২৫শে মার্চ রাত: শেখ মুজিব, বেগম মুজিব, মেজর জিয়া ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যতগুলো তর্ক ও বিতর্ক বিদ্যমান তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্ক হল ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা। ধারণা করা যায়, এই বিতর্ক কেয়ামত পর্যন্ত  চলমান থাকবে। শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হলেও পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের পূর্বে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন কিনা তা কখনো শেখ মুজিব নিজে, তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজন, এমনকি তার সহধর্মিণী স্ত্রী বেগম মুজিবও বলেননি। অথচ ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত ২৬শে মার্চ আসলেই পত্রিকার পাতায় ৭১ সালের  মার্চ মাসের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করা হত। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, অনেকেই শেখের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল, আর তাদের একজন ছিলেন নূরুল হক। যাকে ২৯শে মার্চে পাকিস্তানীরা মেরে ফেলে। একাত্তরে এ কে এম নূরুল হক ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান বেতার বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী (বেতার)। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে এ কে এম নূরুল হক পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব পরিত্যাগ করেছিলেন। এ ছাড়া এমন কথা প্রচলিত আছে যে ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদ লিখিত নেতা ও পিতা বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহযোগী হাজি গোলাম মোর্শেদের সাক্ষাৎকারে এ সম্পর্কে কিছু তথ্য রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এরপর এগারোটা বেজে গেল, বারোটা বাজে বাজে এমন সময় একটি টেলিফোন আসল, বলে আমি বলধা গার্ডেন থেকে বলছি। মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছে। মেশিনটি কী করব? আমি দৌড়ে মুজিব ভাই-এর কাছে গেলাম, বললাম ম্যাসেজ পাঠানো হয়ে গেছে। উনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন, মেশিনটি ভেঙে ফেলে পালিয়ে যেতে বলো।’

৭২ সালে বেগম মুজিব বর্ণনা করেছিলেন ১৫শে মার্চ রাতে শেখ মুজিব কীভাবে গ্রেফতার হলেন। কিন্তু তার কোন বর্ণনায় শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ নেই। এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও সর্বাধিনায়ক জেনারেল ৭২ সালের মার্চ মাসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুধু ৭ই মার্চের শেখ মুজিবের ঘোষণার গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। প্রশ্ন আসে ৩২ নাম্বার থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কথা বেগম মুজিবও কেন জানলেন না। দলের বড় নেতাও জানলেন না। এছাড়া শেখ মুজিবের ঘোষণা দেওয়ার যে রেকর্ডের কথা শোনা যায় সেটি তো দেশবাসী কেউ শোনে নাই। এই কারণে মেজর জিয়াকে শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার বাড়তি প্রয়োজন পড়ে। লক্ষণীয় বিষয় হল, ৭২, ৭৩ ও ৭৪ সালে  স্বাধীনতা দিবস আসলেই জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস পত্রিকার প্রথম পাতায় বারে বারে পুনঃ-প্রচার করা হত আর সাথে থাকত জিয়াউর রহমানের ছবি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন অনেকেই (৭/8) তবে তাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও পরিচিত মুখ হলেন, তিনি মেজর জিয়া। এমনকি ৭৩ সালে জিয়ার বন্ধুরা পত্রিকায় একটি কলাম লেখার অনুরোধ করেন। এবং জিয়া ’আমাদের সেনা বাহিনী’ নামে একটি চমৎকার কলাম লিখে ফেলেন।

মার্চ মাসে শেখের পক্ষ থেকে জিয়ার ভাষণ জিয়াকে শুধু পরিচিত এনে দেয়নি, সেই সাথে জিয়ার ভাষণ আপামর জনসাধারণের মনে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিল। এর জন্য জিয়ার পরিবারকেও কম বিপদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। ২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে রোববারের দৈনিক বাংলা জিয়ার পরিবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে ছাপে- মেজর জিয়া যখন দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলেন তখন।

১৯৭২–৭৫ সাল পর্যন্ত মার্চ মাসে বিভিন্ন মানুষের স্মৃতিচারণ ও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেই আলাপের মধ্যে আমরা ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারি। ২৫শে মার্চ রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নাম্বারে কী হয়েছিল তার বর্ণনা দিয়েছিলেন বেগম মুজিব।

২৫শে মার্চ রাত নিয়ে পত্রিকায় বেগম মুজিবের স্মৃতিচারণ

প্রথম থেকেই ইয়াহিয়া পশুটাকে আমি বিশ্বাস করতাম নাঃ বেগম মুজিব

রোববারের দৈনিক বাংলা, ২৬শে মার্চ ১৯৭২

গত বছরের এই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গেলে প্রথমেই আমার মন কেঁদে ওঠে। সেই ভয়াল ২৫শে মার্চের কালো রাত থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দেশের পরিজনহারা লাখো লাখো পরিবারের কথা ভেবে অশান্ত হয়ে ওঠে মন। তাই পৃথক করে হিংস্র ঐ রাতের কোন কথা বলতে বা ভাবতে আমার মন সায় দেয় না। বললেন শেখ ফজিলতুন্নেসা মুজিব। কথা বলছিলাম ৩২ নং রোডের সেই বাড়ীটাতে। একটা বছর আগের একরাশ স্মৃতির ছায়ায় বসে বেগম মুজিব বলছিলেন অবিস্মরণীয় সেই ২৫শে মার্চের রাত ও তারও আগেকার দিনগুলোর কথা।

