর্তনবাদী ডারউন ও গোত্রবাদী পশু বিশেষ এরা। এরা মুস্লিম উম্মাহর নেতা দূরের কথা, এরা নিজেরাই মুস্লিম মু’মিন নয়। সকল নবী-রাসূলরা গোত্রের লোকদের এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে ডেকেছেন, যে আল্লাহ্ কোনো গোত্রের বা সম্প্রদায়ের নন। তাই আল্লাহতে বিশ্বাসীরা অভিন্ন, অবিভক্ত ও এক জাতি। গোটা মানব জাতি তাদের যৌথ পরিবার। সকল পারিবারিক বিরোধ মিটিয়ে পরিবারকে এক ও এক রাখার চেষ্টারতরা মুসলিম। তাদের নেতা বিশ্বমানবতার ইমাম। তাদের ইমামের কেন্দ্র মক্কা। পৃথিবীতে মানব বসতি স্থাপনের পর আল্লাহ্ এ কেন্দ্র স্থাপন إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ | PESTCRET آمِنًا وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ “সারা বিশ্বের মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য মককায় এ বরকতময় ঘর সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এতে বহু নিদর্শন রয়েছে। যেমন ইব্রাহীমের অবস্থান, যেমন এখানে যে ঈমান নিয়ে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ এবং হজ্জ পালনে যোগ্য প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহর ঘরে হজ্জের জন্য আসা অবশ্য কর্তব্য। এ আদেশ পালনে যারা হজ্জে আসবেনা, তারাই কাফের। জ্ঞাতব্য যে অবশ্যই আল্লাহ্ গোটা বিশ্বের কারো মুখাপেক্ষী নন।” (আল ইমরান-৯৬, ৯৭) এ অর্থে মককা বিশ্ব মুসলিমের জন্য মুক্ত না হলে হজ্জ হয়না। কোনো বিশেষ গোত্র ও জাতীয় রাষ্ট্রের (ন্যাশন স্টেট) অধীন থাকলে মক্কা অবরুদ্ধ, মুক্ত নয়। সে অবস্থায় মুক্তহওয়া পর্যন্ত বৈধ হজ্জ হবেনা। যেমন রাসূল সঃ ক্লোরেশদের কর্তৃত্বে যতোদিন মককা অবরুদ্ধ ছিলো ততোদিন হজ্জ করেননি। মককা জয়ের পর আল্লাহ্ কর্তৃক সূরা তওবা নাযিলের মাধ্যমে মক্কা মুক্তির ঘোষণা প্রচারের পর রাসূল সঃ হজ্জ করে মককা থেকে মাদীনা গিয়ে উসামাহকে নিযুক্ত করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এখন বিশ্বমুসলিমের কর্তব্য হলো সকল জাতীয় বিভক্তি থেকে সূরা তওবার আলোকে তওবা করে খাঁটি মুসলিম হয়ে বিশ্বইমাম নির্ধারণ করে মককা মুক্ত ও হজ্জ প্রতিষ্ঠা করা। তা হলেই তারা খাতামুন নাবিয়্যীন, রাহমাতুল্লিল আলামিন মুহাম্মাদ সঃ এর অনুসারী হবে। ইখওয়ানীদের মতো আরবী কোরেশী খেলাফত প্রতিষ্ঠায় মাওলানা মওদূদী ও মাওলানা আব্দুর রহীমদের মতো ইসলামী সাহিত্য লিখে তার সর্বসত্ব দল ও সন্তানদের জন্য রক্ষিত করে আখের গুছানীর ইসলাম, ও অধ্যাপক আযমদের ভাষা সৈনিক, তাবলীগী চিল্লাকারী, ইয়াহইয়া খাঁর ইমামতীতে একাত্তর সালের বদরের যোদ্ধা ও বিশ্ব ইয়াহুদীবাদের পোষ্যপুত্র বর্ণবাদী বর্তমান আরবদের উচ্ছিষ্টে স্থাপিত ভোগবাদের ব্যাংক-বীমার পয়সায়পালা সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী ইসলাম দিয়ে মক্কা মুক্ত ও পবিত্র হওয়া দূরের কথা, এরা যে যে দেশ ও স্থানে আছে, সে দেশ সমূহই এদের শির্কে অপবিত্র। এদের মুখোশ উন্মোচন করে সর্বপ্রথম বিশ্বের ইসলামে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠিকে এদের খপ্পর থেকে মুক্ত করার জন্য আমাকে, অপ্রিয় হলেও এ সকল তথ্য পরিবেশন করতে হচ্ছে। আশাকরি, তার ফলে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়াতে পাঠকদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবেনা। ইমামত ও নেতৃত্বের মহাসড়ক, সিরাতুল মুস্তাক্বীম, বন্ধ করে যারা বিকল্প রাস্তা তৈরী করে ধর্মের নামে মানুষের ধনসম্পদ লুটে তারপর তাদের বিপথগামী করছে, তাদের সূরা তওবার ৩৪-৩৫ আয়াত দিয়ে উৎখাতের দুরুহকাজে আমাকে বহু সতর্কতা অবলম্বন করে আল্লাহর দরবারে বিশেষ তাওফীকু ভিক্ষা করতে হচ্ছে। যাতে আমি শয়তান ও নাক্সের কুমন্ত্রনায় না পড়ি, সেজন্য গত দুই মাস ধরে অবিরাম সাওম পালন করে লিখে যাচ্ছি। যে পর্যন্ত এ বই শেষ না হবে, সাওম চালিয়ে যাওয়ার নিয়াত করেছি। সত্যের উপর অনড় থেকে যাতে

