মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তখন যুক্তরাষ্ট্রের মিডল টেনেসি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত। সেখানে জন্মভূমির স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে নেমে পড়েন তিনি। ‘গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন’ শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো এবং সে সময়ে আমার দেশে ফেরার একটা পরিকল্পনা ছিল, তা বানচাল হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের কাজে আমি সমপর্ণ করলাম। অন্যান্য সব বাঙালির মতো আমার নজর ঢাকার দিকেই নিবদ্ধ ছিল। সেই ভয়ংকর দিনটিতে ঘরে ফিরে রেডিওতে খবর শুনলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালিদের দমন করতে নেমে পড়েছে।’ (অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মুক্তিযুদ্ধ)
ক্ষুদ্রঋণ
রবীন্দ্রনাথ তার নোবেল বিজয়ের কিছু টাকা দিয়ে এই বঙ্গে দরিদ্রদের মাঝে ক্ষুদ্রঋণ বিচরণ করেন এবং সেটি ছিল সুদমুক্ত। রবীন্দ্রনাথের সেই প্রোজেক্ট ব্যর্থ হয় এবং তার কোন টাকা ফেরত আসে নাই। এবং এর জন্য কাউকে তিনি ধরেও আনে নাই। এভাবেই নোবেল পাওয়ার কিছু অর্থ তার ডুবে যায়। তবে ড. ইউনূস রবীন্দ্রনাথের মতন ব্যর্থ হননি।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত দুর্ভিক্ষের সময় তিনি বুঝতে পারেন স্বল্প পরিমাণে ঋণ দরিদ্র মানুষের জীবন মান উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। সেই সময়ে তিনি গবেষণার লক্ষ্যে গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রকল্প চালু করেন। ১৯৭৪ সালে ড. ইউনূস তেভাগা খামার প্রতিষ্ঠা করেন যা সরকার প্যাকেজ প্রোগ্রামের আওতায় অধিগ্রহণ করে।
রাজনীতি
ড. ইউনূস নিজেই দাবী করেন তিনি রাজনীতি বুঝার মানুষ না। তবে এটাও সত্য তিনি রাজনীতি বুঝার মানুষ না হলেও রাজনীতি সম্পর্কে তিনি সবচেয়ে কৌতুহলী ছিলেন। ২৭ আগষ্ট, ১৯৯৩ সালে গণতান্ত্রিক ফোরামের জাতীয় মহাসম্মেলন এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় ড: ইউনূস একটি রাজনৈতিক দলের স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। তিনি তার স্বপ্নের দলের নাম দিয়েছিলেন “আমার দল”। এই দলের লক্ষ্য হিসেবে তিনি বলেছিলেন, এটি যে কোনো অবস্থান থেকে মানুষের মধ্যে দ্রুত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন নিশ্চিত করবে। এবং এই পরিবর্তন যেন চাপানো পরিবর্তন না হয় সেজন্য মানুষের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে দল অগ্রসর হবে। (লিংক: ডক্টর ইউনূসের “আমার দল)
নিউইয়র্ক অ্যাডমেনিস্ট্রেটিভ স্ট্রাডিজ ইন্সটিটিউশনে কর্মরত শহীদ মনজু স্মৃতিচারণ করে বলেন, “প্রফেসর ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস মাননীয় প্রধান উপদেস্টার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষন শুনলাম। আমাদের সেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ র দশকে চলে গিয়েছিলাম। ডক্টর ইউনূসের সাথে দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছি। কেমন এক মানব সম্মোহন তিনি তৈরী করতে পারতেন। তাঁর একটি চমৎকার রাজনৈতিক প্রবন্ধ আমরা ছেপেছিলাম আমাদের পত্রিকায়।”আমার দল”। (সে সময় ডক্টর কামাল হোসেন আওয়ামীলীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল করলেন – সেই রাজনৈতিক দলের শুভারম্ভে প্রবন্ধটি, বক্তৃতাটি ডক্টর ইউনূস পড়েছিলেন বা পড়ার কথা ছিলো!)। অসাধারণ সেই প্রবন্ধ বা বক্তৃতাটি।আমরা আপ্লূত উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলাম। একটি রাজনৈতিক দলের কারিকুলাম গড়ে উঠা এগিয়ে যাওয়া সফলতা কি হতে পারে তাই ছিল প্রবন্ধটির বিষয়।” (লিংক: ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের “আমার দল,”)
বলে রাখা ভাল, ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. ইউনূস।