অসহযোগ আন্দোলনের সেই অনন্য দিনগুলো। ধনী-দরিদ্র শিক্ষিত, অশিক্ষিত বাংলার মানুষ এক হয়ে গেছে। ঠিক এমনি মুহূর্তে আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে ইয়াহিয়া বাংলায় এলো। প্রথম থেকেই পাকিস্তানী নৃশংস এই পশুটাকে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না। আলোচনা বৈঠকের প্রথম থেকেই এক অশুভ কালো ছায়াকে আমি যেনো দেখতে পেয়েছিলাম সেদিনের জাগ্রত বাংলার অঙ্গনে। শেখ সাহেবকেও আমি বলেছিলাম যারা তাকে আগরতলা মামলায় জড়িয়েছে, তার ভালোভাবেই জানে যে শেখ সাহেব বাংলাদেশ আর বাঙালীদের চিন্তা- ভাবনাই করেন-পাকিস্তান প্রশ্নে তার আগ্রহ নেই। পাকিস্তানের ক্ষমতা তারা শেখ সাহেবকে দেবে না। কাজেই  আলোচনা আরম্ভ করে তারা অন্য কোন নতুন কৌশল বের করার সুযোগ খুঁজছে মাত্র। আমার কথা শেষ সাহের শুনলেন। মুখে কিছুই বললেন না। তিনি দলীয় নেতাদের বৈঠক ছাড়া বাইরে তেমন কিছু বলতেন না কখন।

গত বছর ২৫শে মার্চে’র সকাল থেকে বাড়ীর অবস্থা ভার ভার লাগছিল। দুপুরে তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। আমাদের বাসার সামান দিয়ে সৈন্য বোঝাই দুটো ট্রাক চলে গেল। দোতলা থেকেই ট্রাকগুলো দেখে আমি নীচে নেমে এলাম। শেখ সাহেব তখনও আগত লোকদের সাথে কথাবার্তায় ব্যস্ত। তাঁকে ভেতরে ডেকে মিলিটারি বোঝাই গাড়ী সম্বন্ধে বলতেই দেখলাম পলকের তরে মুখটা তাঁর গম্ভীর হয়ে গেল। পরক্ষণেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। সমস্ত দিনটা কেটে গেল থমথমে- ভাবে। এলো রাত। সেই অশুভ রাত সাড়ে আটটায় তিনি সাংবাদিকদের বিদায় দিলেন। আওয়ামী লীগ সহকর্মীদেরও কিছু কিছু নির্দেশ দিয়ে দ্রুত বিদায় দিলেন।

রাত প্রায় ১০টার কাছাকাছি কলাবাগান থেকে এক ভদ্রলোক এসে শেখ সাহেবের সামনে একেবারে আছড়ে পড়লেন। তাঁর মুখে শুধু এক কথা- আপনি পালান। বঙ্গবন্ধু পালান। ভেতর থেকে তার কথা শুনে শঙ্কিত হয়ে উঠলো আমারও মন। বড় মেয়েকে তার ছোট বোনটা-সহ তার স্বামীর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলাম। যাবার মুহূর্তে কি ভেবে যেনো ছোট মেয়েটা আমাকে আর তার আব্বাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। শেখ সাহেব তার মাথায় হাত বুলিয়ে শুধ, বললেন-বিপদে কাঁদতে নেই মা।

তখন চারিদিকে সৈন্যরা নেমে পড়েছে। ট্যাঙ্ক বের করেছে পথে। তখন অনেকেই ছুটে এসেছিল ৩২নং রোডের এই বাড়ীতে। বলেছিল- বঙ্গবন্ধু, আপনি সরে যান। উত্তরে দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়েছিলেন তিনি- না, কোথাও আমি যাবো না।

দ্রুত ১০টা থেকেই গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। দূর থেকে তখন গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। দেখলাম প্রতিটি শব্দ-তরঙ্গের সাথে সাথে শেখ সাহেব সমস্ত ঘরটার মাঝে পাইচারী করছিলেন। অস্ফুটভাবে তিনি বলছিলেন-এভাবে বাঙালীকে মারা যাবে না-বাংলা মরবে না। রাত ১২টার পর থেকেই গুলির শব্দ এগিয়ে এলো। ছেলেমেয়েদের জানালা বন্ধ করতে যেয়ে দেখতে পেলাম পাশের বাড়ীতে সৈন্যরা ঢুকে পড়েছে। স্পষ্ট মনে আছে এ সময় আমি বাজেয় মত এক ক্রুদ্ধ গর্জন শুনেছিলাম-গো অন, চার্জ………………..।

সেই সাথে সাথেই শুরু হল অঝোরে গোলাবর্ষণ। এই তীব্র গোলাগুলির শব্দের মধ্যেও অনুভব করলাম-সৈন্যরা এবার আমার বাড়ীতে ঢুকেছে। নিরুপায় হয়ে বসেছিলাম আমার শোবার ঘরটাতে। বাইবে থেকে মুষলধারে গোলাবর্ষণ হতে থাকলে। এই বাড়ীটা লক্ষ্য করে। ওরা হয়ত এই ঘরের মাঝেই এমনিভাবে গোলাবর্ষণ করে হত্যা করতে চেয়েছিল আমাদেরকে। এমনভাবে গোলাবর্ষিত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল সমস্ত বাড়ীটা বোধহয় খসে পড়বে। বারুদের গন্ধে মুখচোখ জ্বলছিল। আর ঠিক সেই দুরন্ত মুহূর্তটাতে দেখছিলাম ক্রুদ্ধ সিংহের মত সমস্ত ঘরটায় মাঝে অবিশ্রান্তভাবে পায়চারী করছিলেন শেখ সাহেব। তাকে ঐভাবে রেগে যেতে কখনও আর দেখিনি।

রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে ওরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে উপরে উঠে এলো। এতক্ষণ শেখ সাহেব ওদের কিছু বলেননি। কিন্তু এবার অস্থিরভাবে বেরিয়ে গেলেন তিনি ওদের সামনে। পরে শুনেছি সৈন্যরা সেই সময়ই তাঁকে হত্যা করে ফেলতো যদি না কর্নেল দু হাত দিয়ে তাকে আড়াল করতো। ধীর স্বরে শেষ সাহেব হকুম দিলেন গুলি থামাবার জন্য। তারপর মাথাটা উ’চা রেখেই নেমে গেলেন তিনি নীচের তলায়। মাত্র কয়েক মুহূর্ত। আবার তিনি উঠে এলেন উপরে। মেজ ছেলে জামাল এগিয়ে দিল তার হাতখড়ি ও মানিব্যাগ। স্বল্প কাপড় গোছানে। সুটকেস আর বেডিংটা তুলে নিল সৈন্যরা। যাবার মুহূর্তে একবার শুধু তিনি তাকালেন আমাদের দিকে। পাইপ আর তামাক হাতে নিয়েই বেড়িয়ে গেলেন তিনি ওদের সাথে। সোফার নীচ থেকে, খাটের নিচ থেকে, আলমারির পাশ থেকে বেড়িয়ে এলো কয়েকজন দল কর্মী। ওরা আস্তে আস্তে বলল- মাগো আমরা আছি। আমরা আছি। ওদের সকলের মাঝে দাঁড়িয়ে সে-রাতে কেঁদে ফেলেছিলেন বেগম মুজিব। বলে ছিলেন “খোদার কাছে হাজার শুকরান তোদের অন্তত ফেরত পেয়েছি। তোরা অন্তত ধরা পড়িস না।” এ পর্যন্ত বলেই তিনি শেষ করলেন সেই রাতটার কথা।

জিয়ার প্রথম স্বাধীনতার লড়াই

বেতার কেন্দ্রে শুধু জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নি, ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান, বেতার কর্মী আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, বেতার কর্মী আবদু্ল্লাহ আল ফারুক, সম্পাদক আব্দুস সালাম, প্রবাসী মাহমুদ হোসেনসহ আরও অনেকেই এই ঘোষণা পত্র পাঠ করেছিলেন। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপরিচিতি ও জনপ্রিয় হন মেজর জিয়া। ১৯৭২, ৭৩ , ৭৪ সালের ২৬শে মার্চ জিয়াউর রহমান কীভাবে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তা পত্রিকায় প্রকাশিত হত। সুতরাং জিয়ার কণ্ঠে কালুরঘাটের ঘোষণা পত্র পাঠ ও যুদ্ধ শুরু করার আহবান যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা সহজে অনুমেয়।

সেদিন চট্টগ্রামে যেমন করে স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়েছিল
রোববারের দৈনিক বাংলা, ২৬শে মার্চ ১৯৭২

”পঁচিশে মার্চে’র রাত। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে একটি ট্রাক। নৌবাহিনীর ট্রাক। ট্রাকের ওপর কিছু সংখ্যক নৌ’সেনা। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তাদের সাথে রয়েছে কিছু বাঙালী সৈন্য। ট্রাকের সামনে একজন পশ্চিমা সামরিক অফিসারের পাশে বসে রয়েছেন একজন বাঙালী মেজর। দৃষ্টি তার আনত। মনে হাজারো চিন্তার ঝড়।

ট্রাকটি ছুটছিল বন্দরের দিকে। ষোলশহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে। ছুটছিল তবে একটানা নয়। মাঝে মাঝেই বাধা পেয়ে থামতে হচ্ছিল ট্রাকটিকে। ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে সারা পথে অসংখ্য প্রতিরোধ।

আগ্রাবাদের ব্যারিকেডই সবচেয়ে বড়। সরাতে অনেক সময় লাগছিল সেনাবাহিনীর লোকদের। পশ্চিমা সামরিক অফিসারটি বসেছিলেন সামনের আসনে। বাঙালী মেজর নেমে পায়চারী করছিলেন রাস্তার ধারে। পায়চারী করছিলেন আর গভীর এক চিন্তা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। কি হতে যাচ্ছে? কেন তাকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কি এদের উদ্দেশ্য?

এমনি সময় ছুটে এল একটি ডজ গাড়ী। গাড়ী থেকে লাফিয়ে নামলেন একজন ক্যাপ্টেন। উত্তেজিত কণ্ঠে মেজরকে বলেন, পাকিস্তানী সৈন্যরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। গোলাগুলি ছুড়ছে। বহু লোক হতাহত হয়েছে। কি করবেন এখন?

মাত্র আধ-মিনিট। আধ-মিনিট চিন্তা করলেন বাঙালী মেজর। তারপর ঘোষণা করলেন -উই রিভোল্ট। রাত তখন সাড়ে এগারোটা।

বিদ্রোহ ঘোষণা করেই মেজর জিয়া সেই টাক নিয়েই ফিরে এলেন ষোলশহর ক্যান্টনমেন্টে। সঙ্গী পশ্চিমা সামরিক অফিসার ও নৌ-সেনেদের অস্ত্র সমর্পণে বাধা করে তাদের গ্রেফতার করলেন। তারপর ছুটে গেলেন অনেক দুষ্কর্মের হোতা অফিসার কমান্ডিং জানজুয়ার বাড়ীতে। ঘুম থেকে তুলে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন।

তারপর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকল বাঙালী সৈন্যকে একত্রিত করে জানালেন বিদ্রোহের কথা। তারা সবাই সমস্বরে সমর্থন জানালো বিদ্রোহের প্রতি। সমর্থন জানালেন মেজর জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি।

এই সৈন্যদের নিয়েই মেজর জিয়া বেরিয়ে পড়লেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। ঘাঁটি গাড়লেন কালুরঘাটে। তাঁদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে খান সেনারা।