[এ হ‌’লো ইসলাম- ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৪২-৩৪৩]

গোলাম আজমের অঙ্গীকার ও জামায়াতের চাঁদা আদায়ের ইতিহাস

আমরা কারো কাছ থেকে চান্দা ও অনুদান নেবো না” এ অঙ্গীকারে বিশ্বমুসলিম সমস্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থা জানানোর উদ্দেশ্যে আমি, অধ্যাপক গোলাম আযম ও ব্যারিষ্টার কোরবান আলী একজন প্রাক্তন সৌদী মন্ত্রী ও দৈনিক পত্রিকার মালিক শেখ আহমদ সালাহ্ জাম্‌জুমের সাথে সর্বপ্রথম সাক্ষাত করতে যাই। আমাদের পূর্ব শর্ত, কারো কাছ থেকে দানভিক্ষা নেবো না। তা ভঙ্গ করে অধ্যাপক আযম সর্বপ্রথম বাংলাদেশ হওয়ায় তার দলের যারা বিপদ গ্রন্থ হয়েছে, তাদের বর্ণনা সম্বলিত একটি সাহায্যের আবেদন পেশ করলে শেখ জামজুম তারপ্রতি দৃষ্টি দিয়েই বলে উঠলো, We are tired of hearing such stories. Every body comes to us with sole purpose of money and that’s all. আমরা এ ধরনের গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত। প্রত্যেকেই এ সমস্ত বলে চাঁদা নিতে আসে। এ মন্তব্য শুনে আমি খুব অপমানিত বোধ করে দুঃখের সাথে অধ্যাপক গোলাম আযমের দিকে তাকালাম। তারপর শেখ জামজুমের মুখ থেকে কথা প্রায় কেড়ে নিয়েই বললাম “আমরা চাঁদার জন্য আসিনি। আমাদের দেশ এক সময় স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ ছিলো। তখন আরবমরু চরম দরিদ্র ছিলো। দু’শ বছরের উপনিবেশবাদের লুষ্ঠনে আমাদের দেশ নিঃশেষিত হয়। তারপরও যা সর্বনাশ করে, তা হলো যে উপনিবেশবাদ এসে কিছু দেশীয়শোষক জন্ম দিয়ে তাদের ওদের শিক্ষা দিয়ে যায়। উপনিবেশীরা বিদায় কালে ঐ জাতির শত্রুদের হাতে দেশ হস্তান্তর করে যায়। ফলে পাকিস্তান একদিনের জন্যও জনগণের রাষ্ট্র হয়নি। পাকিস্তান হলে পর ওরাই দেশকে লুটেছে। তারপর পুনঃ ওদের স্বার্থেই পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ বানিয়েছে। এ বাংলাদেশও কোনো দিন জনগণের কল্যাণের রাষ্ট্র হবেনা। উপনিবেশবাদের আবর্জনায় জন্মানো পাশ্চাত্য শিক্ষার কুশিক্ষিতরাই জাতির হাড়ের মজ্জাটুকুও খেয়ে নিঃশেষ করবে। অশিক্ষিত জনগণ দেশ ও জাতির মাটি। এরাই তৃণমূলে জাতির উন্নয়ন ও উৎপাদনের মূলধন। উপনিবেশবাদের কুশিক্ষায় শিক্ষিতরা ওদের নিলামে বিক্রি করে খায়। তোমাদের আরবমরু পূর্বে সম্পদশালী ছিলো না। তাই উপনিবেশবাদীরা তোমাদের দেশ দখল করেনি। ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অঞ্চল উর্বর বলে তা উপনিবেশবাদীরা দখল করেছিলো। জায়ীরাতুল আরব, বিশেষ করে নজদ ও হিজায অনুৎপাদনশীল মরুভূমি হওয়ায় “লায়াবিলিটি স্টেট” হবে বলে তোমাদের দেশ তারা দখলকরে নেয়নি। এখন পেট্রোল আবিষ্কৃত হওয়ায় কিন্তু তোমাদের দেশ তাদের চাইই। কিন্তু তারা তোমাদের দেশ পূর্বের মতো সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিবেনা। তোমাদের পয়সাই তোমাদের নতুন প্রজন্মকে ওদের শিক্ষা দিয়ে সাত সমূদ্রের ওপার থেকেই তোমাদের সন্তানদের মাধ্যমে নিকৃষ্টতম শাসন শোষন করবে। আমাদের দেশ অশিক্ষিত জনগণ ভাঙ্গেনি। তোমাদের দেশও অশিক্ষিতরা নিলাম করবেনা। করবে ওদের শিক্ষায় শিক্ষিত তোমাদের সন্তানরা। সে কথাটিই বলে সতর্ক করতে আমরা তোমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। তোমাদের কাছে আমাদের দুঃখের কথা বলে ভিক্ষা করতে আসিনি। এসো, আমাদের অভিজ্ঞতা ও তোমাদের আল্লাহপ্রদত্ত অর্থে আমরা মুসলিম উম্মাহ হিসেবে পুনর্জাগরিত হতে পারি, এমন শিক্ষা ও সংস্কৃতি গড়ে তুলি।” আমার পর কোরবান আলীও বললো। অধ্যাপক গোলাম আযমও পরে আমাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বললো বটে, কিন্তু তাতে কোনো প্রাণ ছিলোনা। আমাদের কথায় শেখ আহমদ সালাহ জামজুম প্রথমে যে ভাবে অপমানকর মনোভাব পোষণ করে কথা আরম্ভ করেছিলো, তা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে পরস্পর শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশে সাক্ষাৎ শেষ হলো। কিন্তু কপাল মন্দ। সাক্ষাৎ শেষ হতেই শেখ তার দেরাজ খুলে তার চেকবই বেরকরে একটি চেক লিখে তুলে ধরতেই আমাদের অধ্যাপক গোলাম আযম তা লুফে নিয়ে তার ব্যাগে পুরলো। অপমানবোধে আমার মনে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো, তা আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ জানে না। তখন সৌদী এক রিয়ালের মূল্য ছিলো আড়াই টাকা মাত্র। এক হাজার রিয়ালের লোভে সেদিন যে অপমানবোধ নিয়ে ফিরেছিলাম, আজো ভুলিনি। কিন্তু ঐ নির্লজ্জ লোকটি যে আজো তার ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভে ইসলামের সর্বনাশ করছে, তার হয়তো কোনো অপরাধবোধই নেই। ইসলামী ইমামত নবীদের মিরাস বা উত্তরাধিকার। নবী রাসূলদের নিকট অহী আসতো। আখেরী নবী সঃ এর মে’রাজ হয়েছে। তাঁর দ্বারা পূর্ণতাপ্রাপ্ত দ্বীনের বিশ্বনেতৃত্ব দেয়ার জন্য যেখানে শাহীনের মতো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মহাকাশে উড্ডয়নক্ষম বিরল বাজপাখী হওয়া প্রয়োজন, সেখানে ডাষ্টবিন ঘাটা কাক দিয়ে কি সে নেতৃত্ব কল্পনা করা যায়?

