বিজয় মিছিল করতে আসা এক বাহিরীর করুণ পরিণতি

বিহারীদের একটা অংশ পাকিস্তানীদের পক্ষে ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পুরো জানুয়ারি মাস ঢাকার কাছে মিরপুর ছিল পাকিস্তানপন্থীদের দখলে। তবে এটাও সত্য বিহারীদের অনেকে বাঙালির মুক্তিসংগ্রম থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যেমন, অবাঙ্গালী বিহারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সৈয়দ খান। যিনি বীরপ্রতীক উপরাধীদের সম্মানিত হন। বিহারী হওয়ার কারণে অনেকের অবদান সেভাবে স্মরণ করা হয় না। যেমন, বগুড়ার বিহারী কাবুল আহমেদের পিতা সন্তানের স্মৃতিচিহ্ন না থাকায় আক্ষেপের সুরে বলেন- আমরা এতো অচ্ছ্যুত হয়ে গেলাম! কোন স্মৃতি টিতি হলে আমি শান্তি পেতাম ।

স্বাধীনতার পর বিহারীদের অনেক সম্পদ দখলে করে অনেকে বিত্তবান হয়ে যান। বাংলাদেশের বিত্তবানদের একটা অংশ মূলত ৪৭ ও ৭১ সালের পর সম্পদ দখলের মাধ্যমে ধনী হোন। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসেও বিহারীদের উপর বড় হামলার ঘটনা ঘটে।

“জিঘাংসার এই অধ্যায় এতই বর্ণবাদী চেতনায় আপ্লুত ছিল যে, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন নামে যে উর্দুভাষী ব্যক্তিটি ঢাকার মোহাম্মদপুর ইউনিট আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস যাঁকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল নিজ কমিউনিটির হাত থেকে বাঁচার জন্য- তিনিও একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ধানমন্ডিতে প্রকাশ্যে খুন হয়ে যান স্রেফ অবাঙালি হওয়ার কারণে। অথচ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সেদিন গিয়েছিলেন তিনি আওয়ামী লীগের অন্যান্যদের সঙ্গে বিজয় উদযাপনের জন্য।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর প্রায় ১০-১২ হাজার উর্দুভাষীকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ করা হয়েছিল। এদের ঘিরে কীরূপ দুর্নীতি হয়েছে তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় সেই সময়কার সুপরিচিত দৈনিক গণকণ্ঠে ১৯৭৪ সালের ৮ জুলাই, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সংক্রান্ত এক লেখায়। কারাবাসী উর্দুভাষীদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে:

“…এসব বিহারির কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত (আটককালে পাওয়া) জমা নেয়া হয়। কোন কোন বিহারির কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল।… তদন্তে দেখা যায়, যে জমা দিয়েছে ৫ হাজার টাকা- তার নামের পাশে লেখা আছে ৫০ টাকা।.. এমনও শোনা যায়, বিহারিরা থাকাকালীন টাকার বিনিময়ে রাতে মহিলা সেল খোলা থাকত।” (পৃ-১৭০)

সূত্র: ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে-৩, দৈনিক গণকণ্ঠ ৮ জুলাই, ১৯৭৪

[তথ্যসূত্র: মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ: আলতাফ পারভেজ]

হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের পাশাপাশি এসময় উর্দুভাষীদের সম্পদও যে গণহারে বেদখল হয়েছে সে বিষয়ে এই লেখার অন্যত্র আলোকপাত করা হয়েছে। উর্দুভাষীদের ভাগ্য বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে যুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানে আটকে পড়া সেনা অফিসারদের অবস্থা ভাল ছিল।