এই ছিল বীর নগরী চট্টলার একাত্তরের ২৫শে মার্চের রাত। এই ছিল প্রতিবোধ সংগ্রামের প্রথম রাত। তবে এই শেষ নয়। এ ইতিহাসের শুরু কিন্তু এখানে নয়। এ প্রতিরোধের প্রস্তুতি আরো আগের। এ প্রতিরোধের শেষ স্বাধীনতায়।

এই স্বাধীনতার ঘোষণাই ধ্বনিত হয়েছিল মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। এ ঘোষণা তিনি করেন ২৭শে মার্চ’। এই ঘোষণায় তিনি বাংলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্যের আবেদন জানান বিশ্ববাসীর কাছে। আহ্বান জানান দেশবাসীর কাছে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার। ৩০শে মার্চ’ মেজর জিয়া এই বেতার কেন্দ্র থেকেই ঘোষণা করেন-বঙ্গবন্ধু, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই একটি বেতার ঘোষণায় মনোবল, ফিরে এসেছিল বাঙালীদের। আর থরথর করে কোপে উঠেছিল পশ্চিমা হানাদাররা। তাই তারা বিমান হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল এই বেতার কেন্দ্র।”

[৩০ মার্চ সকালের অধিবেশনে মেজর জিয়াকে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করতে শোনা যায়। ৩১ মার্চ নয়াদিল্লী থেকে প্রকাশিত স্টেটসম্যান পত্রিকা স্বাধীনতার ঘোষণ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। সংবাদে মেজর জিয়াকে বলা হয় ‘মেজর জিয়া খান’।]

জিয়ার স্বাধীণতার ঘোষণার পর তার পরিবারের সাথে যা হয়েছিল

প্রথমে মেজর জিয়া নিজেকে প্রেসিডেন্ট পরিচয় দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরে অন্যরা যখন শুধরে দেন তখন জিয়া নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কারণ সে সময় শেখ মুজিব ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। অন্যদিকে জিয়া ছিলেন সামান্য মেজর। স্বাধীনতার ঘোষনার কারণে বাঙালির মনে সাহস যে জেগেছিল সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই কারণে তার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনকেও ঝামেলায় পড়তে হয়। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের জন্যে পাকিস্তানী বাহিনী সব জায়গায় তল্লাসী শুরু করে। সেই ঘটনার একটা অংশ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়। ছবিতে খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানকে দেখা যাচ্ছে। অথচ এক সময় আওয়ামী লীগের গুজব সেল প্রচার করত যে কোকো পাকিস্তানীদের ফসল। যেহেতু খালেদা জিয়া পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী ছিলেন। যুদ্ধশিশুদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এটা তার একটা নমুনা।

রোববার দৈনিক বাংলা, ২ জানুয়ারী ১৯৭২

”বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীর নায়ক মেজর (বর্তমানে কর্নেল) জিয়া যখন হানাদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাদেরকে নাজেহাল করে তুলেছিলেন তখন তার প্রতি আক্রোশ মেটাবার ঘৃণা পন্থা হিসেবে খানসেনারা নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার আত্মীয়-স্বজন পরিবার-পরিজনের ওপর।

তাদের প্রতিহিংসার লালসা থেকে রেহাই পাননি কর্নেল জিয়ার ভায়রা শিল্পোন্নয়ন সংস্থার সিনিয়র কো-অর্ডিনেশন অফিসার জনাব মোজাম্মেল হক। চট্টগ্রাম শহর শক্রকবলিত হবার পর বেগম জিয়া যখন বোরখার আবরণে আত্মগোপন করে চট্টগ্রাম থেকে স্টিমারে পালিয়ে নারায়ণগঞ্জে এসে পৌঁছান তখন জনাব মোজাম্মেল হকই তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। সেদিন ছিল ১৬ই মে। ঢাকা শহরে ছিল কারফিউ। নারায়ণগঞ্জে সন্ধ্যা থেকে কারফিউ জারী করা হয়েছিল। এরই মধ্যে তিনি তার গাড়িতে রেডক্রস ছাপ এঁকে ছুটে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ টার্মিনালে।

বেগম জিয়াকে নিয়ে আসার দিন দশেক পর ২৬শে মে শিল্পোন্নয়ন সংস্থার সেক্রেটারি এই সংস্থার হক নাম সম্বলিত যত অফিসার আছেন সবাইকে ডেকে কর্নেল জিয়ার সঙ্গে কারোর কোন আত্মীয়তা আছে কিনা জানতে চান। জনাব মোজাম্মেল হক বুঝতে পারলেন বিপদ ঘনিয়ে আসছে। তিনি সেখানে কর্নেল জিয়ার সাথে তার আত্মীয়তার কথা গোপন করে অসুস্থতার অজুহাতে বাসায় ফিরে আসেন এবং অবিলম্বে বেগম জিয়াকে তার বাসা থেকে সরাবার ব্যবস্থা করতে থাকেন। কিন্তু উপযুক্ত কোন স্থান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ২৮শে মে তিনি তাঁকে ধানমন্ডিতে তার এক মামার বাসায় কয়েকদিনের জন্য রেখে আসেন এবং সেখান থেকে ৩রা জুন তাঁকে আবার জিওলজিকাল সার্ভের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জনাব মুজিবর রহমানের বাসা এবং এরও কদিন পরে জিওলজিকাল সার্ভের ডেপুটি ডিরেক্টর জনাব এসকে আবদুল্লাহর বাসায় স্থানান্তর করা হয়।