আমরা কতো হতভাগ্য যে এ ধরনের আবর্জনার চিল কাক ও শকুন প্রকৃতির মোল্লা মৌলভী বা অর্ধ-শিক্ষিত বংশানুক্রমে বিকৃত মস্তিস্ক তথাকথিত প্রফেসরের চক্রান্তে ঘুরপাক খাচ্ছি! উপরোল্লেখিত ঘটনাটি ১৯৭৩ সালের সম্ভবতঃ জানুয়ারী কি ফেব্রুয়ারী মাসের ঘটনা। প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর পূর্বের কথা। তখন আমি জামজুমকে যা বলেছিলাম, তা আজ একশ’ ভাগ সত্য প্রমাণিত। সম্পূর্ণ আরববিশ্ব আজ বিশ্ব ইয়াহুদী খৃষ্টান সাম্রাজ্যবাদের হাতে ক্রীতদাস। বাংলাদেশ থেকে ইসলামী পূর্ণজাগরণের আন্দোলনের কথা ভাবা যায়। কিন্তু কোনো আরবদেশে কি তা কল্পনাও করা যায়? যে আফগান যুদ্ধে রাশিয়া পরাজিত না হয়ে বিজয়ী হলে ভারত থেকে আরম্ভ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান সহ গোটা আরবদেশ রাশিয়ার সামারকান্দ ও বোখারা হতো, সে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী আরব যোদ্ধারা তাদের দেশে ফেরত যেতে পারছেনা। গেলেই খতম! ভিক্ষা, সাদকা, যাকাত, চাঁদা ও হারাম খেলে মানুষের রূহ মরে যায়। মানুষের স্মৃতি শক্তি থাকেনা। সে জন্যই হয়তো সাদকা যাকাত আল্লাহ্ মিসকিন দরিদ্রদের জন্য বৈধ করলেও নবী রাসূল এবং ইসলামী ইমামদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু অদৃষ্টের রূঢ় উপহাস যে ইসলামের নেতৃত্বের দাবিদারদের আজ উচ্ছিষ্ট ব্যতীত কোনো জীবিকা নেই। ধিক্ শতো কি এদের উপর।

[এ হ‌’লো ইসলাম- ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৬১-৩৬৫]