২০০৬ সালের শুরুর দিকে, ইউনূস এবং নাগরিক সমাজের অন্যান্য সদস্যরা যেমন রেহমান সোবহান, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কামাল হোসেন, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনামএবং দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সৎ এবং পরিচ্ছন্ন প্রার্থীদের সমর্থনে একটি প্রচারে অংশ নেন। সেই বছরের শেষের দিকে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করার কথা বিবেচনা করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সালে নাগরিক শক্তি নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে ইচ্ছুকসে সময়ে জনশ্রুতি ছিল যে, সেনাবাহিনী তাকে রাজনীতিতে আসার জন্য সমর্থন করেছিল। তবে ৩ মে ইউনুস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ফখরুদ্দিন আহমদের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা পরিত্যাগের ঘোষণা দেন।
২০১৩ সালে বাজারে একটি গুজব আসে যে, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মসদ ইউনূস সরাসরি রাজনীতিতে আসছেন। দলের নাম দিয়েছেন ‘গ্রামীণ পার্টি বাংলাদেশ’(জিপিবি)। সূত্র জানায়, ড. ইউনূসের নতুন রাজনৈতিক দল ‘গ্রামীণ পার্টি বাংলাদেশ’(জিপিবি)’র সাথে যোগ দিয়ে জোট গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের গণফেরাম, বি চৌধুরীর বিকল্পধারা, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ঐক্য পরিষদ ও আ স ম আব্দুর রবের জাসদসহ সমমনা ১০টি দল। তখন ড. ইউনূস বালেন, গ্রামীণ পার্টি বাংলাদেশ নামের কোন দল গঠন করি নি, অপপ্রচারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমার সম্পর্কে কিছুদিন যাবত একটি শক্তিশালী মহল প্রকাশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে। (লিংক: গ্রামীণ পার্টি বাংলাদেশ নামের কোন দল গঠন করি নি)
০৪ অক্টোবর ২০২৩ গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামে নতুন স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করে। এই দলের ছাত্রদের সাথে ড. ইউনূসের যোগাযোগ ছিল। হয়তো নাগরিক শক্তি নামের সাথে মিল রেখেই ছাত্রশক্তির নামকরণ হয়।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় গ্লোবাল আইকন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস। যিনি পশ্চিমে একই সাথে আমেরিকার প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের সাথে ভাল যোগাযোগ রেখে চলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তাকে নিজের প্রতিপক্ষ মনে করতেন। শেখ হাসিনা জানতেন তার থেকে বড় কোন মানুষ যদি বিদেশীদের চোখে কেউ হয়ে থাকেন তিনি হলেন ড. ইউনূস। এই কারণে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা নিজেই কামান দাগানো শুরু করেন। হয়রানি থেকে শুরু করে বেইজ্জতি কোনটাই বাদ রাখেননি। ড. ইউনূস যখন মামলার হাজিরা দিতে যেতেন তখন লিফটম্যান ভবনের লিফট বন্ধ করে দিতেন। ৮৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধকে হেঁটে ৫ তলায় হাজিরা দিতে হত। এই ঘটনা প্রায় ৪০ বারের মতন ঘটেছে।
ড. ইউনূস নিয়ে আহমদ ছফা
১৯৯৫ সালে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ, জামায়াত, জাতীয় পাটি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। সেসময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রফেসর ইউনুসকে প্রধান করে একটা ফর্মূলা দেওয়ার চেষ্টা করছিল পশ্চিমা দূতাবাসগুলো। ব্রাত্য রাইসুর সাথে এক সাক্ষাৎকারে লেখক আহমদ ছফা এ বিষয় নিয়ে কথা বলেন বিস্তারিত।
