রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নীহার বানু হত্যাকাণ্ড

১৯৭৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নীহার বানু হত্যাকাণ্ড ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম আলোচিত অরাজনৈতিক হত্যার ঘটনা। নীহার বানু (জ. ৯ জানুয়ারি ১৯৫৩, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী; মুক্তিযুদ্ধে শহীদ নজীবুর রহমানের কন্যা। পরিবার তখন রাজশাহীতে থাকত। তার বিয়ের কথাবার্তাও ঠিক হয়েছিল নওগাঁর এক প্রকৌশলীর সঙ্গে।

হত্যকাণ্ডটি মূলত প্রেম ঘটিত। নীহার ভাবতেন ভাই, বাবু ভাবতেন প্রেমিকা। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় একদিন বাবুর হাতে নীহার খুন হোন। (প্রথম আলো)

ঘটনাটির সারকথা (এক নজরে) (অলসতার কারণে ChatGPT কে লিখতে বললাম। আগ্রহীদের জন্য নিচে পত্রিকার কপি আপলোড করা হল।

প্রধান আসামি: সহপাঠী আহমেদ হোসেন বাবু (আরও জড়িত: মো. আহসানুল হক, মো. শহীদুল ইসলাম নীলু, মো. এনামুল হক—এনামুল পরে রাজসাক্ষী হন; মিনা মঞ্জিলের কেয়ারটেকার রুহুল আমীন ‘ফেতু’; আরও দুই অভিযুক্ত আজিজুর রহমান ‘আজু’ ও ওয়াহেদুল ইসলাম—এরা খালাস পান)।

মোটিভ: নীহারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া; অন্যত্র নীহারের বিয়ে ঠিক হওয়ায় বাবুর “পেলেই হবে–না পেলে মরবে/মারবে” ধরনের আবেশ ও আক্রোশ।

হত্যার তারিখ ও স্থান: ২৭ জানুয়ারি ১৯৭৬, রাজশাহীর “মিনা মঞ্জিল” নামের বাড়ি।

লাশ উদ্ধার: ১২ জুন ১৯৭৬, মিনা মঞ্জিলের উঠোনের সিমেন্টঢালা জায়গা খুঁড়ে কঙ্কাল; খয়েরি শাড়ি, নকশা করা স্যান্ডেল ও রূপার তাবিজ দেখে শনাক্ত।

কীভাবে পরিকল্পনা ও হত্যা হলো

রায়: ২৯ আগস্ট ১৯৭৭—আহমেদ হোসেন বাবু, আহসানুল ও শহীদুল—মৃত্যুদণ্ড; ‘ফেতু’ রুহুল আমীন—লাশ গুমে সহযোগিতায় ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; আজিজুর ও ওয়াহিদুল—খালাস। বাবু ও আহসানুল পলাতক ছিলেন; বাবু পরে আর দেশে ফেরেননি (বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি জার্মানিতে)।

২৩ ও ২৬ জানুয়ারি ১৯৭৬—লতিফ হলের বাবুর কক্ষে বৈঠক: প্রথমে নীহারকে দাওয়াতে নেওয়ার কথা বলে “মিনা মঞ্জিল”-এ আনা, সেখানে বিয়ের প্রস্তাব; রাজি না হলে জোর করে বিয়ে পড়ানো—এমন সিদ্ধান্ত হয়। ২৬ জানুয়ারির বৈঠকে সিদ্ধান্ত আরও কড়া হয়: কোনোভাবে রাজি না হলে “মেরে ফেলা হবে”।

২৭ জানুয়ারি দুপুর—নীহার ও বাবু আলাদা রিকশায় “মিনা মঞ্জিল”-এ পৌঁছান; গেট, দরজা-জানালা বন্ধ করা হয়; বাবুর বিয়ের প্রস্তাবে নীহার দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলেন—বলতে থাকেন “আপনার সঙ্গে আমার ভাই–বোনের সম্পর্ক, আবার বললে চিৎকার করব।” তখন নীহারের নিজের শাড়ির আঁচল গলায় প্যাঁচিয়ে বাবু শ্বাসরোধ করতে শুরু করেন; নীহার প্রতিরোধে বাবুর হাতে কামড় দেন—তখন অন্যরা (এনামুল, আহসান, শহীদুল) নীহারের হাত চেপে ধরে। শ্বাসরোধ হয়ে তিনি ঢলে পড়েন।

লাশ গুমের চেষ্টা ও উদ্ধার

প্রথমে লাশ ট্রাংকে ভরে সরানোর পরিকল্পনা—সাহেববাজার থেকে ৩০ ইঞ্চি কালো ট্রাংকও কেনা হয় (প্রায় ১০০ টাকা) কিন্তু শক্ত হয়ে যাওয়া দেহ ঢোকানো যায়নি; পরে উঠোনে শৌচাগারের সামনের খালি জায়গায় গর্ত করে পোশাক-তাবিজ-স্যান্ডেলসহ মাটি চাপা দেওয়ার পর উপরে সিমেন্ট ঢালা হয়।

পরে গ্রেপ্তার হওয়া শহীদুল ও এনামুল ১২ জুন ১৯৭৬-এ জায়গা দেখিয়ে দিলে সিআইডি মাটি খুঁড়ে কঙ্কাল উদ্ধার করে; হত্যার ঘরের দেয়ালে রক্তের দাগও মেলে। কঙ্কাল শনাক্তে নীহারের খয়েরি চেক শাড়ি, বাটা হাই-হিল স্যান্ডেল, গলার চারকোনা রূপার তাবিজ বিশেষ ভূমিকা রাখে।

তদন্তে কামড়ের দাগ/ইনজুরি ক্লু হিসেবে উল্লেখ আছে—মিডিয়া রিপোর্টে এই “বাইট-মার্ক” খুনিকে ধরার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে আলোচিত হয়।

বিচার ও পরিণতি

১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বিশেষ সামরিক আইন আদালতে বিচার শুরু হয়; আইন: স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট, ১৯৭৪ ও দণ্ডবিধি ৩০২/৩৬৪/২০১/৩৪। এনামুলকে ক্ষমা দিয়ে রাজসাক্ষী করা হয়—তার জবানবন্দিতেই হত্যার পূর্ণ কাহিনি উঠে আসে।

২৯ আগস্ট ১৯৭৭—রায়ে ঘটনাকে “পূর্বপরিকল্পিত, ঠান্ডা মাথার, ভয়াবহ” বলে আখ্যা দিয়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ‘ফেতু’কে ৫ বছরের সশ্রম দণ্ড দেওয়া হয়। প্রধান আসামি বাবু এবং আহসানুল তখনও পলাতক; পরবর্তীকালে বাবু বিদেশে (বিভিন্ন সূত্রে জার্মানি) থাকেন বলে রিপোর্টে উঠে আসে।

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.