আব্বাসীনামা

ভণ্ড পীর আব্বাসীর বিভিন্ন ভিডিও গত ৫-৬ বছর ধরে ফলো করি। আব্বাসী আহলে সুন্নতের হুজুর। মূলত আব্বাসী ওহাবী ও সালাফি বিরোধী বক্তব্য দিতেন। অনেকে আবার আব্বাসীকে সবাইকে কাফের ফতোয়া দেওয়া মাস্টার হিসেবে চেনেন। যেমন নবী মুহাম্মদ ও মা খাদিজাকে নিয়ে মন্তব্য করায় মিজানুর রহমান আজহারীকে কাফের, হাত তুলে মোনাজাত বেদাত বলায় আহমাদুল্লাহ হুজুরের সাথে তার বৌ তালাক হয়ে যাওয়ার ফতোয়া এই আব্বাসী দিয়েছেন।

[আবাসীর পরিচয় কী?]

হেলিকপ্টার ছাড়া নড়ে না, এই আব্বাসী নিজেকে খলিফা হযরত আবু বকর এর বংশধর দাবি করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে একজন পারিবারিক ট্রি হিসাব করে দেখাল, জৈনপুরী পীর এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর এই দাবী ভুয়া। নিজের মায়ের গোষ্ঠীকে লতাপাতা দিয়ে কানেক্ট করে খলিফা আবু বকরের বংশধরদের সাথে যুক্ত করেন। যাই হোক, ইসলামে রাজবংশও নাই, পরিবারতন্ত্রের ক্ষমতাও নাই। তবে আব্বাসী বংশের ভুয়া পরিচয় দিয়ে সমাজে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।

[সরকারী জমি দখল]

এই আব্বাসীর বিরুদ্ধে সরকারী রেলের জমি দখলের মামলা আছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় এস্টেট অফিসের কানুনগো মো. ইকবাল মাহমুদ বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় এস্টেট অফিসের কানুনগো মো. ইকবাল মাহমুদের দায়েরকৃত মামলা সূত্রে জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকার মৃত নাছির উল্লাহ আব্বাসীর ছেলে অভিযুক্ত এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী (জৈনপুরী পীর), ওবায়েদ উল্লাহ আব্বাসী ও নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসী অবৈধ ও বেআইনিভাবে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন হাজিগঞ্জ লেভেল ক্রসিং সংলগ্ন রেললাইনের পূর্ব পার্শ্বে রেলওয়ের জমিতে অবৈধভাবে মাটি ভরাট করে সেমিপাকা কাঠামো নির্মাণ করছেন। তাদের এই অবৈধভাবে কাঠামো নির্মাণ কাজে স্থানীয়ভাবে বাধা প্রদান করা হলেও তারা বাধা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এক বছর পূর্বে তারা রেলওয়ের ভূমিতে অবৈধভাবে টিনশেড মার্কেট নির্মাণ করেছেন। সরকারি রেলওয়ে সম্পত্তি দখল ও আত্মসাতের অপরাধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা দায়ের করার অনুরোধ করা হয়। (তথ্যসূত্র- দৈনিক ইত্তেফাক)

[আব্বাসীর ভাই অস্ত্রসহ গ্রেফতার]

এছাড়া নারায়ণগঞ্জে জৈনপুরী পীর আব্বাসীর ভাই নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসীকে ২০১৯ সালের ১ অগাস্ট অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি দো নলা বন্দুক ও কয়েকটি গুলির খোসা জব্দ করা হয়। এপ্রিল এনায়েত উল্লাহ আবাসীর নেতৃত্বে জঙ্গি কায়দায় পাঠানটুলী এলাকায় এইচএন এ্যাপারেলস নামে একটি গার্মেন্টস কারখানার দেয়াল ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে হামলা। এ সময় তারা ভাঙচুর ও লুটপাট করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ ওই রাতেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় নেয়ামত উল্লাহ আবাসীকে প্রধান আসামী করে ১১ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও দেড়শ’ জনকে আসামী করা হয়। এই মামলায় পুলিশ পরদিন চার আসামীকে গ্রেপ্তার করলেও নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসীসহ অন্যান্য আসামীরা আত্মগোপনে থাকেন। এরইমধ্যে রিভলবার হাতে ও সঙ্গে এসএমজি নিয়ে জঙ্গি আদলে তোলা এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভাইরাল হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপরই এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসেন। (তথ্যসূত্র- দৈনিক মানবজমিন)

[হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো]

বাংলাদেশে সুফীপন্থী ও মাজার-পন্থীদের দুর্ভাগ্য যে আব্বাসী মতন ঘৃণা-জীবী সুফি-পন্থীদের সাথে আছে। অথচ ইসলামে সুফীপন্থীরা সবসময় উদার ও নরমপন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। আব্বাসী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে। বছর-খানেক আগে একটি ওয়াজে আব্বাসী বলছে- ”হিন্দুদের জমি দখল করা ঠিক না অন্যায়, তবে এর জন্য আল্লাহ আপনাকে জাহান্নামে দেবে না।” অর্থাৎ এটি কোন বড় অপরাধ নয় যার জন্য দখলবাজ মুসলমানকে জাহান্নামে যেতে হবে। এছাড়া ২০২১ সালে রক্তাক্ত শারদের সময়ও উস্কানি দিয়েছে। এক প্রশ্নোত্তর পর্বে এই ভণ্ড-পীর বলছে- “হিন্দুরা তরকারিতে গরুর মুত মেশায়। তাই হিন্দুদের ঘরে না খাওয়াই ভাল।”

আব্বাসী হেফাজতের ১৩ দফা দাবীর আদায়ে গত সপ্তাহে সালাফি, বাল্কারপন্থী উগ্র দলটিকে নিয়ে সমাবেশ করেছে। সেই সমাবেশে প্রকাশ্যে কল্লা ফেলা দেওয়ারও হুংকার দেওয়া হয়। আব্বাসীর অপকর্ম এখানেই শেষ নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হ্যারাসের ঘটনায় আটক হওয়া সেক্সি ভিডিও চ্যাট করা অর্ণবকে তৌহীদি জনতা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করার পর আব্বাসীর সাথে দেখা করতে নিয়ে যাওয়া হয়। সুতরাং এটি স্পষ্ট, একটা ইভটিজার ও নারী-শিশু হয়রানিকে ইসলামের লেবাসে সমাজে নর্মালাইজ করার চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের নাগরিক কমিটি বর্তমানে যার রাজনৈতিক নাম নাগরিক দল তার অন্যতম নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর সাথে আব্বাসীর একটি ছবি আছে। এছাড়া মাদানী হুজুর খ্যাত নারী বিদ্বেষী রফিকুল ইসলাম মাদানীর সাথে হাসনাত ওয়াজে অংশ নিয়েছে। মাদানী বলতে বুঝায় যিনি মদিনা ভার্সিটি থেকে পাশ করেছেন। যেমন আজহারী বলতে বুঝায়, মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যিনি পাশ করেছেন। অথচ রফিক ঢাকার জামিয়া মাদানীয়া থেকে পড়ে নামের শেষে মাদানী লাগিয়েছেন। এরা কতটা অসৎ তার একটা নমুনা এটি।

হাসনাত এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চমুচা-সিঙ্গারা ভিসির ভ্যান-গার্ড ছিলেন। ভিসির সাথে ছবি দিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন। এখন তারা বলছেন তৎকালীন সময়ে শেখ মুজিব প্রেম, ভিসি প্রেম ছিল টিকে থাকার কৌশল। তাহলে প্রশ্ন আসে এখন কৌশল কোনটি; নাগরিক দলের সাথে থাকা নাকি ভণ্ড-পীর আব্বাসীর সাথে দেখা করা? নাকি দলের মধ্যে উমামা ফাতেমা ও ডাক্তার তাসনিম জারাকে দলে পদ দেওয়া কৌশলের অংশ। এই প্রশ্ন এই কারণে তুলছি, কারণ ঢাবি’র ছাত্রী হয়রানী ইস্যুতে অপরাধীর পক্ষে শাহবাগ থানা ঘেরাও করা তৌহিদী মবের সাথে নাগরিক কমিটির আরেক নেতা এক সময়কার ছাত্রলীগ ও শেখ মুজিব প্রেমিক সারজিস আলমের যোগাযোগ। আব্বাসী কী চায়, তৌহীদি মব কী চায় তা আমরা জানি। কিন্তু আব্বাসী সাথে দেখা করে নাগরিক দলের নেতা হাসনাত কী চেয়েছিল সেটাও আমাদের জানা দরকার। তবে এই জানাটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নাগরিক দলের নারী সদস্যদের যারা হাসনাতদের সাথে মাঠে রাজনীতি করছেন।

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.