দুই দিন আগে চট্টগ্রাম ভার্সিটির একটি হলের নাম ফকা চৌধুরীর নামে করা হয়েছে। ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯১৯ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার গহীরায় জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশুনো করেছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ কলেজে। ১৯৪৩ সালে তিনি মুসলিম লীগের চট্টগ্রাম জেলা শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। পাকিস্তান গঠনের পক্ষে তিনি পূর্ববঙ্গের একজন অগ্রগামী ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬২ ও ‘৬৩ সালে তিনি আইয়ুব খানের কৃষি ও পূর্তমন্ত্রী, শিক্ষা ও তথ্যমন্ত্রী এবং শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার ছিলেন এবং একই বছর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন। চট্টগ্রামে ভার্সিটি তৈরি করতে ফকা চৌধুরীর অবদানের কথা শোনা যায়। কিন্তু ৭১ সালে ফকা চৌধুরীর যে কার্যকলাপ ছিল তাতে তার নামে ভার্সিটির হল হওয়া চট্টগ্রামবাসীর জন্য সুখকর হওয়ার কথা না। স্বাধীনতার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ফকা চৌধুরী কীভাবে ধরা পড়েন তা তৎকালীন পত্রিকায় লেখা হয়।
দৈনিক বাংলা
চট্টগাম, ৭ই জানুয়ারী।
“লন্যটি চাটগার পার্কি’র পশ্চিমে মাঝ সমুদ্রে দিয়ে যাচিছল। চৌধুরী গর্জে উঠে সারেংকে বললেন-অউডা। লঞ্চ কুলোর কাছা চালছোনা। এন্ডে ত মাইন ‘পাতা আছে পানলার। লঞ্চ মাইনত লাগিলে বেয়াকগুণ ডুবি মইজজাম। অর্থার-৬ বেটা। লঞ্চ সমদ্যপারের কাছ দিয়ে চাল।। এখানে বোধহয় মাইন পাতা আছে। মাইনে লঞ্চ লাগলে সকলেই ডুবে মরবো। এই চৌধুরী হচেছ ফজলুল কাদেব চৌধুরী-মানে ফকা চৌধুরী। চাটগায়ে পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর গত মাসেন ১৮ তারিখ তিনি সপরিবারে আকিয়াবে পালিয়ে যাচিছলেন।
কিন্তু বিধি বাম। চাটগণ থেকে চৌধুরীকে নিয়ে আকিয়ারের উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ার পর থেকেই সারেং বিভিন্ন ফন্দী আঁটছিল কিভাবে চৌধুরীকে মুক্তিফৌজের ২০তে ধরিয়ে, দেবে। চৌধুরীর ম’য়কানী খেয়ে সে নয়া ফন্দি এ’টে লঞ্চটি জব্যে চরে তুলে দিয়ে বলল-হুজুর। লঞ্চ তো আটকে গেছে। পারে নেমে লোকজন না নিয়ে এলে লঞ্চকে আর ডুবা চর থেকে নামানো যাবে না।
সারেংকে পারে নেমে বিচছুদের সাথে দেখা করতে বেগ পেতে হল না। কারণ সমগ, আনোয়ারা ছিল (পার্কি আনোয়ারা থানার একটি গাম) বিচছুতে ভর্তি’। খবর পেয়ে দল বেধে লঞ্চে উঠে বলল-হুজুর। আসুন, আসুন। আপনার জন্য কতদিন ধরে আমরা প্রতীক্ষা করে আছি।
তারপর চৌধুরীকে সপরিবারে তারা লঞ্চ থেকে নামিয়ে স্কুলে তুলল। সঙ্গে লঞ্চ থেকে নামালো পাক-বাহিনীর একজন মেজরকেও। শোনা যায় লঞ্চে চৌধুরীর সঙ্গে ছিল দেড় মন সোনা আর ৭ লাখ টাকা।
জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী ২৫শে মার্চের পর থেকে চাটগাঁয়ে অত্যাচারের যে স্টীমরোলার চালিয়ে ছিলেন আইকম্যাম বে’চে থাকালে এই অত্যাচার দেখে তাকে নিশ্চয়ই স্যালুট দিতেন। ২৬শে মার্চের পর থেকে আতত্মসমর্পণের কয়েক দিন আগে পর্যন্ত তার বাসায় সব সময়ে মোতায়েন থাকত পাক-বাহিনীর এক প্ল্যাটুন সৈন্য ফজলুল কাদের চৌধুরীর অনুচরেরা চাটগার বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনত নিরপরাধ লোকজন ক্যার ছাত্রদের। তারপর এদের হাত-পা বেধে গিরায় গিরায় লোহার জাড়া দিয়ে পিটানো হত। তার বাসায় নির্মম অত্যাচারের এতসব কায়দা ও ব্যবস্থা ছিল যে নীরোর যুগে করলে তিনি নিশ্চয়ই প্রভোস্ট মার্শালের পদ পেতেন। তার বাসাতে এনে নির্মম ভাবে পিটানো হয়েছে মরহুম ডক্টর সানাউল্লার এক ছেলেসহ চাটগাঁর কয়েকশ ছাত্রকে। জুলাই মাসের ১৭ তারিখের রাতে চৌধুরী পাক-বাহি- নীর সৈন্য নিয়ে ছাত্রনেতা ফারুকের বাসা ঘেরাও করে পাক-সৈন্যেরা ফারুককে হত্যা করায়। ২৫শে মার্চের পর থেকে চৌধুরীর অনুচরেরা বলে বেড়াত, যে ইয়াহিয়া খান চৌধরীকে পাকিস্তান রক্ষার জন্য লেঃ জেনা- রেলের পদে ভূষিত করেছে। বর্ডারে কি হচেছ না হচেছ সে সম্পর্কে পাক- বাহিনী সব সময়ে চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
গত মাসের মাঝামাঝি পর্যস্ত চৌধুরী তার অনুচরদের আশ্বস্ত করেছে এই বলে যে আমেরিকার ৭ম নৌবহর দু-এক দিনেই চাটগায় এসে ভিড়বে। ঘাবড়াবার কোন কারণ নেই। জনাব ফজলুল কাদের চৌধুবীর গুড সাহেবের হিলস্থ বাসায় আজ স্থাপিত হয়েছে মুক্তিফৌজের শিবির। পোল্যান্ডের লোকেরা নাৎসী বন্দী শিবির ডাচভিয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে আজও যে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। চৌধুরীর বাসার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে চাটগাঁর লোকেরা অন্যরূপ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। কারণ ২৫শে মার্চের পর থেকে স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত ওটি ছিল নির্মম অত্যাচারের কেন্দ্র।”