আহমদ ছফা বললেন- সকলে মিলে এরা চরম দক্ষিণপন্থী কোর্টের মধ্যে পলিটিক্সটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমার আশঙ্কা মৌলবাদীরাই তাদের আকাঙ্ক্ষাটা পূর্ণ করবে। আর অন্যদিকের এলার্মিং সাইড যেটা, প্রফেসর ইউনূস ইত্যাদি লোকেরা। তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রেসিডেন্ট করার কথা হচ্ছে। প্রফেসর ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি, তিনি যেন ক্রমাগত ম্যাজিক দেখিয়ে যাচ্ছেন এবং দৈনিক একটা করে পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রফেসর ইউনূসের ভাগ্যে তথা বাংলাদেশের ভাগ্যে প্রতিদিন একটা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসছে, এবং এইবার বেইজিং নারী সম্মেলনে প্রমাণ করা হল যে ইউনূস সাহেব একটা ‘মহা নারী’। বাংলাদেশের দুইটি ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। এক, বিদেশি আস্থা অর্জন করা এবং তাদের কাছ থেকে অর্থ আনা, দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের গরিব জনগণকে একটা ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা। নিউইয়র্কের কোন একটা অর্গানাইজেশন তাঁকে “সেইন্ট অব দ্যা পুওর” বলেছে। কিন্তু এই সেইন্ট শতকরা বিশ পার্সেন্ট সুদ খায় এবং সেটা যখন কিস্তিতে কিস্তিতে নেয় তখন বত্রিশ পার্সেন্ট-এ ওঠে। অর্থাৎ বোঝা গেল যে এই সেইন্ট সেইন্ট বটে, কিন্তু সেইন্টনেসের মাঝখানে একটা কুসীদজীবী ইহুদিত্ব আছে। এরকম একজন লোক, বিদেশি অর্থে যাঁর এই অবস্থা তাঁকে দেশের কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান করার কথা ভাবা এটা খুবই অন্যায়। বিদেশিরা অনেক কিছুই চাইছে। অনেক কিছুই আমাদের করতে হচ্ছে। কিন্তু বিদেশিরা চাইছে বলে তাঁকে কেয়ারটেকার প্রধান করা-নীতিগতভাবে একজন লোকও যদি এর প্রতিবাদ করে আমি সেই ব্যক্তি। বিদেশি টাকার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল কোন ব্যক্তি এই দেশের কোন কল্যাণ করতে পারে না। তার বদলে হাসিনা খালেদার যতই দুঃশাসন হোক সেটাও আমি মেনে নিতে রাজি আছি।
রাইসু: এগুলো কি আপনি ঈর্ষা থেকে বলছেন?
ছফা: ঈর্ষা থেকে বললেও ক্ষতি নেই। সত্যি বলছি কিনা, ন্যায্য কথা বলছি কিনা সেটাই বড় কথা। ইউনূস সাহেবের জন্য আমি গর্ববোধও করি। আমাদের অনেক কিছুই নেই। অন্ততপক্ষে আমরা ফিল করতে চাই আমাদের পলিটিক্যাল স্ট্রাগলটা। একজন হাইকোর্টের বিচারক, এমনকী কূটকৌশলী ফয়েজকেও মেনে নিতে রাজি হব, ইউনূসকে না। গ্রামীণ গরিবদের শ্রমশক্তিকে দেশের ধনীরা কখনো ধনতন্ত্রের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেনি। অর্থাৎ এরা প্রাক-পুঁজি রিলেশানের মধ্যে থেকে গিয়েছিল। ইউনূস সাহেব এটাকে একটা পুঁজিবাদী শেপের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। ইউনূস সাহেবের কৃতিত্ব এটাই। এজন্যই আমেরিকা তথা পশ্চিমা দেশগুলো তাঁকে এভাবে অনর্গল পুরস্কার দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাবাজার পত্রিকা, নভেম্বর, ১৯৯৫
ড.ইউনূস সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর
গরিবদের ‘পরিত্রাতা’ মুহাম্মদ ইউনূসের উন্মোচিত স্বরূপ
-বদরুদ্দীন উমর
শতকরা ৩০ অথবা তার থেকে বেশি হারে গরিবদের সুদ দিয়ে এবং তার সুদ ও আসল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদায় করে তাদের দারিদ্র্য বাস্তবত দূর করা তো দূরের কথা, এটা সম্ভব এমন মনে করাও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিপরীত। কিন্তু এই প্রচার গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক ও মালিক এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষকরা তাদের প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে ব্যাপক ও শক্তিশালীভাবে চালিয়ে আসছে। এর দ্বারা দেশের ও দেশের বাইরে মানুষকে যেভাবে ভ্রান্ত ধারণা পরিবেশনের মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়েছে এবং সাফল্যজনকভাবে করা হয়েছে, এর দৃষ্টান্ত সাম্রাজ্যবাদী শয়তানির ইতিহাসেও বিরল।
