যেভাবে খুন হলেন সিরাজ সিকদার

11

সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আলোচিত নাম। কারো চোখে তিনি ভুল বিপ্লবের বাঁশিওয়ালা, কারো কাছে তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের পক্ষে লড়াই করা এক বীর যোদ্ধা যাকে ১৯৭৫ সালে সরকারী হেফাজতে হত্যা করা হয়। সরকারী হেফাজতে হাই প্রোফাইল নেতা হিসেবে সিরাজ সিকদার ছিলেন প্রথম হত্যাকাণ্ডের শিকার।লক্ষ্য করুন, বলেছি সরকারী হেফাজতে থেকে, সরকারী বাহিনীর হাতে প্রথম খুন নয়। কারণ স্বাধীনতার পর সরকারী বাহিনীর হাতে অংখ্য খুনের ঘটনা ঘটেছে।

১৯৬৮ সালে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে চিহ্নিত করে সিরাজ সিকদার নিজের বিপ্লবী থিসিস শুরু করেন। সেই থিসিসের উপর ভিত্তি করে সর্বহারা পার্টি প্রথমে “পূর্ব বাঙলা শ্রমিক আন্দোলন” ও পরবর্তীতে “জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম” শুরু করে। ইতিহাসে প্রথম বারের মতো তার পার্টি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ায় । তারিখটি ছিল ৮ জানুয়ারি ১৯৭০ সাল। এই পতাকার ডিজাইন করেন একজন বিহারী মুসলিম কমরেড সামিউল্লাহ আজমী। তিনি সিরাজ শিকদারের পার্টি করতেন। তিনি ছিলেন একজন বিহারী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তবে পাকিস্তানীদের সাথে লড়াইয়ে তিনি প্রাণ হারাননি। সামিউল্লাহ আজমী প্রাণ হারান মুজিব বাহিনীর হাতে। মুজিব বাহিনী আলোচনার জন্যে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করে। ৭১-এ মুজিব বাহিনীর এরকম অনেক বিতর্কিত ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশ সরকার মুজিব বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো না। শেখ মণি’র মতন নেতারা মনে করতেন শেখ মুজিবের অবর্তমানে তারাই অভিভাবক। ফলে প্রকাশ্যে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বের বিরোধিতা করতো তারা। অভিযোগ আছে- বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকেও হত্যা চেষ্টা করে তারা।

সিরাজ সিকদার চীনপন্থি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ফলে ভারতের সহযোগিতায় স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান ছিল আওয়ামী লীগ থেকে ভিন্ন। সিরাজ সিকদারের দল মনে করতেন পাকিস্তানীদের থেকে মুক্ত হয়ে ভারতের গোলামী করার জন্যে বাংলার মানুষ যুদ্ধ ও সংগ্রাম করেনি। এছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনপন্থি বামদের হাতে যেন অস্ত্র না যায় সে ব্যাপারে ভারত সরকার শক্ত অবস্থানে ছিল। বামপন্থীরা সব সময় ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধী। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বামপন্থী কিংবা সেক্যুলার লাইনে ভারতের আধিপত্যের বিরোধিতা ব্যর্থ হওয়ায়, সেই ব্যর্থতার ফাঁক দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক বার্তা চাঙ্গা হয়েছে। ফলে মৌলবাদী দলগুলো ভারত বিরোধী সাম্প্রদায়িক কর্মসূচীর মধ্যদিয়ে নিজেদের শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে।