আরবি না জেনেও লন্ডনে গোলাম আজমের আরবি শিক্ষকতা

অধ্যাপকের দ্বিতীয ঘটনায় আসা যাক। ভদ্রলোক লন্ডনে তার কেন্দ্র স্থাপন করেছে। কারণ সে তো আর মক্কায় নাযিল হওয়া ক্বোরআনভিত্তিক ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার লোক নয়! সে ইবলিস্ কর্তৃক ইউরোপ-আমেরিকার ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের উপর অহী করা গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মানসপুত্র। তাই সে তার মক্কা ও ক্বেবলায় তার কেন্দ্র স্থাপন করেছে। তবে পেট্টোডলারের চাঁদার জন্য আরব দেশে আসা যাওয়া করে। সে তো আর কোনো শ্রমকরে হালাল উপার্জনে বিশ্বাসী নয়! তাই ইসলামের নামে চাঁদাতোলাই তার পেশা ও জীবিকা ছিলো। মক্কায় রাবেতা হজ্জ মৌসূমে ও রমজান মাসে বিশ্বের ইসলামী চাঁদাবাজ ও পেশাদারদের সম্মেলন করে থাকে। এটা সৌদী রাজতন্ত্রের প্রোপাগান্ডার একটি রুটিন কর্মকান্ড। তাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশথেকে তাদের তালিকাভুক্ত লোকদের আসা যাওয়ার টিকেট ও হোটেলের খরচ বহন করে সৌদী সরকার। প্রচলিত ওমরা করা ও মাদীনা যেয়ারত ছাড়াও প্লেনে করে গিয়ে সৌদী বাদশার সাক্ষাৎ নসীব হয়। এ উপলক্ষে উদরসর্বস্ব ইসলামী চিন্তাবিদরা রাবেতা থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে কিছু অনুদানও পায় এবং নতুন নতুন পরিকল্পনা ও প্রকল্প পেশ করে রাবেতার অনুমোদন সাপেক্ষে সরকারী অনুদানও পায়। অনেকে এ সুযোগে এসে কুয়েত, আমীরাত, সৌদী আরব সহ আরবদেশের ধনী শেখ ও ব্যবসায়ীদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে রমজান মাসে যাকাত উসুল করে থাকে। কারণ, আরবরা সাধারণতঃ রমজান মাসে যাকাত দেয়। এমনি এক সম্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আযম মক্কা আসে। এবার লন্ডনে একটি বড়োসড়ো ইসলামী প্রতিষ্ঠান দাঁড়করার কাগজ পত্র তৈরী করে নিয়ে এসেছে। তখন সালেহ্ কায্যায নামের এক ব্যক্তি রাবেতার সেক্রেটারী জেনারেল ছিলো। লোকটি ইংরেজী জানে না। তার মাতৃভাষা আরবীই জানে। সম্মেলন শেষে অধ্যাপক বললো যে সে যেহেতু আরবী জানে না এবং শেখ সালেহও ইংরেজী জানেনা, তাই আমি যেনো তার সাথে গিয়ে অনুবাদক রূপে তাকে সাহায্য করি। আমি গেলাম। সাক্ষাতের শুরুতে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর অধ্যাপক আযম লন্ডনে অনারবদের আরবী ভাষা শিক্ষা থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য ইসলামী কর্মকান্ডের বিশ-তিরিশ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রকল্পের কাগজ পত্র দিতেই তা শুনে শেখ সালেহ কায্যায় ক্ষেপে গিয়ে কাগজগুলো ছুড়ে মেরে অপমানজনক ভাবে বলতে লাগলো, “প্রফেসর, তুমি নিজে আরবী জানো না। তুমি অন্যদের আরবী শিক্ষা দিবে? আরব দেশের দূতাবাসসমূহের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো কি ঘোড়ার ঘাস কাটে যে সে কাজ তোমার করতে হবে! যাও তুমি তোমার কাজ করো। এগুলো কিছুই হবেনা।” আমার উপর পূর্বের চেয়েও বড় বাজ পড়লো। লজ্জা ও ক্ষোভে আমি থ’মেরে গেলাম। অধ্যাপক আযম শেখ সালেহের ছুড়ে মারা কাগজগুলো গুছাতে লাগলো। তারপরও আল্লাহর এ বান্দাটি আমাকে বলতে বললো যে শেখ তার লন্ডন-জিদ্দা ও লন্ডন টিকেটটি লন্ডন-জিদ্দা-কুয়েত-জিদ্দা-লন্ডন করে দিলে অধ্যাপক কৃতার্থ হবে। আমার এর তর্জমা করতে হলোনা। শেখ সালেহ তা বুঝে ফেলে বললো, “হাযা বাসিত তাইয়েব, রুহ ইলা তিজানী। ঠিক আছে, তা করে দিচ্ছি। তিজানীর কাছে যাও। আমি তাকে বলে দিচ্ছি।” এ বলে সে তার সহকারী তিজানীকে ইন্টারকমে বলে দিলো। তখনই আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম। দাস্ ফার, নো ফারদার। এখানেই শেষ। আর নয়। এ লোকের সাথে আর কোথাও যাবো না।