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বিজয়ীর বেশে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশের নেতৃত্বে আমরা রংপুর শহরে প্রবেশ করি। তখন স্ত্রী-সন্তানদের কথা আমার মনে জাগে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ আলী খান আমাকে তার জিপগাড়ি দিয়ে বললেন, খান, তুমি তোমার পরিবারের তালাশ করো। আমি বিজয়ীর বেশে একবুক আশা নিয়ে পীরগঞ্জ বিহারী কলোনিতে গেলাম। সেখানে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। কলোনির কোনো চিহ্ন সেখানে আর অবশিষ্ট নেই। এক বিভীষিকাময় কাহিনী শোনালেন আমার কন্যা কুলসুমের কলেজের বান্ধবী মাকসুদা। যুদ্ধ শুরুর পর মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য হয়ে পড়ে পার্বতীপুর, শান্তাহার, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নেকমরদ এলাকার বিহারী কলোনিগুলো। এপ্রিলের প্রথম দিকে বাঙাল (স্থানীয় বাসিন্দাদের বাঙাল বলা হতো) ও মালদহাদের (ভারতের মালদহ থেকে আসা লোকদের স্থানীয় পরিচিতি) একটি সশস্ত্র দল রানীশংকৈল থেকে পীরগঞ্জের দিকে অগ্রসর হয়। এই এলাকা তখনও পাকবাহিনীমুক্ত ছিল। তারা রাতের বেলায় পীরগঞ্জ বিহারী কলোনি আক্রমণ করে। লুটপাটের পর জ্বালিয়ে দেয়া হয় পুরো কলোনি। কলোনির ৩শ’ ৬০ জন মানুষকে ঘর থেকে টেনে টেনে গুলি করে মারা হয়। কাউকে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে আমার স্ত্রী তকদিরন (৪৮), কলেজপড়ুয়া কন্যা কুলসুম (১৮), পুত্র কৈমুদ্দিন (২০) সৈমুদ্দিন (১৬), কন্যা আসমা (১৩) ও ছোট ছেলে সাবি্বর খান (৮)কে হত্যা করা হয়। হত্যার পর অন্যদের সঙ্গে আমার স্ত্রী-সন্তানদের গণকবর দেয়া হয়। বহু খোঁজাখুঁজির পরও তাদের লাশ বা কবরের সন্ধান করতে পারিনি। সেদিন পরিবার স্বজনদের জন্য অঝোরে কেঁদেছিলাম। স্বজন হারানোর এই বেদনাময় স্মৃতি আমাকে পাগল করে তোলে। কয়েক দিন পর ফিরে গেলাম রংপুরে। আমি বাঙালি সহযোদ্ধাদের বলেছিলাম, আমি তোমাদের জন্য যুদ্ধ করলাম, আর তোমরা আমার স্ত্রী-সন্তানদের কেড়ে নিলে। আমি প্রার্থনা করে বলতাম, হায়রে দুনিয়া তুমি আমার জন্য নও। আমি বাঙালি সহযোদ্ধাদের বলতাম, এ ক্যায়সা ইনসাফ তুম লোগ হামারা সাথ কিয়া। (তাঁর পরিবার সান্তাহার গণহত্যা নিহত হয়)

– ৬ নম্বর সেক্টরের বিহারী মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ খান বীরপ্রতীক

কোন স্মৃতিটিতি ( চিহ্ন ফলক) হয়নাই আমার ছেলের নামে আজ পর্যন্ত ।কোন কিছু হচ্ছে না । বিহারী হওয়ার কারণে নাকি কি ব্যাপার ? আমরা এতো অচ্ছ্যুত হয়ে গেলাম! কোন স্মৃতি টিতি হলে আমি শান্তি পেতাম ।

– ২৭ মার্চ, ১৯৭১ এ শহীদ বগুড়া আজিজুল হক কলেজের ছাত্র বিহারী মুক্তিযোদ্ধা কাবুল আহমেদের বাবা গোলাম রসুল আক্ষেপের স্বরে

“… সিরাজগঞ্জ সদরের রেলওয়ে কলোনীর বিহারী পট্টির হত্যাকান্ডটি ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। যে ঘটনাটি অনাকাঙ্খিত অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। অত্যন্ত রোমহর্ষক ও বেদনাদায়ক। উনিশ’শ একাত্তরের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স মাঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তেজদ্বীপ্ত ও ঐতিহাসিক ভাষণের পর ২৬ মার্চের কয়েক দিন আগে সিরাজগঞ্জের সর্বস্তরের স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটায়।

সিরাজগঞ্জের মানুষের এমন ধারণার উদ্রেক হয়েছিল যে, রেলওয়ে কলোনিতে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের শত্রু, তারা বাংলাদেশকে সমর্থন করতে পারে না, তারা পাকিস্তানকেই সমর্থন করবে আর যেহেতু তারা অধিকাংশই উর্দু ভাষাভাষি সেহেতু পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানিরাও তাদের শত্রু – এসব ধারণার বশবর্তী হয়ে জনগণ স্বত:স্ফূর্তভাবে সিরাজগঞ্জের রেলওয়ে কলোনির বিহারী পট্টিতে হামলা চালায় এবং তিনশ থেকে চারশ লোককে বিনা দোষে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

