সিরাজ সিকদারের পার্টিতে জুয়েল আইচের অপারেশন ও শর্ষিণা পীরের ইতিহাস

বাংলাদেশের জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ তরুণ বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সিরাজ সিকদারের অধিনে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অপারেশনেও অংশগ্রহণ করেন। মহিউদ্দিন আহমদের লেখা লাল সন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি বইতে তার বর্ণনা আছে। যদিও মহিউদ্দিন আহমদ জুয়েল আইচের অংশটি নিয়েছেন রাজু আলাউদ্দিনকে দেওয়া জুয়েল আইচের সাক্ষাৎকার থেকে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জুয়েল আইচের একটা অপারেশনে উঠে এসেছিল তৎকালীন প্রভাবশালী পীর রাজাকার শর্ষিণা পীরের কথা। শর্ষিণা পীর এতই কুখ্যাত ছিল যে স্বাধীনতার পরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭২ সালে ৫ জানুয়ারি ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার রিপোর্ট- “শর্ষিণার পীর আবু সালেহ মোহাম্মদ জাফর ধরা পড়েছেন। গত শনিবার পয়লা জানুয়ারি শর্ষিণা থেকে তাকে গ্রেফতার করে বরিশাল সদরে নিয়ে যাওয়া হয়। গত ১২ই নভেম্বর ৫ শতাধিক রাজাকার, দালাল ও সাঙ্গপাঙ্গসহ মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে তখন থেকে পীর সাহেবকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। উল্লেখ্য, নরঘাতক টিক্কা খানের আমলে ঢাকার ফরাসগঞ্জের লালকুঠিতে যে সকল পীর, মাদ্রাসার মোহান্দেস-মোদাররেস ও দক্ষীণপন্থী রাজনীতিক রাজাকার বাহিনী গঠন করা, প্রতিটি মাদ্রাসাকে রাজাকার ক্যাম্পে পরিণত করা এবং সকল মাদ্রাসার ছাত্রকে রাজাকার ও পুলিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় শর্যিণার পীর সাহেব তাদের অন্যতম।” (যারা শর্ষিনা পীরের কুকীর্তি জানতে আগ্রহী তাদের জন্য: রাজাকার শর্ষিণার পীরের স্বাধীনতা পদক প্রত্যাহার করা হোক)

শেখ মুজিবের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে শর্ষিণার পীর সম্পর্কে লেখা আছেন। সময় ১৯৫৪ এর নির্বাচন, তিনি বলছেন- জামান সাহেব ও মুসলিম লীগ যখন দেখতে পারলেন তাদের অবস্থা ভাল না, তখন এক দাবার ঘুঁটি চাললেন। অনেক বড় বড় আলেম, পীর ও মওলানা সাহেবদের হাজির করলেন। গোপালগঞ্জে আমার নিজের ইউনিয়নে পূর্ব বাংলার এক বিখ্যাত আলেম মওলানা শামসুল হক সাহেব জন্মগ্রহণ করেছেন। আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করতাম। তিনি ধর্ম সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন। আমার ধারণা ছিল, মওলানা সাহেব আমার বিরুদ্ধাচরণ করবেন না। কিন্তু এর মধ্য তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করলেন এবং আমার বিরুদ্ধে ইলেকশনে লেগে পড়লেন। ঐ অঞ্চলের মুসলমান জনসাধারণ তাকে খুবই ভক্তি করত। মওলানা সাহেব ইউনিয়নের পর ইউনিয়নে স্পিড-বোট নিয়ে ঘুরতে শুরু করলেন এবং এক ধর্ম সভা ডেকে ফতোয়া দিলেন আমার বিরুদ্ধে যে, “আমাকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, ধর্ম শেষ হয়ে যাবে।“ সাথে শর্ষিণার পীর সাহেব, বরগুনার পীর সাহেব, শিবপুরের পীর সাহেব, রহমতপুরের শাহ সাহেব সকলেই আমার বিরুদ্ধে নেমে পড়লেন এবং যত রকম ফতোয়া দেওয়া যায় তাহা দিতে কৃপণতা করলেন না। দুই চার জন ছাড়া প্রায় সকল মওলানা, মৌলভী সাহেবরা এবং তাদের তালবেলেমরা নেমে পড়ল। (পৃ. ২৫৬ )

আমাদের দুর্ভাগ্য হল, ৭১-এ হিন্দু নারীরা গনিমতের মাল ও যুদ্ধ করে জয় করা পণ্য এমন ফতোয়া দেওয়া এক কুখ্যাত পীরকে পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কৃত করা হয়। ২০২০ সালে জুয়েল আইচ নিজেও এই রাজাকার পীরের পদক কেড়ে নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। অথচ প্রতিটি রাজনৈতিক দল ভোট ও রাজনীতির স্বার্থে এই পীরের আখড়া ও তার পরিবারিক অনুষ্ঠানে সবসময় যাতায়াত করেছেন। আসুন দেখা যাক জুয়েল আইচের বর্ণনায় রাজাকার শর্ষিণা পীর কেমন ছিলেন।