রাবেতার শেখ সালেহের সাথে আমার পূর্বের পরিচয় ছিলো। কাবায় প্রায়ই দেখা হতো। তখন মক্কায় আমি বলতে গেলে একা। আমি পাকিস্তানীদের কাছ থেকে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে চলি। জিন্নাহ থেকে হালালভোগী এক কৃষক থেকে একটি সোনালুগাছের খাম্বা নিয়ে মসজিদ নির্মাণ করেছিলো। আমি ছোটকালে বাপ ও ভিটামাটিহারা হলেও পারিবারিক ঐতিহ্যের নিয়ামানুবর্তিতা ছাড়তে পারিনি। ছাত্র রাজনীতিকে আমি ছেলেধরার মতো মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ মনেকরি। কারণ, ছাত্র রাজনীতির পান্ডারা শিক্ষার্থী ছেলে- মেয়েদের পিতা-মাতা, অভিভাবক ও গুরু শিক্ষকের অবাধ্য বানিয়ে ফেলে। ফলে এরা পরিবারের কুলাঙ্গার হয়। আমার ইয়াতীম দশার অগ্নিপরীক্ষায় বহু কষ্টকরে ছোটো ভাইদের পড়া লেখা করাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে জামাতী ছাত্রসংঘ ওদের পড়া লেখার সাধনার সর্বনাশ করে দেয়। ফলে একাত্তর সালে আমার অবাধ্য হয়ে তারা পড়া-লেখা বাদ দিয়ে রাজাকার বাঁদরবাহিনীতে যোগ দেয়। ফলে বাংলাদেশ হলে বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয়টিকে নিয়ে আমি সমস্যায় পড়ি। ছোটোটি ছাত্র সংঘ করলেও ফাঁকিবাজ স্বভাবের ছিলো বলে ওটা বাঁদর বাহিনীতে যায়নি। দ্বিতীয়টিকে লন্ডনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য অধ্যাপক গোলাম আযম থেকে কিছু পয়সা ধার করে লন্ডনে আব্দুল আযীয নামের এক ছেলেকে ওর ভর্তি ও টিকেটের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। আব্দুল আযীয রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত থাকাকালীন নিজের পরিবারের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচার হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান রক্ষায় আল বদর করেছিলো। একাত্তরের পর আমি চট্টগ্রাম থাকা কালীন উক্ত আব্দুল আযীয সহ আরো ওর মতো ক’জন আমার বাসায় ছোটো ভাইদের সাথে আসা যাওয়া করতো এবং খাওয়া দাওয়াও করতো। সে সুবাদে ওরা আমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আমিও ওদের প্রতি স্নেহশীল ছিলাম। আমি মক্কায় চলে আসলে আব্দুল আযীযও কোনো প্রকারে লন্ডনে পৌঁছে ওখানে পড়ালেখা আরম্ভ করে। ওকে জিয়াউদ্দিনের লন্ডনে ভর্তির দায়িত্ব দিয়ে অধ্যাপক আযম থেকে ধারকরা চাঁদার পয়সা দেয়া হয়েছিলো। কথা ছিলো যে আমি পরে সে পয়সা ফেরত দিবো। অধ্যাপক আযম যখন দেখলো যে তার থলেতে পড়ার লোক যেহেতু আমি নই, তাই আমার ভাইরাও তাদের থলের বিড়াল হবেনা, সে জন্য সে আগে ভাগেই বুঝতে পেরে আব্দুল আযীয থেকে তার ধার দেয়া পয়সাটা ফেরত নিয়েছিলো। যাতে জিয়াউদ্দীন আর লন্ডনে গিয়ে পড়ালেখা করতে না পারে। আল্লাহর রহমতে আমার পরিবার একটি কলঙ্ক থেকে রক্ষা পেলো। হতে পারতো অধ্যাপক গোলাম আযম মক্কায় সালেহ কায্যাযের সে অপমানজনক ঘটনার পরও রমজান মাসের যাকাত ও দান খয়রাতে কুয়েতে চলে যায়। রমজান মাস ওখানে কাটিয়ে পুনঃ মক্কায় আসে। কাবা ঘরে অধ্যাপক আযম আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলেছিলো, “ভাই ভিক্ষার ব্যাপারে আপনার কথাই ঠিক। আমি কুয়েতে এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গেলে তার মালিক দরজা খুলে দেখে আমাকে এক মুখভর্তি থুথু আমার মুখে ও কাপড়ে নিক্ষেপ করেছে।” আমি তার কথা শুনে খুব ব্যথিত হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। আন্তরিক সমবেদনার সাথেই বলেছিলোম, ভাই এ পথ ছাড়ুন। এপথ ইসলামে নেই। নিষিদ্ধ। তারপর গোলাম আযম পুনঃ লন্ডনে চলে গেলো। আমি মনে মনে ভাবছিলাম যে, এরপর লোকটির বিবেক তাকে সঠিক পথে চালাবে। কিন্তু হায়! ভিক্ষারপেশা এইডস রোগের ন্যায়। এর পরের বছরে হজ্জপালনে গোলাম আযম মক্কায় আসলো। আব্বাস আলী খান, মাওলানা এ,কে,এম, ইউসুফ, মাওলানা আব্দুস সোবহান ও নুরুজ্জামান সহ দশ বারোজন সমবেত হয়েছে হজ্জ উপলক্ষে। বলতে গেলে গোটা জামাতী ইসলামীই এরা। আরাফা ও মুজদালিফায় হজ্জের অকুফ ও ইফাদা সেরে মিনায় এসে কোরবানী করার পর মিনার একপ্রান্তে আগুন লাগলো। আমাদের তাবু থেকে তা অনেক দূরে হলেও বাতাসের গতি দেখে আমার আশঙ্কা হলো যে আগুন আমাদের দিকে এসে যেতে পারে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমার সঙ্গীদের নিয়ে যতোপারি তাবুর রশি কেটে তাবু বসিয়ে দেই মাটিতে। তাতে আল্লাহ্ চাহেন তো কিছু তাবু ও লোক রক্ষা পাবে। হজ্জ আমাদের এই সমস্ত পরিস্থিতিতেই ত্যাগের প্রশিক্ষণ দেয়। তাই কোরবানীর ছুরি চাকু নিয়ে তাবু রক্ষার যুদ্ধে নামলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমার নিজেরটা সবার শেষে কাটবো। পূর্বে অন্যদেরগুলো রক্ষার প্রচেষ্টা নিবো। সে ভাবেই যুদ্ধাবস্থার মতো কাজে নেমে গেলাম। আগুনের শিখার সাথে তুফানের মতো বাতাসও বেড়ে গেলো। তাই প্রায় দেখতে দেখতেই বলা চলে আগুন আমাদের এলাকায় এসে গেলো। বহু তাবু বাঁচালাম। কিন্তু আমার নিজেরটা রক্ষা পেলোনা। তাতে আমার আব্বার চিহ্ন একটি কম্বলও পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। এটি আমি সঙ্গে সঙ্গে রাখতাম। সে দুর্ঘটনায় আমার আশা ছিলো যে অধ্যাপক গোলাম আযম ও তার সঙ্গী নেতারা হজ্জের ময়দানে অন্যের সেবার স্বাক্ষর রাখার মতো কিছু করবে। কারণ হজ্জ এ পরীক্ষার বিশ্বসম্মেলন। কিন্তু আমার সকল ধারণা অমূলক প্রমাণ করে ইসলামী আন্দোলনের বিশ্বনেতারা সবাই নিজ নিজ বিছানাপত্র এমনকি প্লাষ্টিকের বদনাটি পর্যন্ত নিয়ে সবার আগে নিরাপদে পাহাড়ে চলে গেলো। কারো একটি সুতাও পুড়লোনা। পরে আগুন নিভানোর পর সন্ধ্যায় পুনঃ তাবু খাটানোর পর এরা সবাই পাহাড় থেকে নেমে তাবুতে জায়গা দখল করতে কে কার আগে পারে প্রতিযোগিতায় লেগে গেলো। তাবু রক্ষার কাজেও তারা কেউ ছিলোনা। পুনঃ খাটানোর কাজেও কেউ ছিলোনা। আমি সেকেলে আল্লাহর অধমবান্দা, কল্পনায় আরো পিছনে চলে গেলাম। ভাবলাম যে এ হজ্জতো হযরত ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও আখেরী নবী সঃদের ত্যাগের শিক্ষার হজ্ব। তাঁদের সময় এ ঘটনা ঘটলে কি তাঁরা নিজেদের স্বার্থ এভাবে দেখতেন? এখনকার নেতারা তো তাদেরই আদর্শ স্মরণ ও অনুসরণে এখানে আসে! এরা কারা এবং তাঁরাই কারা? এদের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য কতটুকু? কেনো এরা আসে? এদের আসল পরিচয় কি ?