এই হত্যাকান্ডের পর সেদিন আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকা বিহারীদের নিরাপত্তা দিতে এবং পরবর্তীতে যাতে আর কোন রক্তক্ষয়ী ঘটনা না ঘটে সেজন্য সিরাজগঞ্জের তৎকালীন এসডিও শামসুদ্দীন তাদেরকে সিরাজগঞ্জ জেলখানার ভেতরে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে রাখেন। সেই নৃশংস হত্যাকান্ডে যারা প্রাণ হারান, তাদের কয়েক জনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছি।

১. বদরউদ্দিন : সিরাজগঞ্জ সাহারা হোস্টেলের মালিক ছিলেন। স্বাধীনতার পর হোস্টেলটির জায়গায় পলাশডাঙ্গা যুব সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ভিপি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। বর্তমানে সরকারের ভূমি অধিদপ্তর থেকে লিজ নিয়ে সাধারণ জনগণ ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন।

২. শামসুল হক : সাহারা হোস্টেলের মালিক বদর উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ্য পুত্র। তিনি ঠিকাদারী ব্যবসা করতেন।

৩. সদরুল ইসলাম : বদর উদ্দিনের পুত্র। কলেজের ছাত্র ছিলেন।

৪. ইব্রাহীম হোসেন : সিরাজগঞ্জ শহরের মুসলিম ক্লথ স্টোরের মালিক ছিলেন। শহরের বড় কাপড়ের ব্যবসায়ী হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।

৫. মোহাম্মদ আলী : কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন।

৬. ইব্রাহীম খান : চামড়ার ব্যবসা করতেন। তার বেশ কয়েকটি রাইস মিল ছিল।

৭. আলতাফ হোসেন : মনিহারী দোকানের স্বত্বাধিকারী ছিলেন।

৮. ইসমাইল হোসেন : রেলওয়েতে চাকরি করতেন।

৯. ইউনুস আলী : রেলওয়েতে চাকরি করতেন।

১০. এজাজ হোসেন : রেলওয়েতে চাকরি করতেন।

১১. ফাত্তার হোসেন খান : কওমি জুট মিলে চাকরি করতেন। তার পিতা সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ছিলেন। তিনিও সেদিন গণহত্যার শিকার হন।

১২. আব্দুর রাজ্জাক : রেলওয়েতে কয়লার ঠিকাদারী করতেন।

১৩. আব্দুর খান : আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে পিতার সাথে ঠিকাদারী করতেন।

১৪. হাবিবুর রহমান : রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন।

১৫. আবুল কাশেম : কওমি জুট মিলে ম্যাকানিক বিভাগে চাকরি করতেন।

১৬. নিজাম উদ্দিন : কওমি জুট মিলে ম্যাকানিক বিভাগে চাকরি করতেন।

১৭. রহিম উদ্দিন : সিরাজগঞ্জ শহরে বড় ধরণের এলোপ্যাথিক ঔষধের ফার্মেসির প্রোপ্রাইটর ছিলেন। রহিম উদ্দিনের পরিবারের আরও সাত জন সেদিন গণহত্যার শিকার হন।

১৮. গোলাম হোসেন খান : দাদন ব্যবসা করতেন।

১৯. মঞ্জুর রহমান খান : রেলওয়ের খালাসীর চাকরি করতেন।

২০. আখতার হোসেন : রেলওয়েতে চাকরি করতেন।

২১. খলিল খান : রেলওযেতে চাকরি করতেন।

২২. আব্দুল হালিম খান : রেলওয়েতে চাকরি করতেন।

২৩. মুস্তাফা আনসারী : পিতা ওসমান আনসারী জর্দা ফ্যাক্টরীর মালিক ছিলেন।

২৪. আব্দুল কাদের : ড্রাইভার ছিলেন॥”

[ ক্ষেত্রানুসন্ধান : লেখক / তারিখ : ২৫ আগস্ট, ২০০৮ ]

— শফিউদ্দিন তালুকদার / একাত্তরের গণহত্যা : যমুনার পূর্ব-পশ্চিম ॥ [ কথাপ্রকাশ – ফেব্রুয়ারি, ২০১১ । পৃ: ৭৪-৭৬ ]