গ্রামীণ ব্যাংকের সুদি কারবারের এমনই অবস্থা যে সাধারণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে ঋণ পরিশোধের জন্য যে মৎধপব ঢ়বৎরড়ফ বা সময় দেয়া হয় সেটাও তারা দেয় না। ঋণ গ্রহণের পরবর্তী সপ্তাহ থেকেই সুদ আদায় শুরু হয়। এই সাপ্তাহিক সুদ না দিলে ঋণের শর্ত ভঙ্গ করার জন্য ঋণগ্রহীতাকে শাস্তি দেয়া হয়। এভাবে ঋণ দেয়ার পর ঋণ পরিশোধের জন্য সময় না দিয়ে পরবর্তী সপ্তাহ থেকে ঋণ পরিশোধের অর্থ হল, গৃহীত ঋণ কোন উৎপাদনশীল বা লাভজনক খাতে বিনিয়োগের আগেই প্রদত্ত ঋণের টাকা থেকেই ঋণ পরিশোধ করা। তাছাড়া প্রথম থেকেই এভাবে সপ্তাহে সপ্তাহে ঋণ পরিশোধ করতে থাকার কারণে সুদের হারও বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৫০%-এর বেশি! এভাবে যারা সুদি কারবারের মাধ্যমে গরিবদের পকেট মারে তাদের দাবি হল, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তারা দেশের গরিব জনগণের দারিদ্র্য দূর করছে!! বিস্ময়ের ব্যাপার, এই অতি স্বচ্ছ মিথ্যা ও প্রতারণা সত্ত্বেও দেশে ও বিদেশে মুহাম্মদ ইউনূস ও তার গ্রামীণ ব্যাংকের জয়জয়কার হয়েছে। এই প্রতারণার পুরস্কারস্বরূপ সাম্রাজ্যবাদীরা ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কারেও ভূষিত করেছে। সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা এভাবে ইউনূসকে মাথায় তোলার মূল কারণ অনুন্নত ও গরিব দেশগুলোর জনগণকে প্রতারণার ক্ষেত্রে ইউনূসকে তারা এক অতি নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ মানবসমাজের সব থেকে প্রাচীন ও কঠিন সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান করতে এই আধুনিক বিশ্বেও দেশে দেশে সরকারগুলোর ব্যর্থতা বা অপারগতা জনগণের বিপুল অংশকে দারিদ্র্যের দুঃসহ অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য করছে। জনগণের ব্যাপক, সুসংগঠিত ও শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান ছাড়া যে এই দরিদ্র অবস্থার পরিবর্তন কিছুতেই সম্ভব নয়, এ বিষয়ে মতলববাজ ছাড়া আর কার সন্দেহ আছে? কিন্তু তা সত্ত্বেও মুহাম্মদ ইউনূস খুব সাফল্যের সঙ্গেই দেশের ও বিদেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদীদের, তাদের বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর ও সেই সঙ্গে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রচার মাধ্যমগুলোর সহায়তায় সাফল্যজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারিত করেছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, যে দেশটি গ্রামীণ ব্যাংককে সর্বোচ্চ ও হাজার হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করে এই প্রতারণামূলক অপকর্ম ইউনূসকে দিয়ে করিয়েছে, তারাই তাকে ভূষিত করেছে নোবেল শান্তি পুরস্কারে।
প্রতারণা হিসেবে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস যে বিশ্ব প্রতারকদের মধ্যে অগ্রগণ্য, এর প্রমাণ এখন নরওয়ে, সুইডেন থেকেই যেভাবে প্রচারিত হয়েছে সেটা স্তম্ভিত হওয়ার মতো। স্তম্ভিত হওয়া এ কারণে নয় যে, এক বড় ধরনের প্রতারক হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের পরিচয় এর মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হয়েছে। এর কারণ, মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রধান সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষক ও তাকে সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ প্রদানকারী নরওয়ে এবং সেই সঙ্গে সুইডেন, জার্মানি ইত্যাদি দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যেভাবে প্রতারণা করেছেন, তার বিবরণই নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি প্রামাণ্য চিত্রে গত ১ ডিসেম্বর প্রচারিত হয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের এই চুরি ও প্রতারণা এত বড় আকারের এবং এ বিষয়ে এত কিছু আলোচনার আছে যা আলোচনায় বিস্তারিত ও সন্তোষজনকভাবে করা সম্ভব নয়। তবে এর বিশেষ কয়েকটি দিক এখানে উল্লেখ ও আলোচনা করা দরকার। ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের ওপর নির্মিত ‘ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে’ নামের উপরোক্ত প্রামাণ্যচিত্রে গোপন নথিপত্রের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, প্রায় ৭০০ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানো হয়েছে। দরিদ্র ঋণ গ্রহীতাদের জন্য পাওয়া ১০ কোটি ডলার অনুদানের অর্থ ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে ইউনূস ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ নামে নিজের প্রতিষ্ঠিত ও মালিকানাধীন অন্য একটি কোম্পানিতে স্থানান্তর করেন। ক্ষুদ্র ঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং অন্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানিতে এভাবে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য ইউনূস নরওয়ের দাতাসংস্থা নোরাডকে অনুরোধ করেছিলেন, কারণ এটা জানাজানি হলে দেশে ও দেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হতে পারে। নরওয়ের দূতাবাস বা সরকারকে এ বিষয় কিছু না জানালেও তাদের দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, তারা এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের ১৯৯৬ সালের একটি রিপোর্টের ফুটনোট থেকে এ বিষয়ে হঠাৎ করেই জানতে পারেন। তারা এ সম্পর্কে বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে যে কোম্পানিতে এভাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে, তার কোন খবরই তাদের কাছে ছিল না। তাদের এ বিষয়ে কিছু না জানিয়েই এ কাজ করা হয়েছিল।
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ইউনূসের মালিকানাধীন নতুন কোম্পানি গ্রামীণ কল্যাণে ৭০০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয় ৭ মে, ১৯৯৬। কিন্তু বলা হয়েছিল, এ চুক্তি ১৯৯৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। যাহোক উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, যে দিন এ অর্থ স্থানান্তর হয়েছিল সেদিনই গ্রামীণ কল্যাণ এভাবে প্রাপ্ত অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করে! এভাবে ইউনূস প্রতারণার যে ভেল্কিবাজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, ইতিহাসে তার তুল্য কিছু খুঁজে পাওয়া মুশকিল। শুধু এ কারণেই ইউনূসের নাম বিশ্ব প্রতারক হিসেবে কীর্তিত হওয়া দরকার!!
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ কল্যাণে অর্থ হস্তান্তর করে সে টাকা আবার গ্রামীণ ব্যাংকে ঋণ হিসেবে ফেরত এনে গরিবদের জন্য আরও ‘সহজ’ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য সুবিধার ব্যবস্থার যে কথা ইউনূস এ অর্থ হস্তান্তরের যুক্তি হিসেবে উপস্থিত করেছেন সেটা নরওয়ের রাষ্ট্রদূত লেহনে এবং দূতাবাসের অফিসার ল্যান্ডমার্কের কাছে যে গ্রহণযোগ্য হয়নি, এটা তারা বলেছেন। ইউনূসের অন্যতম যুক্তি ছিল এভাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর ট্যাক্সের বোঝা কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন!! এর অর্থ কী? এ ট্যাক্স গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃক কাকে দেয়ার কথা ছিল? অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারকে। কাজেই যে কারসাজির মাধ্যমে ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক এবং ট্যাক্স রেয়াতের ব্যবস্থা করেছিলেন সেটা যে সরকারকে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া ছাড়া আর কিছু ছিল না- এ কথা কি কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে? তাছাড়া সরকারকে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার অর্থ হল ব্যবসা বা সুদি কারবার থেকে পাওয়া লাভের অংশ ট্যাক্স হিসেবে না দিয়ে জনগণের পকেট মারা। গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ কল্যাণ নামক কোম্পানিতে অর্থ স্থানান্তর করে ইউনূস এভাবে জনগণের পকেট মারার ব্যবস্থাই করেছিলেন। এটা তার নিজের স্বীকারোক্তির মধ্যেই পাওয়া যায়। অন্য কিছু না হোক, শুধু এ কারণেই অর্থাৎ সরকারকে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার অপরাধে মুহাম্মদ ইউনূসকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা দরকার।
