১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব পরিবারসহ খুন হওয়ার পর তার বাসা থেকে ৫০৩ ভরি স্বর্ণ, ৪ হাজার ভরি রুপা এবং প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গিয়েছিলো। তার ঠিক এক বছর আগে, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, বেসরকারি পরিসংখ্যানে যেখানে মারা গিয়েছিল প্রায় ১-৪ লাখ মানুষ। সরকারী মতে মাত্র ২৯ হাজার। তবে এই সম্পদ পাওয়া নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। আওয়ামী লীগ থেকে দাবী করা হয় শেখ মুজিবের চরিত্র কালিমা লেপন করার জন্য পত্রিকায় এসব সম্পদের খবর ছাপা হয়। তবে শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে তার পরিবারের ৩০০ ভরি স্বর্ণ গ্রহণ করেন।
নিহত শেখ মুজিবকে গান্ধীবাদী ও গান্ধীর মতন উপস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে। আর এই তাড়না থেকেই শেখ মুজিবের বাড়িতে কিছু পাওয়া যায় নাই, শেখ মুজিবের পরিবারের কোন সম্পত্তি ছিল না এই প্রচারণা শুরু হয়। সম্ভবত এই প্রচারণার চাপ বাড়তে থাকে রাজনীতিতে বিএনপি শক্তিশালী হওয়ার পর। কারণ নিহত জিয়াউর রহমান সত্যিকার অর্থেই তার পরিবারের জন্য কোন সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। এই কারণে বেগম জিয়া যেন তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক দুই সন্তানকে নিয়ে বিপদে না পড়েন তার জন্য ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটি ছিল তার স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সরকারের তরফ থেকে তাঁকে দেওয়া একটি সুবিধা। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা বেগম জিয়াকে ঐ বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেন।
শেখ মুজিব স্বাভাবিক জীবন যাপনই করতেন। তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তার দুই সন্তানের বিয়েতে যেসব উপহার পেয়েছেন সেগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দান না করে নিজের পরিবারেই রেখেছেন। একজন প্রেসিডেন্টের সন্তানের বিয়েতে সোনা, হীরা মুক্তা পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া শেখ মুজিব ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নেতা, এমনকি পাকিস্তান আমলে তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। সুতরাং তিনি বিভিন্ন বামপন্থী নেতাদের মতন দরিদ্র ছিলেন না। আর শেখ কামাল যে অস্ত্র নিয়ে ঢাকার রাস্তায় মহরা দিতেন সেটি তো প্রমাণিত। একবার তো বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কামালের গাড়িকে ডাকাতের গাড়ি ভেবে পুলিশ গুলি চালিয়ে কামালকে আহত করে। আর এই ঘটনায় শেখ মুজিব কামালের উপর এত বেশি অসন্তুষ্ট ছিলেন যে- তিনি হাসপাতালে নিজের ছেলেকে দেখতে যান ৩ দিন পর। আগ্রহীদের জন্য- শেখ কামালকে নিয়ে সত্য মিথ্যা।
সুতরাং নিহত শেখ মুজিবের বাসা থেকে যা পাওয়া গেছে তার পরিমাণ খুব কম নয়। এই সম্পদ শেখ মুজিবের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই কারণে আওয়ামী লীগের লোকজন দাবী করেন শেখ মুজিবের চরিত্রে কালিমা লেপন করতে অতিরিক্ত সম্পদের হিসাব এখানে যোগ করা হয়। এই কারণে আওয়ামী লীগ এই সম্পদকে অস্বীকার করে।
দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০ অক্টোবর ১৯৭৫
সাবেক প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বাসভবনে পাওয়া গিয়াছেঃ
- হীরা, মুক্তা, প্লাটিনাম ও স্বর্ণালঙ্কার-৭ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার
- বাংলাদেশী মুদ্রায় নগদ ৯৪ হাজার ৪ শত ৬১ টাকা
- ৩টি ব্যক্তিগত মোটরগাড়ী
- বৈদেশিক মুদ্রা ১৭ হাজার ৫ শত টাকার