বামপন্থীরা শুধু স্বাধীনতা প্রশ্নে নয়; “জয় বাংলা” স্লোগান নিয়েও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের অভিযোগ ছিল। তারা কেন “জয় বাংলা” বলতো না, এর জন্যে তাদের নিজস্ব বয়ান ছিল। যেমন বামপন্থী শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯৭০ এর নির্বাচনের কয়েকদিন আগে (৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০) দৈনিক সংবাদে লেখা উপসম্পাদকীয় লিখছেন-“আওয়ামী লীগ কেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির(ন্যাপ) প্রগতিশীল ও সংগ্রামী কর্মী এবং নেতাদের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে, গত দুদিন ধরে তার রাজনৈতিক কারণ ও পটভূমিটা বিশ্লেষণ করছিলাম। এই বিশ্লেষণ আজ একান্ত প্রয়োজনীয়। কেননা, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির বিরুদ্ধে পার্টি দাঁড় করিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের যে সুবিধাবাদী নীতির পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে তা থেকে একটি সিদ্ধান্তই টানা যায়। সে সিদ্ধান্তটি হল, আওয়ামী লীগ প্রগতির পক্ষে থাকছেন না, থাকবেন না। আওয়ামী লীগ থাকবেন প্রতিক্রিয়ার পক্ষে। সেই প্রতিক্রিয়ার পক্ষে থাকতে গেলে জনপ্রিয়তা হারাতে হবে, কাজেই এমন শ্লোগান নাও যাতে সেই প্রতিক্রিয়াশীল চেহারাটা ঢাকা দেওয়া যায়। স্বায়ত্তশাসন, জয় বাংলা হল এ জাতীয় শ্লোগান। এসব শ্লোগান গালভরা শ্লোগান, লোক মাতানো শ্লোগান। অথচ এর দ্বারা জনগণের কাছে কোন নির্দিষ্ট ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতিও দিতে হচ্ছে না। কাজেই বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করে তারপর বাঙ্গালী পুলিশ দিয়ে যখন বাঙ্গালী শ্রমিক বা কৃষকদের ঠ্যাঙ্গানো হবে তখন তা জয় বাংলার নামেই করা যাবে, যখন বাঙ্গালী মুনাফাখোর-কালোবাজারিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে তখন তা জয় বাংলার নামেই করা হবে। কেননা জয় বাংলা কিম্বা ছয় দফার কোথাও এসব করতে মানা নেই। জয় বাংলা কিম্বা ছয় দফার কোথাও জনগণের কথা নেই, রুটি- রুজি কিম্বা জমির কথা নেই। কাজেই জয় বাংলার নামে যা খুশি করা যাবে, ঠিক পাকিস্তান ও ইসলামের নামে মুসলিম লীগ যা করেছিল।”

ফলে কেউ  “জয় বাংলা” না বললে কিংবা ৭১-এ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করলে তাকে পাকিস্তানপন্থী কিংবা স্বাধীনতা বিরোধী বলার সুযোগ নেই। সর্বহারা-পন্থী মুক্তিযোদ্ধা যেমন আছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ মুজিব বাহিনীর প্রধান নেতাদের নিয়ে গঠিত জাসদ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত দল। ৭১-এ চীনপন্থিরা সাত-আট ভাগে বিভক্ত হয়। চীনপন্থি  আব্দুল হকের গ্রুপ ছাড়া অন্য সকল গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। বরিশালের পেয়ারা বাগানে (মুক্তাঞ্চল) সিরাজ সিকদার গড়ে তোলে জাতীয় মুক্তিবাহিনী। জাতীয় মুক্তিবাহিনী বরিশাল, বিক্রমপুর, ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সহিত লড়াই করে বীরত্বের পরিচয় দেয়। এছাড়া যুদ্ধে শুরু হওয়ার  পূর্বে ১৯৭১ সালে ২ মার্চ তার পার্টির পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে খোলা চিঠিতে “মুক্তিবাহিনী” গঠন করে “মুক্তিযুদ্ধ” চালানোর আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারকে খোলা চিঠি দিয়ে প্রস্তাব করা হয় যে, জামায়াত ইসলামীসহ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে যেন বিলিয়ে দেওয়া হয়।

সিরাজ সিকদারকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫-এর ২ জানুয়ারি। সেই ৭৫-এই খুন হোন বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা। পরবর্তীতে সেনা বাহিনীর চাপে হোক কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে জিয়ার হাতে খুন হোন কর্নেল তাহের। তাহেরও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। তাহেরকে হত্যা করে জিয়াও শেষ রক্ষা হয়নি। জিয়া নিহত হোন তারই অধীনস্থ সেনা বাহিনীর হাতে। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক জুয়া খেলায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বামপন্থী, উদারপন্থী-মধ্যপন্থী কিংবা আওয়ামী পন্থী নেতারা বিলীন হয়ে গেলেও গোলাম আযমরা ঠিকই টিকে ছিল। এবং যুদ্ধাপরাধের দায় মাথায় নিয়ে পুনরায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ দল ও নেতা হিসাবে হাজির করতে সক্ষম হয়।