কিন্তু দরকার হলেই যে সেটা করা হবে এমন কথা নেই। কারণ বাংলাদেশ সরকার সাধারণভাবে এনজিও এবং বিশেষভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম ও কার্যপরিচালনার ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে কোন নিয়ন্ত্রণ করে না। এখানে উল্লেখ করা দরকার, সরকারের যে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আছে তার কোন এখতিয়ার গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর নেই। যেমন এ এখতিয়ার আছে দেশের অন্যান্য ব্যাংকের ওপর। এর থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ সরকার সাম্রাজ্যবাদের কতখানি খেদমত কতভাবে করে থাকে। এ খেদমতের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংক তো বটেই, সেই সঙ্গে প্রশিকা, গণসাহায্য সংস্থা, সমতা ইত্যাদি এনজিও যথেচ্ছভাবে বিদেশ থেকে পাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ইচ্ছামতো তা ব্যবহার করে এবং দুর্নীতির মাধ্যমে এগুলোর পরিচালকরা ও সেই সঙ্গে অন্য কর্তাব্যক্তিরা কোটি কোটি টাকা গোপনে নিজেদের পটেকস্থ করেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের এ অর্থ স্থানান্তর নিয়ে কোন বিস্তারিত আলোচনা এ মুহূর্তে এখানে সম্ভব নয়, এটা আগে বলা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার প্রয়োজন আছে এবং সেটা লেখা হবে। তবে এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, ১৯৯৬ সালে যে ৭০০ কোটি টাকা স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে তার বর্তমান পরিমাণ ও মূল্য কত তার হিসাবও করা দরকার। ১৯৯৬ সালে ৭০০ কোটি টাকা ১৪ বছর পর ২০১০ সালে যে ৭০০ কোটি নয়, এটা বলাই বাহুল্য। শুধু তাই নয়, ১৯৯৬ সালের পর থেকে আরও যে হাজার হাজার কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংকে ইউরোপের দেশগুলো থেকে দেয়া হয়েছে তার হিসাবও এখন নতুনভাবে তদন্তের মাধ্যমে বের করা ও জনগণের সামনে উপস্থিত করা দরকার। কারণ বিদেশ থেকে দরিদ্র জনগণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে এসে নিজেরা বিশাল আকারে ধনী হওয়ার যে দুর্নীতি ও চক্রান্ত গ্রামীণ ব্যাংক থেকে করা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে এর গুরুত্ব আছে।
এ প্রসঙ্গে যে দাবি জনগণের দিক থেকে করা দরকার তা হল, গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের নারীদের চড়া সুদে ঋণ দিয়ে তাদের কিভাবে ও কতখানি দারিদ্র্যমুক্ত করেছে সে বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত পরিচালনা। এ কাজ সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে হওয়া দরকার। এ তদন্ত হলেই বোঝা যাবে, গরিবের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মুহাম্মদ ইউনূস গরিবদের দারিদ্র্যমুক্তির নামে কিভাবে ও কী আকারে বাংলাদেশের জনগণকে শোষণ, সুদ আদায়ের জন্য তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন করে তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণ নয়- উপরন্তু তাদের দারিদ্র্য আরও বৃদ্ধি করেছেন। কিভাবে তাদের নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়া করেছেন, কিভাবে এই ঋণ গ্রহীতাদের অনেকে ঋণের বেড়াজাল ও নির্যাতন থেকে মুক্তিলাভের জন্য আত্মহত্যা করতে পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন! নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে যে তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়েছে, তাতেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম জোবরা, যশোরের দিশারী পল্লী ইত্যাদি