এরই মধ্যে ১৩ই জুন তারিখে পাকিস্তানী বাহিনীর লোকেরা এসে হানা দেয় জনাব মোজাম্মেল হকের বাড়ীতে। জনৈক কর্নেল খান এই হানাদার দলের নেতৃত্ব করেছিল। কর্নেল খান বেগম জিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং জানায় যে, এই বাড়ীতে তারা বেগম জিয়াকে দেখেছে। জনাব হকের কাছ থেকে কোন সদুত্তর না পেয়ে তার দশ বছরের ছেলে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ডন কর্নেল খানকে পরিস্কারভাবে জানায় যে, গত তিন বছরে সে তার খালাকে দেখেনি। সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলে খান সেনারা ব্যাপকভাবে তার বাড়ী তল্লাসি করে। কিন্তু বেগম জিয়াকে সেখানে না পেয়ে হতোদাম হয়ে ফিরে যায়। যাবার আগে জানিয়ে যায়, সত্যি কথা না বললে আপনাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হবে। এর পরই জনাব হক বুঝতে পারেন সর্বক্ষণ তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। যেখানেই যান সেখানেই তার পেছনে লেগে থাকে কেউ। এই অবস্থায় তিনি মায়ের অসুস্থতার নাম করে ছুটি নিয়ে নেন অফিস থেকে এবং সপরিবারে ঢাকা ছেড়ে যাবার ব্যবস্থা করতে থাকেন।

ব্যবস্থা অনুযায়ী ১লা জুলাই গাড়ী গ্যারেজে রেখে পেছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে তারা দুটি অটোরিকশায় গিয়ে উঠেন। উদ্দেশ্য ছিল ধানমণ্ডিতে বেগম জিয়ার মামার বাসায় গিয়ে আপাতত ওঠা। কিন্তু সায়েন্স ল্যাবরেটরী পর্যন্ত আসতেই একটি অটোরিকশা তাদের বিপল হয়ে যায়। এই অবস্থায় তারা কাছেই গ্রীন রোডে এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে ওঠেন। কিন্তু এখানে তাদের জন্যে অপেক্ষা করেছিল এক বিরাট বিস্ময়। জনাব হক এখানে গিয়ে উঠতেই তাঁর এই বিশিষ্ট বন্ধুর স্ত্রী তাকে জানান যে, কর্নেল জিয়ার লেখা একটি চিঠি তাদের হাতে এসেছে। চিঠিটা জনাব হককেই লেখা এবং এটি তার কাছে পাঠানোর জন্যে কয়েকদিন ধরেই তাকে খোঁজ করা হচ্ছে।

তার কাছে লেখা কর্নেল জিয়ার চিঠি এ বাড়ীতে কিভাবে এলো তা বুঝতে না পেরে তিনি যারপর নাই বিস্মিত হন এবং চিঠিটা দেখতে চান। তাঁর বন্ধুর ছেলে চিঠিটা বের করে দেখায়। এটি সত্যি কর্নেল জিয়ার লেখা কিনা বেগম জিয়াকে দিয়ে তা পরীক্ষা করিয়ে নেবার জন্যে তিনি তার বন্ধুর ছেলের হাতে দিয়েই এটি জিওলজিকাল সার্ভের জনাব মুজিবর রহমানের কাছে পাঠান।

এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় জনাব হক তার এই বন্ধুর বসায় রাতের মতন আশ্রয় চান। তাদেরকে আরো নিরাপদ স্থানে রাখার আশ্বাস দিয়ে রাতে তাদেরকে পাঠানো হয় সূত্রাপুরের একটি ছোট্ট বাড়ীতে। তার বন্ধুর ছেলেই তাদেরকে গাড়ীতে করে এই বাড়ীতে নিয়ে আসে। এখানে ছোট্ট একটি ঘরে তারা আশ্রয় করে নেন। কিন্তু পরেরদিনই তারা দেখতে পেলেন পাক-বাহিনীর লোকেরা বাড়ীটি ঘিরে ফেলেছে। জনা দশেক সশস্ত্র জওয়ান বাড়ীটার সামনে দাঁড়িয়ে। এই দলের প্রধান ছিল আরিফ। তারা ভেতরে ঢুকে কর্নেল জিয়া ও বেগম জিয়া সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জনাব হক ও তার স্ত্রী জিয়ার সাথে তাদের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে যান। কিন্তু ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ জনাব ও বেগম হকের সাথে তোলা বেগম জিয়ার একটি গ্রুপ ছবি বের করে দেখালে তারা জিয়ার সাথে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। তবে তাঁরা জানান কর্নেল ও বেগম জিয়া কোথায় আছেন তা তারা জানেন না।

এই পর্যায়ে বিকেল পাঁচটার দিকে জনাব হক ও তার স্ত্রীকে সামরিক বাহিনীর একটি গাড়িতে তুলে মালিবাগের মোড়ে আনা হয় এবং এখানে মৌচাক মার্কেটের সামনে তাদেরকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাড়িতে বসিয়ে রাখা হয়। এখানেই তাদেরকে জানান হয় যে বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপর তাদেরকে দ্বিতীয় রাজধানী এলাকা ঘুরিয়ে আবার সূত্রাপুরের বাসায় এসে ছেড়ে দেয়া হয়। এখান থেকে রাতে তারা গ্রীন রোডে জনাব হকের বন্ধুর বাসায় আসেন এবং সেখান থেকে ফিরে আসেন খিলগাঁয়ে তার নিজের বাসায়। উল্লেখযোগ্য যে এই দিনই জনাব এস এ আবদুল্লাহ সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকেও জিয়া ও জনাব আবদুল্লাহকে এবং এই একই সাথে জনাব মুজিবর রহমানকেও পাক বাহিনী গ্রেফতার করে। এবং ৫ই জুলাই তারিখে জনাব মোজাম্মেল হক অফিসে কাজে যোগ দিলে সেই অফিস থেকেই ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ তাকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।