[এ হ‌’লো ইসলাম- ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৬১-৩৬৫]

আলেমদের মিশনের এক ইতিহাস

আল্লাহর জন্য কোরবান করার প্রস্তুতির নিদর্শন এ পবিত্র হজ্জের শিক্ষা। তাই তোমরা যদি আল্লাহর জন্য হজ্জে এসে থাকো, তা হলে আল্লহামদুলিল্লাহ্ বলে খুশী হও যে আল্লাহ্ তোমাদের কিছু অন্ততঃ তিনি কুবুল করেছেন। আর যদি নস্ ও সৌদী সরকারের জন্য হজ্জের প্রহসনে এসে থাকো, তা হলে তোমরা হজ্জ বিক্রি করে জনপ্রতি আটশ রিয়াল নিতে পারো। আমার হজ্জ সারা দুনিয়া দিলেও বিক্রির জন্য নয়। মুয়াল্লিম পান্ডা পেছনে লেগেছিলো এ’বলে যে আপনি ও আপনার সঙ্গীরা না নিলেও আপনাদের হজ্জের পরিচয়পত্র আমাকে দিন, আমি মিসকীন মানুষ, আমি উপকৃত হই। আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলাম, এ হারাম কাজ আমার ও আমার সঙ্গীদের দ্বারা হবেনা। তুমি অন্য চিন্তা করো। এ মুয়াল্লিম প্রতারকরা অন্যান্য হাজীদের সাথে মিলে তাদের পক্ষ থেকে সরকার থেকে ক্ষতিপুরণের নামে পয়সা আদায় করে হাজী প্রতি দু’তিনশ রিয়াল আত্মসাৎ করেছে। আমি তা দেখেছি আর আল্লাহর কাছে এদের থেকে মক্কা মাদীনাকে পবিত্র করার ফরিয়াদ করেছি।