“ঢাকার জগন্নাথ কলেজে পড়তেন গৌরাঙ্গ লাল আইচ। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি বরিশালে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। তিনি পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। দলে তাঁর নাম কমরেড জাহিদ। পেয়ারাবাগানের প্রতিরোধযুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। পরে কলকাতায় চলে যান। নিজের নাম ছোট করে লিখতেন জি এল আইচ। এটি পরে জুয়েল আইচে রূপান্তরিত হয়। ম্যাজিশিয়ান হিসেবে খ্যাতি পান তিনি। রাজু আলাউদ্দিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি:

আমাকে সাতজনের একটা গ্রুপের লিডার করে দেওয়া হলো। প্রথমে যে যুদ্ধটা হলো, কাপড়কাঠি বলে একটা জায়গা ছিল, স্বরূপকাঠি, বানারীপাড়া এবং ঝালকাঠি এই তিন এলাকা নিয়ে একটা বিশাল পেয়ারাবাগান। ওই পেয়ারাবাগানের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে একটা ছোট নদী। একটা গ্রামের নাম ছিল কাপড়কাঠি। ওই সময় নদীটাকে কাপড়কাঠি নদী বলতাম। ওইখানে ৫০০ গজের মতো জায়গায় ছয়- সাতটা ইউনিট একত্রিত হলাম। একজন সিনিয়র লিডারের হাতে সংকেত দেওয়ার জন্য রইল বাঁশি। আমাদের প্রত্যেকের হাতে কিন্তু প্রাচীন থ্রি নট থ্রি রাইফেল। আর ওদের হাতে মেশিনগান, শেল। যুদ্ধ যে কী ভয়াবহ হতে পারে আমরা জাবতাম। ওই ৫০০ গজের মধ্যে আমরা আলাদা আলাদা ইউনিট নিয়ে অবস্থান করলাম।

আমাদের প্ল্যান ছিল যে, আমাদের ঘর পুড়তে, মানুষ মারতে ওরা আসত সকালে। সকালে আমরা ওদেরকে আক্রমণ করব না। যেহেতু আমরা গেরিলাযুদ্ধ করছি। তাই ওরা যখন দুর্বল তখন ওদেরকে আঘাত করার আমাদের আসল টাইম। আমরা অ্যামবুশ করে রেখেছি। ওরা আসত কাঠের লঞ্চে। আমরা ওটাকে বলতাম ঘরপোড়া লঞ্চ। যখন ওরা জাহাজ থেকে নেমে গেল, তখন আমরা পজিশন নিয়ে বসে থাকলাম। কারণ, ঘরটর পুড়িয়ে মানুষ মেরে ঠিক বিকেলে ওরা ঠিকই আসছে, যখন সূর্য ডুবে যাবে। তার আগে ওরা থানায় যাচ্ছে। থানায় ওদের ঘাঁটি। গানবোটসহ অনেক কিছুই আছে। আমরা যেহেতু গানবোটের সঙ্গে পারব না, তাই আমরা টার্গেট করলাম ওই কাঠের লঞ্চ, যেটাতে করে ওরা আসত। আমরা আমাদের সিনিয়র লিডারের (সিরাজ সিকদার) হুইসেলের অপেক্ষায় আছি।

কথা ছিল যে, লঞ্চটি যখন আমাদের রেঞ্জের মাঝখানে পড়বে তখন আমরা গুলি করব সারেংকে। তারপর এলোপাতাড়ি গুলি করব লঞ্চটির গায়ে যাতে ডুবে যায়। লঞ্চটি আমাদের রেঞ্জের কাছাকাছি আসার আগেই আমাদের কারও একজনের বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে। ওরা তখন কোনোদিকে না তাকিয়েই মেশিনগান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি করতে থাকল। আমরা তো ঘাবড়ে গেছি। লঞ্চটি যাচ্ছিল ভাটির দিকে। ইতিমধ্যে লঞ্চ আমাদের ঠিক সেন্টারে এসে পড়েছে। আমরা ধমাধম গুলি করলাম। সারেং পড়ে গেছে, লঞ্চ ঘুরে গেছে। এবার লঞ্চে যখন আমরা গুলি করেছি, তখন লঞ্চটি ফেটে উল্টে গেছে। আর ওরা সাঁতার না জানা কুকুরের মতো হাবুডুবু খেতে থাকল।