সিরাজ সিকদারের হত্যার খবর শোনার পর মাহবুব তালুকদার- ‘ ১৯৭৫ সনের ৩রা জানুয়ারি শুক্রবার সকালে দৈনিক বাংলার সংবাদটি পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। প্রথম পাতাতেই আছে_ ‘ সিরাজ শিকদার গ্রেফতার গ্রেফতার_পলায়নকালে নিহত।’ সংবাদটি পড়ে মন বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে রইল। সিরাজ সিকদার ভালো না মন্দ সেটা আদালতের বিচার্য বিষয়। কিন্তু পুলিশের হাত থেকে পালাতে চেষ্টা করল কিভাবে? সে সুযোগ পুলিশ দিল কেন? এর জবাবদিহি পুলিশ তথা প্রশাসনকেই দিতে হবে। ঘটনাটি সম্পর্কে কেবল পুলিশের ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার নিজস্ব কোরো রিপোর্ট নেই। অন্য পত্রিকাতেও নেই। এ কেমন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ?

বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে অবজারভার হাউসে ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকায় চলে এলাম। সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী বাইরে থেকে মাত্রই ফিরেছেন।… বললাম, হায়দার ভাই‍ ! ওর সঙ্গে দেখা করার একটা আগ্রহ ছিল আমার।… কি অবস্থায় দেখলেন তাঁকে?

দেখলাম__ রাজপুত্রের মত শুয়ে আছে। শান্ত সৌম্য চেহারা। গতকাল মারা গেলেও লাশ বিকৃত হয়নি।”

(মাহবুব তালুকদার, ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’, পঞ্চম মুদ্রণ : ২০১৭, পৃ.১১৬-১১৭)

12

২ জানুয়ারিতে নিহত সিরাজ সিকদারের শরীরে পাঁচটি গুলির দাগ পাওয়া যায়। ময়না তদন্তে জানা যায়,  ৪টি গুলি সিরাজ সিকদারের দেহ ভেদ করে চলে যায়। এবং একটি গুলি ফুসফুসের পাওয়া যায়। পত্রিকায় সিরাজ সিকদারের স্ত্রী কন্যাসহ তার সকল কর্মকাণ্ড প্রকাশ করা হলেও রহস্যজনক-ভাবে মুক্তিযুদ্ধে সিরাজ সিকাদের ভূমিকার কথা পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৭৫ সালে সিরাজ সিকদারের বয়স ছিল প্রায় ত্রিশ বছর।

এখানে পাটের গুদামের আগুনের প্রসঙ্গটি হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পাটের গুদামে আগুনের প্রসঙ্গে একদল সর্বহারা পার্টি ও জাসদের ঘাড়ে এই দায়টি দিয়ে দেয়। সর্বহারা পার্টি অনেক কর্ম/অপকর্ম করলেও পাটের গুদামে আগুন দেওয়ার সাথে তারা জড়িত না। এমনকি জাসদও জড়িত না। ১৯৭৪ সালে একসাথে ১৭টি গুদামে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। তৎকালীন পত্রিকা পড়তে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সরকারী অফিসাররা গুদামের হিসাব উল্টাপাল্টা করতো বলেই ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগাত। এবং এতে সহায়তা করতো স্থানীয় সরকারপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারা। অনেক কারখানায় শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিল যে, হিসাব উল্টাপাল্টা থাকাতে তাই অফিসাররা গুদামে আগুন দেয়। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ভাষণে একটি- “আমি বিদেশ থেকে যা ভিক্ষা করে আনি। আর চাটার দর সব চেটে খেয়ে ফেলে।” পরের দিন তাজউদ্দীন আহমেদ গুলিস্তানে বঙ্গ মার্কেট উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেন; দেশ চালাই আমরা তাহলে চুরি করে কারা?

এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার পর যে দুটি দল মুজিব সরকারকে চরম বিপাকে ফেলছিলে তার মধ্যে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি অন্যতম। আরেকটি দল হচ্ছে জাসদ। তবে সরকারের দমন নীতি জাসদের তুলনায় সর্বহারা দলের উপরই ছিল বেশি তীব্র।  সিরাজ সিকদার নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন শেখ কামালও। বলা যায় তিনি গুলি খেয়ে মরতে বসেছিলেন। মরেন নাই শেষ পর্যন্ত, তবে ব্যাংক ডাকাতের একটা তকমা দীর্ঘদিন ধরে শেখ কামালের নামের সঙ্গে জুড়েছিল। এখনও হয়তো কেউ কেউ তা বিশ্বাসও করেন।

দুই বছরের মধ্যেই ৬০টিরও বেশি থানা এবং ২০-টিরও বেশি ব্যাংক লুট করে তার দল চমক সৃষ্টি করে তরুণ প্রজন্মকে রোমাঞ্চিত করতে সক্ষম হয় সর্বহারা পার্টি। কিন্তু সর্বহারা পার্টির লাইন বৃহত্তর জনগোষ্ঠী গ্রহণ করেনি। সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক লাইন ভুল ছিল, তেমনি আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনার লাইন ভুল ছিল। ভুল কর্মসূচীতে ছিল জাসদও। ভুল না হলে ব্যর্থ হলো কেন? পৃথিবীর ইতিহাসে আওয়ামী লীগ হয়তো একমাত্র রাজনৈতিক দল, যে দলটি স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী জনপ্রিয় দল হয়েও স্বাধীনতার ৪ বছরের মাথায় গদি থেকে মুখ থুবড়ে পড়ে। শেখ মুজিব সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্যে সংগ্রাম করেও শেষ পর্যন্ত এক দলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। সিরাজ সিকদারের হত্যা পর শেখ মুজিবের- “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার? ” এমন উক্তির জন্যে সমালোচিত হলেও খুনাখুনির রাজনীতি যেহেতু শেখ মুজিব করতেন না, সেহেতু সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার হুকুম তিনি দেননি এতোটুকু জোর দিয়ে বলা যায়।  তাই তো বিমানবন্দরে শেখ মুজিবকে যখন বলা হয় সিরাজ সিকদার পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন। তখন তাঁর মুখে শুনতে পাই-‘লোকটাকে তোরা মেরে ফেললি’।

তবে শেখ মুজিবের একটি ভাষণ বেশ সমালোচনার মুখে পড়ে। ঐ ভাষণকে হত্যার হুকুম হিসেবে অনেকে বিবেচনায় আনেন। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে ছাত্র ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘যারা রাতের বেলায় গোপনে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, সাধারণ মানুষকে হত্যা করে তাদের সঙ্গে ডাকাতদের কোন পার্থক্য নেই। রাতের অন্ধকারে গোপন হত্যা করে বিপ্লব করা যায় না। তোমরা যে পথ ও দর্শন বেছে নিয়েছ তা ভুল। আমরা গণতন্ত্র দিয়েছি ঠিক। কিন্তু কেউ যদি রাতের বেলায় নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করতে পারে, তাহলে জনগনের সরকার হিসাবে আমাদেরও তাদের গুলি করে হত্যা করার অধিকার আছে।’

কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?

সিরাজ শিকদারের মৃত্যু নিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার’, শেখ মুজিবের জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যের এই একটিমাত্র বাক্য উদ্ধৃত করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিল সিরাজ শিকদারকে বুঝি শেখ মুজিবের নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছে। অথচ সংসদে শেখ মুজিব এ প্রসঙ্গে অনেক কথাই বলেছিলেন, যা থেকে বোঝা যায়, তিনি দেশের ‘অরাজক পরিস্থিতি এবং দূর্বৃত্তদের’ সম্পর্কে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে সিরাজ শিকদারের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন৷ তাঁর বক্তব্যটি ছিল এরকম-  “বিপ্লবের বিরোধিতা করে এবং শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজ দেশবাসীকে যারা হত্যা করে, কোনো জাতি তাদের কখনো ক্ষমা করে না আমরা করেছি। আমি তাদের বলেছিলাম, তোমার লোকেদের ভালোবাসো, দেশের জন্য কাজ করো এবং স্বাধীনতাকে মেনে নাও৷ এখানে থাকো। কিন্তু তারা বদলায়নি। তারা বিদেশ থেকে টাকা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। তারা ভাবে আমি কিছুই জানি না। যারা ডাকাতের মত রাতের বেলায় মানুষ খুন করে, তারা মনে করে কেউ তাদের ধরতে পারবে না। কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? যদি তাকে পাকড়াও করা যায়, যদি তার লোকদের ধরা যায় তাহলে ঘুষখোর কর্মকর্তাদেরও আমরা ধরতে পারবো। যারা গোপনে বিদেশ থেকে টাকা পায়, আমরা কি খুঁজে বের করতে পারব না? যারা সম্পদ লুট করে, তাদের কি আমরা ধরতে পারব না? মজুতদারদের ধরতে পারব না, কিংবা কালোবাজারিদের? নিশ্চয়ই পারব।”  তথ্যসূত্র- মহিউদ্দিন আহমদ, জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি

এস এ করিম তাঁর “[Karim, S. A (2004), Sheikh Mujib-Triumph and Tragedy’ বইতে বলছেন, সিরাজ শিকদারকে হত্যার ব্যাপারে শেখ মুজিবের হাত ছিল- জনমনে এ ধরনের একটা ধারণা তৈরির চেষ্টা করেছেন অনেকেই। কিন্তু সত্যি কি তা-ই? আটক অবস্থায় নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি উৎসাহী কোন কর্মকর্তা যে তাঁকে হত্যা করতে পারেন, এই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সিরাজ শিকদারের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা শেখ মুজিবের কাছে গেলে তিনি রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তোরা ওকে মেরে ফেললি?’

“শেখ মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর খবর যখন তাঁর বাবাকে দেওয়া হয়, তখন তিনি ওই বাসায় ছিলেন। তাঁর বাবা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তোরা ওকে বাঁচাতে পারলি না!’ আমি বিশ্বস্ত একজনের কাছে একটি ভিন্ন রকম কথা শুনেছিলাম। তিনি খবরটি শুনে রেগে যাননি, বরং বিচলিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তোরা ওকে মেরে ফেললি!’

এর যে কোনোটিই সত্য হোক না কেন, দুটি বক্তব্যের মধ্যে মিল আছে। সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর খবর শুনে মুজিব বিস্মিত হয়েছিলেন এবং যেভাবে তিনি মারা গেলেন, সেই পদ্ধতি তিনি অনুমোদন করেননি। তবে মুজিব তাঁর অনুগত কর্মকর্তাদের তদন্তের মধ্যে ফেলে বিব্রত করতে বা তাঁদের ক্যারিয়ার নষ্ট করতে চাননি। বরং অভিযোগের সন্দেহ যেচে নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলেন।

পুলিশ সুপার মাহবুব সিকদারের রহস্যজনক মৃত্যুর ব্যাপারে ধোঁয়াশা দূর করতে পারতেন। সরকারি পদের কারণে তিনি সিকদারের মৃত্যুর পূর্বাপর জানতেন। একজনের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে আমি একটি সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, শেখ মুজিবের একটি জীবনীগ্রন্থ লেখার কারণেই তাঁর সঙ্গে কথা বলা দরকার। তিনি রাজি হন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে তিনি আসেননি। তিনি কি আশঙ্কা করেছিলেন যে কীভাবে সিকদারের মৃত্যু হলো সে ব্যাপারে আমি তাঁকে প্রশ্ন করব এবং এতে তাঁর ভূমিকার কথা জানতে চাইব?” [লাল সন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি: মহিউদ্দিন আহমদ, পৃ.১৯৬]

হায়দার আকবর খান রনোর শতাব্দী পেরিয়ে বইতে শিবপুরের মুজিবুর রহমানের একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যার ডাক না ছিল ঝিনুক।। ঘটনাটি এরকম- ঢাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমানকে তুলি নিয়ে যায় রক্ষী বাহিনী। ঢাকা থেকে রক্ষী বাহিনী তুলে নেওয়ার কোন অধিকার নেই এই কাজ করতো স্পেশাল বাহিনী। যেহেতু মামলাটি ঢাকার বাহিরে শিবপুরের ছিল তাই রক্ষী বাহিনী গ্রেফতার করে। রনো বলছেন, তাদের কাছে খাঁটি খবর ছিল যে রাত ১ টায় ঝিনুককে হত্যা করা হবে। তিনি হত্যা রোধ করার জন্যে অনেক জায়গায় দৌড়া-দৌড়ী করেন। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হোন। এবং বঙ্গবন্ধুর কারণে ঝিনুক বেঁচে যান। হায়দার আকবর খান রনো আক্ষেপ করে বলছেন,” শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে পার্সোনাল অ্যাপ্রোচ করতে পারলে হয়তো এরকম আরও অনেককে বাঁচানো যেত। কিন্তু তা কী সব সময় সম্ভব? আমি একবার তাকে বলেছিলাম, কোথায় কোথায় কাজে হত্যা করা হয়েছে। তিনি একটু রেগে গিয়ে বললেন, শুধু তোদের লোক মরছে, আমার লোককে মারছে না। আমি বললাম, আমার লোক আর আপনার লোক এভাবে বলছেন কেন? আপনি না জাতির পিতা। সবাই তো আপনার লোক। শেখ মুজিব একটু আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, জাতির পিতা হয়েইতো বিপদে পড়েছি।