আমার চাচা বীর মু‌ক্তি‌যোদ্ধা(বিহারী) ফ‌তে মোহাম্ম‌দের নাম কো‌নো তা‌লিকায় নেই। বড় দুঃখ ও বেদনা কথা। অামা‌দের ম‌নে রাখা ফরজ যে, কিছু সাম‌রিক অ‌ফিসার ও শহু‌রে গে‌রিলারাই শুধু যুদ্ধ ক‌রেননি। সাধারণ জনতা ছিল মূল নিয়ামক।

– সৈয়দ আমীরুজ্জামান বীরবিক্রমের সন্তান তোহা মুরাদ

“১৫ই এ‌প্রিল সকাল‌ বেলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থে‌কে অভয়া এ‌সে যা‌কে পা‌চ্ছি তা‌কেই বল‌ছি, রিয়ার ঘাঁ‌টি‌তে ফেলে আসা রসদ-‌গোলাবারুদ এবং বেতারযন্ত্র উদ্ধার করার কথা। কিন্তু কেউ আমার কথায় পাত্তা দি‌চ্ছে না। য‌দি-বা কেউ দেয়, শুধু ব‌লে, ‘‌দে‌খো , য‌দি পার।’ আমার সাথী কেউ হ‌তে চায় না। হঠাৎ ক‌রেই ডজগা‌ড়ির বিহারী ড্রাইভার না‌য়েক ফ‌তে মোহাম্মদকে বললাম, ‘ ওস্তাদ, কেয়া কিঁয়া যায়গাঁ মুরারীপুর মে ডামস্ কিঁয়া হুয়া গোলা আওর হা‌তিয়ার কা। হাম সব তো লড়াই‌মে উৎরা হ্যায়, উ সব চিজ কা জরুরত তো হোঁগা।’ আমার ডা‌কে প্রথম সাড়া দিল অবাঙা‌লি ড্রাইভার ফ‌তে মোহাম্মদ। সে বলল, ‘ ওস্তাদ, হা‌তিয়ার লো, হাঁম বিল কুল তৈঁয়ার হাঁয়।’ আমি অস্ত্রধারী সৈ‌নিক নই, তাই তখন খুঁজ‌তে লাগলাম কে স‌ঙ্গে যা‌বে? চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিবাসী এক ছোকরা সৈ‌নিক এ‌গি‌য়ে এল– নাম তার সা‌জেমুল হক। ম‌নে আছে ওর উ‌ক্তি, ‘ ওস্তাদ, আমি যাব, গান দাও।’ কালবিলম্ব না ক‌রে মাত্র একটা এলএম‌জি আর ১২ ম্যাগ‌জিন গু‌লি নি‌য়ে আমি ও সা‌জেমুল ডজ গা‌ড়ি‌তে চাপলাম। প‌থে খা‌লি হা‌তে এক সেপাই‌কে পেলাম। এর ম‌ধ্যে আমাদের বি‌ক্ষিপ্ত লোক খোঁজ কর‌তে দুই মাইল ভিত‌রে এক গ্রা‌মে গেলাম। প্রায় দুপুর আড়াইটার দি‌কে মুরারীপুর পৌঁছালাম। সা‌জেমুল এলএম‌জি-‌তে ম্যা‌গ‌জিন চ‌ড়ি‌য়ে রাস্তা‌কে কভার ক‌রে প‌জিশন নি‌য়ে দাঁড়াল। স্থানীয় ছে‌লে‌দের স্বতঃস্ফূর্ত সাহা‌য্যে অনুমান ৭-৮‌মি‌নি‌টের ম‌ধ্যেই গা‌ড়ি ভর্তি হল। অবশ্য ভয় হ‌চ্ছিল, কারণ শত্রু টের পে‌লে জীবন বাঁচ‌লেও গা‌ড়ি রক্ষা করা যা‌বে না। যাই হোক, নিরাপ‌দে অভয়া ফি‌রে এলাম।জানলাম অন্য আর এক ঘ‌রে অারও কিছু রসদ আছে, তাই আবার চললাম মুরারীপুর। এবার সাথী পেলাম এলএম‌জিসহ সিপাই কালা মিয়া‌কে, আর সা‌জেমুল তো আছেই। ফ‌তে মোহাম্ম‌দের গা‌ড়ি ছুট‌ছে হাওয়ার গ‌তি‌তে। ঠিকানা ম‌তো পৌঁ‌ছে ৪-৫ মি‌নিটেই গা‌ড়ি ভ‌র্তি ক‌রে পিঠটান দিলাম।”

[বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একজন সৈনিকের স্মৃতিকথা- সৈয়দ আমীরুজ্জামান বীরবিক্রম]

“বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমি বেইনসাফির সঙ্গে ইনসাফির যুদ্ধ মনে করলাম, তাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলাম, মুক্তি বনে গেলাম’’। – অবাঙ্গালী বিহারী মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ খান বীরপ্রতীক

সামিউল্লাহ আজমী (দলে ছদ্মনাম তাহের)

এখানে সামিউল্লাহ আজমীর কথা বিশেষ করে স্মরণ করা উচিত। তিনি ছিলেন উত্তর প্রদেশের কৈরাপারের স্টেশনমাস্টারের ছিলে, যিনি নিজে বিহারী হয়েও মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর প্রিয় পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। বিপ্লবের চিন্তা থেকেই সিরাজ সিকদারের সাথে তিনি জড়িয়ে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর হাতে খুন হোন। মুজিব বাহিনী আলোচনার জন্যে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করে। 

এ নিয়ে সিরাজ শিকদার ‘সাভারের লাল মাটি’ শীর্ষক কবিতা লেখেন –

“ তাহের, তোমাকে কতবার বলেছি

সতর্ক হতে।

আওয়ামী লীগের চররা

হায়নার মত খুঁজে বেড়ায়

বন্ধুর বেশে আমাদের

খতম করে।

রাতের অন্ধকারে

ফ্যাসিস্টদের বুলেটের শব্দে

তোমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় ।

তারপর…

লড়েছিলে ।

আর কিছু জানিনে । “

“মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে।’ হোস্টেলে এলেই সামিউল্লাহ এই গানটা গুনগুন করে গাইত। তখন অনেকে ভাবত-অবাঙালি মা-বাবার একটি ছেলে, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার জন্য এভাবে চিন্তা করছে, তারা কেন বসে থাকবে। সুতরাং সামিউল্লাহ যে অন্যদের চিন্তাকে উস্কে দিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সামিউল্লাহ আজমী তাঁর পরিবারের সাথে পূর্ব বাঙলার আসেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী ছিলেন রবীন্দ্র সংঙ্গীতের অনুরাগী, দুইজনই ভাল রবীন্দ্র সংঙ্গীত গাইতে পারতেন। সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের কর্মী ও পরবর্তীতে সর্বহারা পার্টির বেশির ভাগই একই জবানবন্দী দিয়েছেন যে, সামিউল্লাহ তাঁর স্ত্রী খালেদাকে নিয়ে স্বাধীণ পূর্ব বাংলায় পতাকার নকশা তৈরি করেছিলেন যা পরে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করে।

“আয়তাকার গাঢ় সবুজ রঙের মাঝখানে লাল বৃত্ত আঁকা এই পতাকা ১৯৭০ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের কয়েকটি জায়গায় উত্তোলণ করেছিল তার দলের কর্মীরা। পরবর্তী বছর কোন এক তারিখে এটি আরও অনেক জায়গায় তোলা হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার অবলুপ্ত পূর্বদেশ পত্রিকায় ‘নতুন পতাকা’ শিরোনামে এ সম্পর্কে একটি খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যখনই গর্বভরে এই পতাকাকে সালাম জানায়, এটি হয় উত্তর প্রদেশের কৈরাপারের স্টেশনমাস্টারের ছেলে সামিউল্লাহ আজমীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, যিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর প্রিয় পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।” এমনটাই বলেন সামিউল্লাহ আজমীর সাবেক কমরেডরা।

পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের কমরেড ফারুকের এক সাক্ষাৎকার মহিউদ্দিন আহমদ লাল সন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি বইতে উল্লেখ আছে। পৃ. ২৯৬

ম. আ- আপনার রেফারেন্স আমি পেয়েছি রাজিউল্লাহ আজমীর একটা লেখা পড়ে। তাঁর ভাই সামিউল্লাহ আজমী আপনাকে এ পার্টিতে নিয়ে এসেছিলেন। আচ্ছা ওই সময় কি আপনাদের দল স্বাধীন পূর্ব বাংলার পতাকা তৈরি করেছিল?

ক. ফা -হ্যাঁ, শুনেছি। ভারতে যাওয়ার আগেই এই ফ্ল্যাগটা দেখে গেছি।

ম. আ- কোথায় দেখলেন?