তারপর ওরা কেউ কেউ কাঠ-ফাট ধরে ওপরে গিয়ে উঠল। উঠেই মেশিনগান সেট করে শাঁ শাঁ গুলি করতে থাকে। তখন গোধূলি, তখনো অন্ধকার হয়নি। ওরা কল্পনাই করতে পারেনি যে একটা পেয়ারাবাগানের মধ্যে একদল গ্রাম্য মানুষ এমন করবে। ওরা প্যানিকের চোটে মেশিনগান চালাচ্ছে তো চালাচ্ছেই। এরপর রাত বারোটা কি সাড়ে বারোটার পর ওদের গুলির শব্দ আর পাওয়া যায়নি।

ওরা ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নিলন আমাদের পরিকল্পনা হলো সকালের আলো যখন ফুটবে তখন নৌকা নিয়ে ওপারে যাব। ওদিকে গ্রামের শত শত লোক মারতে মারতে ওদের চারটাকে ধরে নিয়ে আসছে। তাদের এমন পিটিয়েছে যে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। ওদেরকে নিয়ে আমরা গরুর মতো করে রশি বেঁধে গলায় জুতো ঝুলিয়ে হাটে হাটে ঘোরাব। আবার এটা জানি, এটা আমরা বেশিদিন করতে পারব না, কারণ পাকবাহিনী প্রতি আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হবে। তবে ওরা এত ভয় পেয়ে গেল যে পরবর্তী সাত দিন আর আমাদের এলাকায় আসে নাই।

একসময় কী হলো, ওই যে শর্ষিনার পীর ছিল না, সে কুৎসিত কুৎসিত ফতোয়া দিতে শুরু করল। যেমন বলতে শুরু করল, যারা স্বাধীনতা চায় তাদের সমস্ত সম্পত্তি এবং বউ-মেয়ে এরা হচ্ছে গণিমতের মাল। ওই পীরের মাদ্রাসার ছাত্র এবং তার হাজার হাজার মুরিদকে ডেকে আনা হলো, হাজার হাজার দা দিয়ে পেয়ারাবাগান কাটার জন্য। পুলিশ তো তাদের পক্ষেই ছিল। চৌকিদার আগে থেকেই কাজ করছিল আর ওই সমস্ত দালালগুলো।

এরা আমাদের পুরো পেয়ারাবাগান সাফ করে ফেলল। আমরা মুক্তিবাহিনী ওখানে আছি জেনে আশপাশে যত বন্দর আছে সেখান থেকে লোকজন এসে বাঁচার জন্য ওখানে থাকত। এই মুহূর্তে আমি একটা কথা বললে লোকজন বিশ্বাস করবে না। কিন্তু সত্যটা আমি জানি যেহেতু, আমাকে বলতেই হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি হলো আটঘর-কুড়িয়ানার এই এলাকাগুলো। কারণ, ওই এলাকার পাঁচ হাজার মানুষকে মেরে ফেলেছে ওরা। মাইন্ড ইট, নট ফাইভ হান্ড্রেড, ফাইভ থাউজেন্ড।

পেয়ারাবাগান সাফ করে ফেলল। তখন আমরা যে যার মতো নিজের আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করলাম। আমি চলে গেলাম সোহাঙ্গল। একদিন এক ভদ্রলোক, নাম খলিল হাজরা, হুলারহাট থেকে এসেছেন। উনি ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলেন। আমাদের তখনকার যিনি এমএনএ ছিলেন, ওনার নাম এনায়েত হোসেন খান। উনি ওই ভদ্রলোককে পাঠিয়েছেন দেশ থেকে মুক্তিকামী যুবকদের রিক্রুট করার জন্য।

সোহাঙ্গল থেকে কাউকে পায়নি, আমাকে পেয়েছিল। আমি তো যাওয়ার জন্য রেডি। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম হুলারহাট, কচুয়া। এরকম করে আশাশুনি, তালা কালিগঞ্জ। পরে হিঙ্গোলগঞ্জে গিয়ে পৌঁছলাম। হিঙ্গোলগঞ্জ থেকে লাম গেলাম হাসনাবাদ। হাসনাবাদে একটা লঞ্চ ছিল। আমাদেরকে কমিতে চিনতে পাঠিয়েছিলেন এনায়েত হোসেন খান। তাঁর কোনো লঞ্চ-টঞ্চ ছিল না। মঞ্জু সাহেবের লঞ্চ ছিল। আওয়ামী লীগের এমএনএ ছিলেন তিনি। লঞ্চে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ লোক ওখানে গিয়ে হাজির হয়েছে। ওইখানে আমাদের রিক্রুট করবে।” [ লাল সন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি- মহিউদ্দিন আহমদ, পৃ. ৭৮-৮১]

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.