”বিমান থেকে অবতরণের সময় আকস্মিকভাবে পুলিশের জনৈক ইন্সপেক্টর দৌড়ে এসে বুকে লাথি মেরে চীৎকার করে ওঠে ‘হারামজাদা তোর বিপ্লব কোথায় গেল?’ এ পর্যায়ে উপস্থিত পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করে নতুন আক্রমণের হাত থেকে সিরাজ সিকদারকে রক্ষা করে। এবং মন্তব্য করে – ‘এত অস্থির হচ্ছ কেন কা… ঘরে নিয়েই আমরা দেখে নেব।” – সিরাজ সিকদার হত্যার নেপথ্য কাহিনী/ বিচিত্রা, ১৯ মে ১৯৭৮

বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে অ্যান্থনী মাসকেরেনহাস লিখেছেন:
“ঘটনাচক্রে মাওপন্থী সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কাছাকাছি এক এলাকা থেকে (টেকনাফ) শেষ পর্যন্ত পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হলেন।
জাকারিয়া চৌধুরির (সিরাজ সিকদারের ছোটবোন, ভাস্কর শামীম সিকদারের স্বামী) মতে, তাকে পাহারা দিয়ে ঢাকায় আনা হলো শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করানো জন্য। শেখ মুজিব তাকে তার আয়ত্বে আনতে চাইলেন। কিন্তু সিকদার কোনো রকম আপোষ রফায় রাজী না হলে মুজিব পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে বলে দিলেন।
জাকারিয়া বললো, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখ-বাঁধা অবস্থায় রমনা রেস কোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। তারপর (২ জানুয়ারি ১৯৭৫) গভীর রাতে এক নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই সময় সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় যে, পালানোর চেষ্টাকালে সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
সিকদারের বোন, জাকারিয়ার স্ত্রী শামীম জানায়, সিরাজের দেহের গুলির চিহ্ন পরিস্কার প্রমাণ করে যে, স্টেনগান দিয়ে তার বুকে ছয়টি গুলি করে তাকে মারা হয়েছিলো।
সিরাজ সিকদারকে, শেখ মুজিবের নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছে বলে সারাদেশে রটে গেলো।
১৯ বছরের যুবতী শামীম তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
সে আমাকে বলেছিলো, আমি সর্বহারা পার্টির কাছ থেকে একটা রিভলবার পেয়েছিলাম এবং এই হত্যাকারীকে হত্যা করার সুযোগের সন্ধান করছিলাম।
শামীম বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাস্করদের একজন। গত বছরই কেবল সে তার ভাস্কর্যের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করে। তার ধারণা, সে নিশ্চয়ই মুজিবকে গুলি করার দূরত্বে পেয়ে যাবে।
শামীম মুজিবের সঙ্গে দেখা করার জন্য বহুবার আর্জি পেশ করেছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে। তারপর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের কলা বিভাগে তার এক প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ জানালো। মুজিব আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হলেন।
সে স্মৃতিচারণ করে বললো, আমি ভায়নক বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলাম। আমি শত চেষ্টা করেও তাঁকে (শেখ মুজিব) আমার গুলির আয়ত্বে আনতে পারলাম না। ভাগ্যই মুজিবকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো। শামীম জাকারিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। শেষে তাদের বিয়ে হলে স্বামীর সঙ্গে শামীম বিদেশে চলে যায়।”