ক্যান্টনমেন্টে তাকে এফআইইউ (ফিল্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট) অফিসে রাত দশটা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হয় এবং রাত দশটায় তাকে সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেলে প্রবেশের আগে তার ঘড়ি, আংটি খুলে নিয়ে নেয়া হয়। সারাদিন অভুক্ত রাখা হয়, সেলে তাকে কিছুই খেতে দেওয় হয়নি।

পরের দিন সকালে তাকে এক কাপ ঠাণ্ডা চা খাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাপ্টেন সাজ্জাদের অফিসে। সাজ্জাদ তার কাছে তার পরিকল্পনার কথা জানতে চায়। তিনি তার কোন পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেন। ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ তাকে মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করেন। এবং শাস্তি হিসেবে বৈদ্যুতিক শক দেবার হুমকি দেখায়। কিন্তু এর পর কোন কথা আদায় করতে না পেরে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ তাকে হাজার ভোল্টের উজ্জ্বল আলোর নীচে শুইয়ে রাখার হুমকি দেয়। হুকুম মত রাতে তাকে তার সেলে চিৎ করে শুইয়ে মাত্র হাত দেড়েক ওপরে ঝুলিয়ে দেয়। প্রায় চার ঘণ্টা এই অসহ্য যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হয়।

পরদিন তাকে আবার ক্যাপ্টেন সাজ্জাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সাজ্জাদ আবার তার পরিকল্পনার কথা জানতে চায়। জানতে চায় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার কি কি কথা হয়েছে, তিনি ভারতে চলে যাবার পরিকল্পনা করেছিলেন কিনা। জনাব হক এসব কিছুই অস্বীকার করলে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ তার ঘাড়ে প্রচণ্ড এক আঘাত হানেন। এর পর তার সেলে চল্লিশ ঘণ্টা হাজার ওয়াটের বাতি জ্বালিয়ে রাখার হুকুম দেয়।

বেলা একটায় তাকে সেলে এনেই বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ঘণ্টা কয়েক পরেই তিনি অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকেন। চিৎকার করে তিনি একটি কথাই বলতে থাকেন: আমার একবারেই মেরে ফেলে। এভাবে তিলে তিলে মেরো না। তিনি যখন অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করেছিলেন তখন তার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল একজন পাঠান হাবিলদার। তার এই করুণ আর্তিবোধ হয় হাবিলদার সইতে পারেনি। তারও হৃদয় বোধ হয় বেদনায় ভারাক্লান্ত হয়ে উঠেছিল মানুষের ওপর মানুষের এই নিষ্ঠুর জুলুম দেখে। আর তাই বোধ হয় সে সেন্টিকে ডেকে হুকুম দিয়েছিল বাতি নিভিয়ে দিতে। বলেছিল কোন জীপ আসার শব্দ পেলেই যেন বাতি জ্বালিয়ে দেয় আবার জীপটি চলে যাবার সাথে সাথেই যেন বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ তাকে আরো কয়েক দিন জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং নতুন ধরনের নির্যাতন চালায়। তার কাছ থেকে সারাদিন ধরে একটির পর একটি বিবৃতি লিখিয়ে নেয়া হয় এবং তার সামনেই সেগুলি ছিঁড়ে ফেলে আবার সেগুলি লিখতে বলা হয় এবং যথারীতি আবার তা ছিঁড়ে ফেলে আবার সেই একই বিবৃতি তাকে লিখতে বলা হয়। এই অবস্থায় শাস্তি ও অবসন্নতায় তিনি লেখার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। এদিকে হাজার ওয়াটের উজ্জ্বল আলোর নিচে থাকার ফলে তিনি দৃষ্টিশক্তিও প্রায় হারিয়ে ফেলেন। দিন ও রাতের মধ্যে কোন পার্থক্যই বুঝতে পারতেন না।

২৬শে জুলাই বিকেলে তাকে ইন্টার স্টেটস স্কিনিং কমিটির (আইএসএসসি) ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে একটি ছোট্ট কামরায় তাকে মোট ১১০ জন আটক ছিলেন। বিকেল পাঁচটার দিকে তাকে বের করে রান্নাঘরের বড় বড় পানির ড্রাম ভরার কাজ দেয়া হয়। এই কাজে আরো একজনকে তার সাথে লাগানো হয় । তিনি হচ্ছেন জিওলজিক্যাল সার্ভের জনাব এসকে আবদুল্লাহ। তারা দুজনে প্রায় সোয়া মাইল দূরের ট্যাপ থেকে বড় বড় বালতিতে করে পানি টেনে তিনটি বড় ড্রাম ভরে দেন। রাতে লাইন করে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে একজন একজন করে খাবার দেয়া হয়। এতদিন পরে এই প্রথম তিনি খেতে পান গরম ভাত ও গরম ডাল। পরদিন সকালে তার এবং আরো অনেকের মাথার চুল সম্পূর্ণ কামিয়ে দেওয়া হয়।

এখানে বিভিন্ন কামরায় তাকে কয়েকদিন আটকে রাখার পর ৬ই আগস্ট নিয়ে যাওয়া হয় ফিল্ড ইনভেস্টেগেশন সেন্টার (এফআইসি) মেজর ফারুকী ছিল এই কেন্দ্রের প্রধান এবং এখানে সকলের ওপর নির্যাতন করার দায়িত্বে নিযুক্তে ছিল সুবেদার মেজর নিয়াজী। ফারুকী এখানে তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাকে বিবৃতি দিতে বলে। কিন্তু বিবৃতি লেখার নাম করে সেই পুরনো নির্যাতন আবার শুরু হয়। একটানা তিন দিন ধরে তিনি একই বিবৃতি একের পর এক লিখে গেছেন এবং তারই সামনে তা ছিঁড়ে ফেলে আবার একই বিবৃতি তাকে লিখতে বলা হয়েছে।