জায়গায় গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতারা কী নিদারুণ দুরবস্থার মধ্যে আছে, তার উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু জোবরা বা দিশারী পল্লীতেই নয়, বাংলাদেশের থানায় থানায়, গ্রামে যে গরিবদের গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ প্রদান করেছে তাদের সর্বনাশের চিত্র সেসব এলাকায় যে কোন প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। গ্রামাঞ্চলের অবস্থার সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে, তারা সবাই এর খবর রাখেন।
পরিশেষে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা দরকার। আমরা অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বাংলাদেশের সব সংবাদপত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের দুর্নীতির সংবাদ, নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত প্রামাণ্য চিত্রের রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও অভিন্ন মালিকানাধীন পত্রিকা প্রথম আলো ও ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারে এ বিষয়ে একটি লাইনও ছাপা হয়নি। চারদিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কারণে পরদিন ব্যাখ্যাসহকারে এ দুটি পত্রিকায় এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এ ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখে এর সত্যাসত্য যাচাই করার উদ্দেশ্যেই তারা প্রথম দিনেই সংবাদটি প্রচার করা থেকে বিরত ছিলেন! বোঝা যাচ্ছে, নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত প্রামাণ্য চিত্র যা পরিবেশন করেছে সেটা বাংলাদেশের অন্য সব পত্রিকায় ছাপা হলেও ‘দায়িত্বশীল’ পত্রিকা হিসেবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সেটা ছাপা থেকে বিরত ছিল! কোন স্বচ্ছ রহস্যের কারণে এই দুটি পত্রিকা এ কাজ করেছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের বোকা লোকদের ধারণা নেই এমন নয়। তবে যারা নিতান্তই বোকা তারা নিজেদের অনেক সময় সব থেকে বুদ্ধিমান ভেবে থাকে। এক্ষেত্রে এ দুটি পত্রিকা দেশের জনগণকে বোকা মনে করে যে ‘বোকামি’ করেছে, এর মূল কারণ যে গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে তাদের নিবিড় সখ্য সম্পর্ক এতে সন্দেহ নেই। এ ধরনের সখ্যের কারণে দেশের প্রচার মাধ্যমের দ্বারা যে কত রকম ক্ষতিসাধিত হচ্ছে তার শেষ নেই।
১৭ বছর বয়সীদের ভোট দেওয়ার অধিকার
কয়েক সপ্তাহ আগে ড. ইউনূস ভোটারের বয়স ১৭ বছর করা উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রধান উপদেষ্টার এমন মত নির্বাচন সংস্কারকে প্রভাবিত করতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন। পৃথিবীর খুব কম দেশেই ১৮ বছরের নিচে ভোট দেওয়ার সুযোগ আছে। ইউরোপের গুটি কয়েক দেশে ১৮ বছরের নিতে নাগরিকরা ভোট দিতে পারে। ড. ইউনূসের পর জামাতের আমিরও কম বয়সী নাগরিকদের ভোট দানের কথা বলছেন, এমনকি জামাত থেকে বেরিয়ে আসা জামাতের বি-টিম হিসেবে পরিচিত এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টির নেতারাও ১৮ বছরের নিচে কম বয়সীদের ভোটের অধিকারের কথা বলছে। গোলাম আজমের একটি বইয়ের নাম অনুসারে এই দলের নাম। অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যেহেতু মোটাদাগে তরুণ-তরুণীরা অংশ নিয়েছেন সেহেতু দেশের সরকার নির্বাচনে তাদের মতামতের সুযোগ দেওয়া হোক। কয়েক দিন পর হয়তো একই সুরে কথা বলবে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। কারণ জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী ছাত্র জীবনে ছাত্র ফেডারেশন করত। এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবি পার্টিতে যোগ দেন। এবি পার্টিতে যোগ দেওয়ার মূল কারণ সম্ভবত তার সাবেক বাপপন্থী পিতা আনিছুর রহমান কচি। যিনি নিজে এক সময় বাম নেতা ছিলেন বর্তমানে এবি দলের যুগ্ম আহবায়ক আনিছুর রহমান কচি।