শোক দুঃখের চরম আঘাত আসলো যখন জানলাম যে আন্তর্জাতিক ইসলামী আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম তার সকল সঙ্গীনেতাদের নামের তালিকা সহ ক্ষতিপূরণের পয়সা উসুল করেছে। তারপর আরো মজার কথা যে, নেতা তার সঙ্গীদের বলেছে যে যেহেতু আমাদের কারো কোনো ক্ষতি হয়নি, তাই এ অর্থটি আমাদের বাইতুল মালেই জমা হোক! ইন্নালিল্লাহ! এ হলো সূরা তওবার বর্ণিত হারামখোর, প্রতারক ও ঘৃন্যপেশাদার ইসলামী নব্য ইয়াহুদী আহ্হ্বার ও রুহবানদের ক্রোনোলজি, বা সূক্ষ্ম মান নিরূপক তথ্যপঞ্জি।

এদের হাতে ইসলামের নামে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব আসলে বাইতুল মাল বা জাতীয় অর্থভান্ডার এদের হাতে পড়লে কী অবস্থা হবে, তা কি ভাবা যায়? এভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ধারে কাছেও না পৌঁছে শুধু ধর্মের সাইনবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে অন্যায়ভাবে অর্থ সংগ্রহের নামে বাইতুলমাল দিয়ে সে পয়সায় সপরিবারে বিদেশে বাস করে, বাড়ি ক্রয় করে, ছেলেদের উচ্চ শিক্ষা দিয়ে বিদেশে শিল্প কারখানা করে এবং দেশে আটতলা দশতলা বাড়ি করে তাতে যদি লেখা হয় “এ বাড়িটি ব্যাঙ্কে দায়বদ্ধ,” সে চক্রের হাতে কি ইসলামী খেলাফত ও ইমামত কল্পনা করা যায়?