ক. ফা.- আমার বন্ধু জগদীশ হালদার ছিল মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নে। পরে স্বাধীনতার প্রশ্নে আমার সহানুভূতিশীল হয়ে গেল। সে আমাকে একদিন জগন্নাথ হল থেকে আর্ট কলেজে নিয়ে এল সি চক্রবর্তীর কাছে। পরে সে চিটাগাং (চারুকলা) কলেজের প্রফেসর ছুঁয়েছিল। আমাকে সে বলল, দেখ, আমাদের পার্টি থেকে এটা ডিজাইন করেছে। বললাম, ডিজাইনটা কে করল? সে বলল, হাসি চক্রবর্তী করেছে। একটা ম্যাচবক্সের ওপর এঁকে দেখাল। সবুজ রঙের ওপর লাল রং দিয়ে একটা পতাকা। জগদীশ হালদার এটা আমাকে প্রথম দেখিয়েছে ১৯৭০ সালে।

ম. আ- আমি শুনেছি, এর ডিজাইন করেছে সামিউল্লাহ আজমী আর তাঁর স্ত্রী।

ক. ফা.- এটা আমি জানি না। সুলতানের ওয়াইফ, আমার কাছে চোখ দেখাতে এসেছে অনেকবার। তার সঙ্গে সামিউল্লাহ আজমীর স্ত্রীর ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আমাদের এক সিনিয়র আপা ছিলেন, জহুরা আপা, ডাক্তার। এখন আমেরিকায় আছেন। তাঁর ভাই হলো সুলতান ওরফে মাহবুব। পুরান ঢাকায় বাড়ি।

ম. আ.- জগদীশ হালদার আপনাকে ম্যাচবক্সে আঁকা পতাকা দেখাল?

ক. ফা.- হ্যাঁ। বলল, এটা হাসি চক্রবর্তীর আঁকা। এরা হয়তো আইডিয়াটা দিয়েছে। আমি দেখেছি জগদীশের কাছে। এখন বাংলাদেশের যে পতাকা, এটাই তখন আমি দেখেছি। এটা তখন আমাদের অনেককে উদ্দীপ্ত করেছে। সবুজ জমিনের ওপর মুক্তির লাল সূর্য উঠছে-এরকম একটা চিন্তা। খুবই উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম।

(এই ব্লগটি লেখার জন্য Rafsun R Ahmed  (রুক্ষপুত্র)’র কাছে ব্যক্তিগতভাবে আমি কৃতজ্ঞ ও ঋণী)

3 comments

  1. শুভ ভাই , আমি আপনার ব্লগ এর একজন নিয়মিত পাঠক।বলা যায় বাংলাদেশীয় নিরিশ্বরবাদী ব্লগার মধ্যে আপনি আমার পছন্দেরও একজন ব্যক্তি। আমি প্রচন্ড বিশ্বাসী এবং প্রচন্ড ধার্মিক একজন মানুষ। বর্তমানে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হাদীসের উপর অনার্স করছি। আপনার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমার ব্যাপক দ্বিমত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরোধও রয়েছে। তবুও আপনার ইতিহাস নির্ভর তথ্যসূত্র সমৃদ্ধ লেখনী গুলো আমি নিয়মিত পড়ি, ভালো লাগে। আমার শুভকামনা রইল। আপনি ইশ্বরবাদীদের আরো নিকটবর্তী হবেন এই কামনায়।

    Like

  2. শুভ ভাই , আমি আপনার ব্লগ এর একজন নিয়মিত পাঠক। আমার তো মনে হয় আপনি একমাত্র বাংলাদেশীয় নিরিশ্বরবাদী ব্লগার, যাকে আমি খুব সম্ভবত পছন্দ করি। আমি প্রচন্ড বিশ্বাসী এবং প্রচন্ড ধার্মিক একজন মানুষ। ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হাদীসের উপর অনার্স করছি। আপনার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমার ব্যাপক দ্বিমত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরোধও রয়েছে। তবে আপনার ইতিহাস নির্ভর তথ্যসূত্র সমৃদ্ধ লেখনী গুলোর আমি নিয়মিত পাঠক, আমার ভালো লাগে।এক বছর ধরে ভাবছি কমেন্ট করবো, অবশেষে! আপনার জন্য শুভকামনা রইল। আপনি ইশ্বরবাদীদের আরো নিকটবর্তী হবেন এই কামনায়।

    Like

Leave a reply to Abu Jubayear Fahim Cancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.