৯ই আগস্ট তাকে দ্বিতীয় রাজধানীতে স্থানান্তরিত করা হয় এবং এখানে বিভিন্ন কক্ষে তাকে প্রায় দেড়-মাস আটক রাখার পর ২১শে সেপ্টেম্বর তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ৩০শে অক্টোবর তিনি মুক্তি পান। ইতোমধ্যে রাজাকাররা তিন-দফা তার বাড়ীতে হামলা চালিয়ে সর্বস্ব লুটপাট করে নিয়ে যায়। সবশেষে গত ১৩ই ডিসেম্বর তারা তার গাড়ীটিও নিয়ে যায়।

জনাব মোজাম্মেল হক মুক্তি লাভের পর ২রা নভেম্বর চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু জেনারেল নিয়াজীর নির্দেশে সামরিক আইনের ১৮ নম্বর বিধিবলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। এই চাকরি জনাব হক আজও ফিরে পাননি। এমনকি প্রেসিডেন্ট ফান্ড বা অন্য কোন সুযোগ সুবিধাও তাকে বরখাস্তের সময় দেয়া হয়নি। এবং এখনও তিনি এসব থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।”

২৫শে মার্চ নিয়ে শেখ মুজিব

২৫শে মার্চ নিয়ে বঙ্গবন্ধু কখনো বিস্তারিত বলেন নাই। ঐ গ্রেফতার হওয়ার আগে তার নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র নিয়েও তিনি কিছু বলেন নাই। এত বড় একটা ঘটনা অথচ কোন সাংবাদিক এই বিষয়ে তার কাছে বিস্তারিত জানতে চান নাই। ২৫শে মার্চ নিয়ে শেখ মুজিব শুধু নিজের পালিয়ে না যাওয়া না কথা বলছেন।

আজকের দিনটি আমি একান্তে অনুভব করতে চাইঃ বঙ্গবন্ধু

রোববারের দৈনিক বাংলা, ২৬শে মার্চ ১৯৭২

”আমার ছোট এই প্রতিবেদনটির জন্য গোড়াতেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। কেন না গতকাল তিনি আমাকে কোনরূপ সাক্ষাৎকার দেননি। প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে একটা বিশেষ সাক্ষাৎকার পাবার আশা নিয়ে। তখন সময় ছিল বিকাল ৫টা। আমার আসার উদ্দেশ্য জানাতেই বঙ্গবন্ধু স্নেহভরে হাসলেন, বললেন- লক্ষ বাঙালীর রক্তভেজা আজকের দিনটাতে কোন কথা বলার মত মনের অবস্থা আমার নেই। আমার সোনার বাংলার বুকের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই অশুভ লগ্নটাকে আমি একান্তভাবেই অনুভব করতে চাই।

দেখলাম প্রচণ্ড ব্যথায় মলিন হয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ। ঠিক এমনি মুহূর্তে শহীদ লে: কমান্ডার মোয়াজ্জেমের পত্নী ঘরে ঢুকলেন। পরনে সাদা কাপড়। মুখ বিষণ্ণ। ব্যথাভরা চোখে সেদিকে তাকালেন বঙ্গবন্ধু। কয়েক মুহূর্ত’। তারপরে যেনো আপনমনেই বলেন তিনি-ওকে আমি সেদিন সকালেই বলেছিলাম। এখান থেকে পালিয়ে যেতে। জানি না কেন গেল না। বেগম মোয়াজ্জেমের উত্তরের পূর্বেই আমি বলে ওঠলাম-আপনিও তো পালাতে পারতেন?

আমার কথার উত্তরে তিনি মাথা ঝাঁকালেন-‘না, পারতাম না। সাড়ে সাত কোটি সন্তানসহ কে আমাকে আশ্রয় দিতো বলো? তাই ঠিক করেছিলাম বাংলার মানুষের বদলে ওরা যদি আমার প্রাণটাকে দাবী করে, আমি তাই এগিয়ে দেবো।’

কথা বলতে বলতে উত্তেজিত দেখালো তাঁকে; বললেন- ওরা আমাকে মারেনি। আজ দুঃখ হয়। আমার দেশের শহিদ ভাইদেরও বিশ্বস্ত বঙ্গবন্ধু ছিলাম আমি। তবে কেন আমার লাশ মিশে গেলো না ওদের-লক্ষ শহীদের লাশের সাথে। মৃত্যুর মধ্য দিয়েও অন্তত আমার আত্মা সান্ত্বনা পেত। এখন লাখ লাখ শহীদের মাকে আমার বেচে থাকাটাই অপরাধ বলে মনে হয়।

৫টা বেজে গেছে। উঠে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধু। বেগম মোয়াজ্জেম তার স্বামীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ মহফিলে বঙ্গবন্ধুকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু, জিজ্ঞাসা করলেন তার সন্তানদের কথা- তার, কথা। স্নেহভরে আশ্বাস দিলেন তিনি ২৬শে মার্চ রোববারটাতে তাঁকে অত্যন্ত ব্যস্ত মুহূর্তের মাঝে কাটাতে হবে। তাও তিনি এক মুহূর্ত সময় করতে পারলেও সেখানে যাবেন।

আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বঙ্গবন্ধু বললেন- সাড়ে তিনটায় ফিরি ঘণ্টা খানেকের জন্য, ওদিকে রাত সাড়ে এগারোটার নীচে ফেরা সম্ভব হয় না। তবুও শান্তি পেতাম দেশের লোকগুলোকে যদি দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতে পারতাম।”