সিরাজ সিকদারকে ধরার জন্য আর্মিকে বলা হলেও তারা খুব আগ্রহ দেখায়নি। বরং আমরা জেনেছি যে, একবার সেনাবাহিনী সিরাজ সিকদারকে ধরলেও ছেড়ে দিয়েছিল। তবে সিরাজ সিকদারের প্রতি পুলিশ বা রক্ষী বাহিনীর তেমন কোনো সহানুভূতি ছিল না। কারণ, সর্বহারা দলের অন্যতম টার্গেট ছিল এরাও। ফলে শেষ পর্যন্ত ধরা পরতেই হয় সিরাজ সিকদারকে। হালিম দাদ খান লিখেছেন, ‘চুয়াত্তরের শেষার্ধে মুজিব সেনাবাহিনীকে নক্সালদের মূলোৎপাটনের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেজর ফারুক এ নির্দেশ পালনে উৎসাহী না হয়ে বরং এদের কাউকে ধরতে পারলেও ছেড়ে দিয়েই অধিক আনন্দ পেতেন।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন- “মেজর নুর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে পিকিংপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। পরে তিনি সর্বহারা পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। সিরাজ শিকদারের নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। ১৫ আগস্টের কয়েক দিন পর সর্বহারা পার্টির কয়েকজন নেতা কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটা বাসায় সন্ধ্যাবেলা বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিন, আকা ফজলুল হক ও মহসীন আলী। তাঁরা নূর ও ডালিমকে ডেকে পাঠান। নূর একাই এসেছিলেন। শেখ মুজিবের পরিবারের সবাইকে হত্যা করার বিষয়ে জানতে চাইলে নূর বলেন, ‘ওরা আমার নেতাকে খুন করেছে, আমি সবাইকে মেরে প্রতিশোধ নিয়েছি।’ নূরের উদ্ধত আচরণে এবং নৃশংসতার পরিচয় পেয়ে জিয়াউদ্দিন ক্ষুব্ধ হন।”

সিরাজ সিকদার হত্যা মামলা

সিরাজ সিকদারের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর পর সর্বহারা পার্টির পক্ষ থেকে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। সবাই যেন চুপ মেরে গেছে। কিছুদিন পর অনুকূল বাতাবরণ তৈরি হয় এবং সিরাজ সিকদার স্মৃতি পরিষদ নামে সংগঠন দাঁড়িয়ে যায়। আওয়ামীবিরোধী রাজনীতিবিদরা তাঁর ‘হত্যার’ বিচার চেয়ে স্লোগান দেয়, মৃত্যুবার্ষিকীতে গোরস্থানে গিয়ে ফুল দেয়। ব্যস, এ পর্যন্তই।

“৪ জুন ১৯৯২ সালে সিরাজ সিকদারকে হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও মোহাম্মদ নাসিমসহ সাতজনকে আসামি করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। সিরাজ সিকদার পরিষদের সভাপতি শেখ মহিউদ্দিন আহমদ বাদী হয়ে এই মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন: ১. সাবেক পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ২. আবদুর রাজ্জাক এমপি, ৩. তোফায়েল আহমেদ এমপি, ৪. সাবেক আইজিপি ই এ চৌধুরী, ৫. সাবেক রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক কর্নেল (অব.) নূরুজ্জামান, ৭. মোহাম্মদ নাসিম এমপি গং। আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২ ও ১০৯ নম্বর ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আর্জিতে বলা হয়, ” ……. সে সময় ১ নং আসামি মাহবুব উদ্দিন তাঁর রিভলবারের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে সিরাজ সিকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শেখ কামাল রাগের মাথায় গুলি করলে সিরাজ সিকদারের হাতে লাগে। ওই সময় সব আসামি শেখ মুজিবের উপস্থিতিতেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলেন। এর পর শেখ মুজিব, মনসুর আলী এবং ২ থেকে ৭ নং আসামি সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১ নং আসামিকে নির্দেশ দেন ……।” তথ্যসূত্র : ভাসানী মুজিব জিয়া : ১৯৭২-১৯৮১ / জিবলু রহমান ॥ [শুভ প্রকাশন – মে, ২০০৪ । পৃ: ১৮৯]

ভাসানী মুজিব জিয়া বইয়ের একই বয়ান মহিউদ্দিন আহমদের লাল সন্ত্রাস বইতে আরো বিস্তারিত আছে।