- বিদেশী রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রায় এক লক্ষ টাকার উপহার
- বাতিলকৃত শতকী মোট ৬ শত ২১টি
- ১টি ভারী মেশিনগান, ২টি হাল্কা মেশিনগান, ৩টি এসএমজি, ৮টি স্টেনগান, ১০টি আধা স্বয়ং ক্রিয় রাইফেল, ৬০টি গ্রেনেডসহ গোলাবারুদ ইত্যাদি।
বার্তা সংস্থা বাসস জানান, সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডিস্ব ৩২ নম্বর সড়কের ব্যক্তিগত বাসভবনে যে সমস্ত জিনিস পাওয়া গিয়াছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র গতকাল (বুধবার) উহার একটি তালিকা প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি জানান যে, সাবেক প্রেসিডেন্টের বাড়ীতে যে সমস্ত জিনিস পাওয়া গিয়াছে তাহার মধ্যে ৭ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা মুল্যের প্লাটিনাম, হীরক, মুক্তা সেট ও স্বর্ণালংকার; ১৭ হাজার ৫ শত টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা এবং আঘেয়াস্ত্র উল্লেখযোগ্য।
বিদেশী রাষ্ট্রগুলি হইতে প্রদত্ত প্রায় ১ লক্ষ টাকা মূল্যের উপহার সামগ্রী, বাংলাদেশী মুদ্রায় নগদ ১৪ হাজার ৪ শত ৬১ টাকা এবং ৬ শত ২১টি বাতিলকৃত শতকী নোট অর্থাৎ ৬২ হাজার ১শত টাকাও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির তালিকার অন্তর্গত। তিনি উল্লেখ করেন যে,
একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন আমী অফিসার ও একজন পুলিস অফিসারকে লইয়া গঠিত তিন সদস্যের একটি টীম গত ১৬ই আগষ্ট হইতে ২৮শে আগষ্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বাসভবনে এই দ্রব্য তালিকা তৈরী করেন।
তালিকায় দেখা যায় যে, ওয়াকি-টকিসহ বিদেশে তৈরী মূল্যবান দ্রব্যাদি ছাড়াও তাঁহার (শেষ পৃঃ ৪-এর কঃ দ্রঃ)
ব্যক্তিগত বাসভবনে
(১ম পূঃ পর)-
বাড়ীতে তিনটি ব্যক্তিগত মোটর গাড়ী পাওয়া গিয়াছে। এতদ্ব্য- তীত ধানমণ্ডির বাড়ীতে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মধ্যে রহিয়াছে ৮ হাজার ১ শত ১৯ টাকা মূল্যের ভারতীয় মুদ্রা এবং ৯ হাজার টাকা মূল্যের স্টালিং পাউন্ড।
সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ীতে যে সব আয়োস্ত্র পাওয়া গিয়াছে তাহার মধ্যে একটি ভারী মেশিন- গান, দুইটি হাল্কা মেশিনগান, তিনটি এস এম জি, ৮টি স্টেনগান, ১০টি আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এবং ৬০টি গ্রেনেডসহ গোলা- বারুদ অন্যতম।
মুখপাত্রট বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট, তাঁহার স্ত্রী, ছেলে- মেয়ে ও পুত্রবধূদের বাংলাদেশের ব্যাংকসমূহে ২২টি একাউন্ট ছিল। এই সমস্ত একাউন্টের তিনটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রীর নামে। একট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামেও বেগম মুজিবের ব্যাংক একাউন্ট ছিল। বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা তাহাদের মোট ২ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকার একাউন্ট আটক করা হইয়াছে।
তালিকায় একটি দলিলের যে উল্লেখ রহিয়াছে তাহাতে দেখা যায় যে. সাবেক প্রেসিডেন্টের স্ত্রী মিসেস ফজিলাতুন্নেসা খুলনার দৌলতপুরে অবস্থিত গুদাম বার্ষিক ৪৯ – হাজার টাকায় পাট মূল্য স্থিতিশীলকরণ সংস্থার নিকট ভাড়া দিয়াছিলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রট জানান যে, এই দ্রব্য তালিকায় তালিকার সাবেক প্রেসিডেন্টের যাবতীয় সম্পদের হিসাব দেওয়া হয় নাই, কেবল তাঁহার ৩২ নম্বর রোডের বাড়ীতে যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহাই উল্লেখ করা হইয়াছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ও বিদেশে যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ব্যাপারে তদন্ত চলিতেছে বলিয়া মুখপাত্র উল্লেখ করেন।