পত্রিকায় জিয়ার কলাম

৭৩ সালে বন্ধুদের অনুরোধে কর্নেল জিয়া প্রথমবারের মতন পত্রিকায় কলাম লেখেন। কলামে জিয়া তার মিরিটারি জীবনের ইতিহাসের সাথে সাথে ৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তানে যুদ্ধে এবং ৭১ সালে বাঙালি সেনাদের সাহসিকতার ইতিহাস তুলে ধরেন। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত কলামের নাম ছিল ”আমাদের সেনা বাহিনী”। এখানে একটি কথা হয়তো বলা দরকার, উর্দু ও ইংরেজিতে শিক্ষা গ্রহণের ফলে স্বাভাবিকভাবে জিয়ার রহমান সাবলীলভাবে বাংলা লিখতে ও পড়তে পারতেন না। সুতরাং তার লেখাটি পত্রিকার পাতায় অনুবাদই বলা যায়। কিংবা অন্য কেউ বাংলায় কলাম লিখতে সাহায্য করেছেন। সেই কলামে জিয়া স্পষ্ট করে লিখছেন, জাতির জনকের আহ্বানে সৈনিকরা সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

২৫শে মার্চ নিয়ে ওসমানী

৭২ সালে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেরালে ওসমানী একটা সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি স্বাধীনতার যুদ্ধে ৭ই মার্চের ভাষণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

সেনাবাহিনীর বাঙালীরা মুক্তি সংগ্রামের জন্য উন্মুখ হয়েছিল- -ওসমানী

রোববারের দৈনিক বাংলা ২৬শে মার্চ ১৯৭২

”যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো- ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল।- বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চে’র এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্তরালে ছিল একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান সামরিক বাহিনীর বাঙালী সৈনিকদের কাছে ছিল বিরাট তাৎপর্যময়। বস্তুত এই আহ্বানকে তারা অস্ত্র তুলে নেবার আহ্বান বলেই মনে করে।

বাংলাদেশ সশস্ত্র-বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী গতকাল শনিবার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা। তিনি বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালীদের বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন আর দুর্দশার শিকার হয়ে থাকত হোত। তাদের মনে বিশেষ করে পাঞ্জাবীদের সম্পর্কে জেনারেল ওসমানী বলেন, এই সময় থেকেই আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের কথা চিন্তা করতে থাকি এবং এই কারণেই বাঙ্গালীদের দলে দলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকি। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সামরিক ট্রেনিং লাভের সাথে সাথে তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও অর্জিত হবে এবং বাঙ্গালীদের প্রতি পাকিস্তানীদের বিশেষ করে পাঞ্জাবীদের মনোভাব সম্পর্কে তাদের চোখও খুলবে বলে আমার ধারণা ছিল।

বাংলাদেশের যুদ্ধে পাকিস্তানের বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে জেনারেল ওসমানী বলেন, ওরা একটা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। ওরা চালাচ্ছিল ব্যাপক হারে গণহত্যা, নারী-নির্যাতন। পক্ষান্তরে বাঙ্গালিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একটি ন্যায় যুদ্ধে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় অবশ্যম্ভাবী।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাকিস্তানে সবসময়েই গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যে প্রথম থেকেই একটা চক্রান্ত চলেছে।  এই চক্রান্তের ফলশ্রুতি হিসেবে বাংলাদেশের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী ফলকে নস্যাৎ করা হয়েছে, ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারী করা হয়েছে এবং সবশেষে বাংলাদেশের নিরীহ জনসাধারণের ওপর নৃশংস হামলা চালান হয়েছে।”

সুতরাং পরিশেষে বলতে হবে, স্বাধীনতার জন্য পুরো জাতি মুখিয়ে ছিল। ৭ই মার্চের শেখ মুজিবের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পরও যারা স্বাধীনতার ইস্যুতে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন তারা ২৫শে মার্চের সেই কাল রাত্রিরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হামলা দেখে স্বাধীনতার বিষয়ে আর আপোষ করেননি। গ্রেফতারে আগে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান, এই কথা পত্রিকার পাতায় ৭৩ সালে লেখা হলেও কীভাবে কার মাধ্যমে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ অন্যদের মাঝে প্রচার করা হল পত্রিকায় এমন কোন বর্ণনা নেই। নেই পূর্ব পাকিস্তান বেতার বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী (বেতার) নূরুল হকের কথা। সুতরাং শেখ মুজিব নিজের কণ্ঠে নাকি তার নামে কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন তা নিয়ে একটা ধোঁয়াশা থেকেই গেছে। এছাড়া মহিউদ্দিন আহমদের ‘যুদ্ধদিনের কথা’ বইতে জানতে পারি, শেখ মুজিব কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় নিতে চাই নাই। তেহরিক-ই-ইস্তিকলালপার্টির সভাপতি এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খানের সাথে বেশ কয়েকবার বৈঠকে বসেন। এক আলোচনায় মুজিব কান্নাভেজা কন্ঠে তাকে বলে যে সে একজন দেশপ্রেমিক, সে একজন পাকিস্তানি এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছে ও পাকিস্তানি পতাকা হাতে নিয়ে ‘বান করে রাহেগা পাকিস্তান ‘ স্লোগান দিয়েছে। মুজিব আরো বলে যে সে পাকিস্তান ভাঙতে চায় না। “পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় আমি নিতে চাই না।”

শেখ মুজিব কখনো বলেননি ২৫শে মার্চের রাতে গ্রেফতারের আগে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তবে শেখের নামে ঘোষণা যে হয়েছে এই বিষয়ে কোন ধোঁয়াশা নেই, এটাই ইতিহাস। আর শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া অনেক নায়কের মধ্যে অন্যতম হলেন মেজর জিয়াউর রহমান।

One comment

Leave a reply to quickly7b2691f642 Cancel reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.