“মামলাটি যখন করা হয়, তখন ক্ষমতায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই মামলাটি করানো হয়েছিল। মামলার বাদী শেখ মহিউদ্দিনের সঙ্গে সর্বহারা পার্টির কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। সর্বহারা পার্টির নেতা রানা লেখককে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশকে দিয়ে মামলাটি সাজানো হয়েছিল শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে অপদস্থ করার জন্য। তবে তিনি একটি ব্যাপারে একমত হন যে সিরাজ সিকদারকে সে রাতেই শেরেবাংলা নগরে খুন করা হয়েছিল। সাভারের গল্পটি বানানো।

বিএনপি সরকার সিরাজ সিকদারের জন্য সহানুভূতি এবং প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল বলে রানা মন্তব্য করেন। এটাকে তাঁরা আমলে নেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার, খালেদা জিয়ার সরকার এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ বিচারের ব্যাপারে কোলে আগ্রহ দেখায়নি। মামলাটির অপমৃত্যু হয়। পরে বিএনপির অনেক নেজা সিরাজ সিকদার হত্যা’ নিয়ে অনেক কথা বললেও তাঁরা সরকারে থাকাকালে এরকম একটি ‘অব্যর্থ অস্ত্র’ কেন ব্যবহার করলেন না, কেন মামলাটি চালানো হলো না, এ বিষয়ে তাঁরা নিশ্চুপ। ব্যক্তি সিরাজ সিকদারের ব্যাপারে তাঁদের কোনো আগ্রহ বা আবেগ ছিল না।

যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একদা সোচ্চার ছিলেন সিরাজ সিকদার, একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে তাঁর সন্তানদের গন্তব্য। তাঁর মেয়ে শিখা সিকদার এবং ছেলে শুভ্র সিকদার ৮ ডিসেম্বর ২০০৫ সালে ঢাকায় এসে একবার সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তখন দ্বিতীয়বারের মতো সরকারে। এক লিখিত বিবৃতিতে শিখা আর শুভ্র বলেন :

সিরাজ সিকদারকে কোনো ব্যক্তি হত্যা করেনি। শোষক-লুটেরা ও তাদের সহযোগীরা তাঁকে হত্যা করেছে। কোনো সরকারই তাঁর হত্যার বিচার করেনি। বর্তমান সরকারও এটা করবে না। সরকারের একটি অংশ তাঁকে হত্যা করেছে এবং অন্য অংশটি তার রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছে।

[লাল সন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি -মহিউদ্দিন আহমদ, পৃ.২১৬-২১৮]

সিরাজ সিকদারে সাথে বিচার বহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ পথ হারিয়েছিল। আর সেই পথ হারানো পথে হারিয়ে গেল অসংখ্য প্রাণ। কবি রুদ্রের তাইতো লিখেছেন-

হাজার সিরাজ মরে
হাজার মুজিব মরে
হাজার তাহের মরে
বেঁচে থাকে চাটুকর, পা-চাটা কুকুর
বেঁচে থাকে ঘুনপোকা, বেঁচে থাকে সাপ।

সহায়ক প্রবন্ধ:

শাহবাগের রাষ্ট্রপ্রকল্প-পারভেজ আলম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর)

বিপ্লবের ভেতর-বাহির-শওকত মাসুম

শতাব্দী পেরিয়ে- হায়দার আকবর খান রনো

3 comments

  1. ‘তোরা লোকটাকে মেরে ফেললি’ কথাটা কার অভিজ্ঞতায় বা বইয়ে পাবো ?

    Like

    • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর)

      বিপ্লবের ভেতর-বাহির-শওকত মাসুম

      এই দুইটি লেখায় উল্লেখ আছে।

      Like

  2. […] সিরাজ সিকদার কীভাবে ক্রসফায়ারারে নি…হলেন তা অনেকেই জানি। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করা এই নেতা কীভাবে ধরা খান ও কারা তাকে ধরিয়ে দেন তা নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয়। আজ আমরা দেখব সিরাজ শিকদারকে কারা ধরিয়ে দেন। […]

    Like

Leave a reply to সিরাজ সিকদারকে কারা ধরিয়ে দিয়েছিল? – সুব্রত শুভ এর ব্লগ Cancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.