এগুলো প্রফেসরী ইসলামীদের ব্যাপারে আমার জানা যৎসামান্য সাক্ষ্য। এবার আসা যাক যুগশ্রেষ্ঠ কথিত বুজুর্গ, আলেমে দ্বীন, ও আল্লাহর অলী ও তাদের কিছু বর্ণনায়। আমি হাফেজ্জী হুজুরের সাথে ইরান সফরে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। তাতে আমি এ শর্তে যেতে রাজী হয়েছিলাম যে, আমি আমার টিকেটে যাতায়াত করবো। ইরানীদের পয়সায় যাবো না। সে ভাবে হাফেজ্জীর সফরসঙ্গী হলাম। এ সফর ছিলো ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় ইরানী নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী ও তার উলামা পরিষদ এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সাথে সাক্ষাত করা। অত্যন্ত স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ সফর। হাফেজ্জী রক্তীয়তায় খালু হয়। তাই মূলতঃ তার ইচ্ছায় আমি সফর সঙ্গী হতে রাজী হই। আমি ইরান পর্যন্ত যাবো। ইরাক যাবো না। কারণ, আরবদের ব্যাপারে আল্লাহ্ আমাকে যা জানিয়েছেন, ওদের ব্যাপারে পার্থিব ক্বিয়ামত ছাড়া অন্য কিছুতে ওদের চিকিৎসা হবে না বলে আমি নিশ্চিত। ইরানীদের জানা দরকার। তাই এ সফরে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমি সজাগ ছিলাম যে মধ্যস্থতা বা সালিসী করতে কোনো পক্ষের অর্থানুকুল্যে গেলে তা কখনো ফলপ্রদ হয় না। তাই অন্যরা যাই করুক, আমি কারো ভাড়াটে হয়ে যাবো না। অন্যরা যারা নিরুপায়, তাদের খুব সতর্ক হতে হবে, যাতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা খর্ব না হয়। হাফেজ্জী, মাওলানা আযীযুল হক, ফজলুল হক আমিনী, অধ্যাপক আখতার ফারুক ও হাফেজ্জীর ছেলে হামিদুল্লাহ এ মহা গুরুত্বপূর্ণ মিশনের সদস্য। ইরানীরা তাদের ঢাকা-তেহরান-জিদ্দা-ঢাকা টিকেট দিলো। আমরা তেহরান পৌছালাম। হাফেজ্জীকে বলাচলে রাষ্ট্রপতির ও রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মানে ইরানীরা ভূষিত করেছে। আমি দু’দেশের দু’শ্রেণীর মোল্লাদের মধ্যে পার্থক্য দেখেছি। আমাদের মোল্লারা সমাজের উচ্ছিষ্ট ভোগী মিসকীন। আর ইরানী শিয়া মোল্লারা মালের উৎকৃষ্ট অংশ খুমভোগী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। আমি পদে পদে উভয়কে মাপছি। প্রথম দিন সন্ধ্যায় আমাদের খানা দিলো ফরাস বিছানো মেঝের উপর। আমাদের উঠানো হয়েছে শাহের যমজবোন বিতাড়িত আশরাফ পাহলভীর প্রাসাদে। আমাদের এ্যাটেনডেন্ট আয়াতুল্লাহ আহমদ জান্নাতি। প্রাসাদের পাশেই একটি দোতলা বাড়িতে তার বাস। আমাদের শোয়ার ব্যবস্থাও ফ্লোরে ফোমের বিছানার উপর। সন্ধায় আমাদের খাবারের পর ফল স্বরূপ পিয়ারস দিয়েছিলো। ফলগুলো একটু বেশী পাকা ছিলো বলে আমাদের হুজুররা অর্ধেক অর্ধেক খেয়ে দস্তরখানে রেখে দিলো। আমাদের খাওয়া শেষ না হতেই ইরানের সর্বোচ্চ পরিষদের আলিমরা আমাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য আসলো এবং আমাদের পাশেই বসে পড়লো। আমাদের পরিত্যক্ত ফলগুলো পকেট থেকে চাকু বের করে কেটে খেয়ে ফেললো। আমি তা’খুব গুরুত্বের পরে বেচারা অনন্যোপায় হয়ে তাদের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্মকর্তাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে এতোরাত্রে ভল্ট খুলে বিদেশী মুদ্রা বের করে এনে হাফেজ্জীকে দু’হাজার এবং অন্যান্যদের একহাজার ডলার করে দিয়ে আপদ পার করলো। বলে দিলো যে, মক্কায় তাদের “সাজেমানে আওকাফে ইরানকে” ইনফর্ম করে দিবে মক্কা, আরাফাহ, মিনা ও মাদীনায় এদের দেখাশুনা করতে। কিন্তু এরাতো গিয়েছে এদের সংকীর্ন মতলবে! তাই তারা মক্কা পৌঁছে ইরানীদের সাথে যোগাযোগ না করে তাদের বংশালের এক গরীব শাগরেদ ক্বারী মিযানুর রহমানের উপর সওয়ার হয়েছে। এ বেচারা হজ্জ মৌসুমে হাজীদের কাছে বাড়ী ভাড়া দিয়ে কোনো প্রকার চলে। হাফেজ্জী ও আযীযুল হক তার ওস্তাদ বলে তাদের ক্বারী মিযান জায়গা দিয়েছে তার ওখানে উঠতে। যখন হজ্জের দিন ঘনিয়ে আসছে, তখনো তার ওস্তাদরা ভাড়ার কথা কিছুই বলছেনা। পরে বাধ্য হয়ে বেচারা তাদের বলার পর হজ্জের একদিন কি দু’দিন পূর্বে তারা তাকে ভাড়া না দিয়ে পোটলা পুটলি নিয়ে হারাম শরীফ গিয়ে উঠে। ক্বারী মিযান দেশে এসে আমার সাথে সাক্ষাত করে তার ওস্তাদদের কান্ড শোনায়। হাফেজ্জীরা মক্কায় লাইন করে ইরাকীদের সাথে যোগাযোগ করে ইরাকীদের কাছে থেকে পুনঃ জিদ্দা, বাগদাদ, ঢাকার টিকেট সংগ্রহ করে। বাগদাদ পৌছে সাদ্দাম হোসেনের সাক্ষাতের সময় বাংলাদেশে তার দু’পালতু আব্দুল মান্নান ও মহিউদ্দিন খাঁর সাথে তাদের বচসা হলেও তারা ইরাকীদের আতিথেয়তায় “বাগদাদ মিশন” শেষ করে ঢাকা ফেরত আসে। ফেরত এসে তাদের কোনো নৈতিকতা থাকলে তাদের কর্তব্য ছিলো ইরানীদের জিদ্দা-ঢাকার প্যাসেজ টিকেটটুকু ইরানীদের ফেরত দেয়া। ইরানী রাষ্ট্রদূত সস্ত্রীক আমার বাসায় এসে জানালো যে, সে টিকেট তাদের ফেরত দেয়া দূরে থাক, তাদের কোনো অনুমতি না নিয়েই এ বুজুর্গরা ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে টিকেটের পয়সা তুলে নিয়ে হালাল করে ফেলেছে। এরা ইরানীদের সাথে জুমায় সালাত পড়ে ঘরে এসে সালাত দোহরায়ে নিয়েছে। অর্থাৎ ইরানীরা মুসলিম নয়। ঠিক আছে। তাই যদি হয়, তা হলে এদের পয়সা গিলা এদের জন্য কী রূপে হালাল হয়? তারপরও হজ্ব কনফারেন্স, আমীরে শরীয়ত সম্মেলন ও প্রেস প্রকাশনীর নামে বহু কোটি টাকা এনে এরা হজম করেছে। এ জঘণ্য কাজ এরা কিভাবে করে? উত্তর, এরা সূরা তওবায় আল্লাহ্ কর্তৃক বর্ণিত ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতে হারামভোগী ইয়াহুদী-খৃষ্টান আহবার ও রুহবানদের মুসলিম সংস্করণ। কেয়ামতের দিন এ অর্থ দিয়ে এদের স্যাঁকানো হবে। এরা যদি ইসলামের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের অর্থের ভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ হাতে পায়, তার তলী থাকবে? এরপর থেকে ঘৃণায় আমি এদের বাদ দেই এ মনে করে যে এরা সংশোধনের অযোগ্য। এদের আল্লাহ্ তাঁর বিশেষ বিধানে ধরবেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সে সময় কাছে এসেছে।

[এ হ‌’লো ইসলাম- ইয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ তোয়াহা বিন হাবীব, পৃ.৩৬৬-৩৬৭]


Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.