অনেকের জানা থাকার কথা, গোলাম আজম রংপুরের কারমাইকেল কলেজে কয়দিন শিক্ষকতা করেন। তিনি কখনো অধ্যাপক হয় নাই। কিন্তু গ্রামের মানুষ কলেজের প্রভাসক ও অধ্যাপকের তফাৎ কী তা জানে না। ফলে তারা বেবাককেই ভুল করে অধ্যাপক ডাকে। তবে সারা জীবন ইসলামের নামে রাজনীতি করা গোলাম আযম কখনো বলে নাই তিনি যে অধ্যাপক না। অর্থাৎ অধ্যাপকের মিথ্যা টাইটেল তিনি উপভোগ করতেন আর সেই অধ্যাপকের উপাধী নিয়েই কবরে গেলেন।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল থেকে শুরু করে বিটিভি সব জায়গায় এবি পার্টির লোক শীর্ষস্থানে বসে আছে। যে দলের নাম বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ জানে না, ভোটের মার্কেটে যাদের এবি পার্টির ব্যানারে কোন ভোট নাই তারা ইউনূস সরকারের সময় বেশ কয়েকটি বড় বড় পদ বাগিয়ে নিয়েছে। আমেরিকার প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক দলটির সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ সেটি হল জামাতে ইসলাম। এই কারণেই হয়তো ড. ইউনূসের সময় বাংলাদেশে তাদের বাড়তি প্রভাব চোখে পড়ছে।
ভোটারের বয়স ১৭ হলে দিন শেষে এটি জামাতের লাভ। এবি পার্টিকে কেউ চেনে না, রাজনীতিতে নাগরিক কমিটির ভোট কেমন তা এখনো কেউ জানে না, ফলে কম বয়সীদের বেশির ভাগ ভোট পড়বে জামাতের ব্যালটে কিংবা ধর্মভিত্তিক দলগুলোর দিকে। কারণ জামাত স্কুল পর্যায় থাকে সাহিত্য ম্যাগাজিন, ধর্মীয় এক্টিভিটি, বিতর্ক সংগঠনের ব্যানারে ছাত্রদের শিবিরের প্রতি আকৃষ্ট করে। আমার নিজের পরিচিত আস্তিক, নাস্তিক থেকে শুরু করে অসংখ্য পরিচিত এমনকি বন্ধুও আছেন যারা স্কুল- কলেজ বয়সে শিবিরের সাথে জড়িয়েছেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে, ভার্সিটির পরিবেশে আসার পর তাদের অনেকে শিবির তো ত্যাগ করেছেন, অনেকে শিবির বিরোধীও হয়েছে। এর কারণ কম বয়সে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধির চাইতে আবেগ কাজ করে বেশি। বয়স বাড়ার সাথে বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনার সাথেও মানুষের পরিচয় ঘটে।
অনেকের হয়তো স্মরণ থাকার কথা, ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী ও বর্তমানে উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ৫ অগাস্টের পর তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের মুজিববাদী ও জামাতের রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন। এতে শিবিরের লোকজন অসন্তুষ্ট হয়। কারণ জুলাইয়ের আন্দোলনে তারাও সাথে ছিল। এছাড়া এছাড়া শিবির সন্দেহে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি থেকে একজনকে বহিষ্কার করার ঘটনা আছে। ১৬ই ডিসেম্বরে জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা আবদুল কাদের প্রশ্ন করেছেন- “স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বাধীনতা উদযাপনকে কীভাবে দেখেন? চব্বিশ দিয়ে একাত্তরকে ঢাকা জায়েজ হলে, চব্বিশের বিরোধীতাকারীদেরও সেইম সুযোগ দিবেন?” এই দুইজনের কথা এখানে বিশেষভাবে উপস্থাপন করার কারণ শিবির থেকে (এলাকার) দাবী করা হয় এই দুই তরুণ নেতা অতীতে শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। এখন তারা কেন শিবির বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন সেটি তারা মানতে পারছে না। তারা শিবির করেছে কিনা তার কোন প্রমাণ নাই। যদি সত্যও ধরে নিই, তাহলে কম বয়সে শিবিরের ফাঁদে পড়া যে একটি কমন বিষয় তার উদাহরণ মাহফুজ আলম ও আবদুল কাদের। এরা যে কেউ এখন আর মওদুদীবাদী নয় তা তো স্পষ্ট। যেমন, মাহফুজ আলমের চিন্তায় ফরহাদ মজহার ও মাও সেতুং এর রাজনৈতিক চিন্তার বিশাল প্রভাব আছে। তাই জাতীয় নাগরিক কমিটির উচিত হবে ভোটারের বয়স কমানো নিয়ে জামাত ও এবি পার্টির খপ্পরে পড়ার আগে সবার আগে নিজেদের স্বার্থকে বিবেচনায় আনা।




