১.
বিগত কয়েক বছর ধরে ডানপন্থী হিন্দু নেতাদের মুখে “রামরাজ্য” প্রতিষ্ঠার কথা শোনা যাচ্ছে। রাজা দশরথ ছিলেন অযোধ্যা নামক ছোট ও নগণ্য এক রাজ্যের রাজা । পরবর্তীতে ভরতের রাজত্বের শেষে শ্রী রাম সেই রাজ্যে রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এতো ছোট একটি রাজ্য কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল তার উত্তর হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের “রামায়ণ: খোলা চোখে” বইতে আছে।
প্রাচীনকালে আর্যরা কৃষি বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। কৃষি কাজের জন্যে জমির দরকার ছিল, ফলে বন উজাড় করা নিয়ে স্থায়ী অনার্যদের সাথে আর্যদের বিরোধ তৈরি হয়। আর্যরা অনার্যদের অসম্মানসূচক শব্দে ভূষিত করতেন! তাই তো রামায়ণে বানর, হনুমানের মতন উপাধিপ্রাপ্ত চরিত্রগুলো মানুষের মতন কথাবার্তা ও বীর ছিলেন। আর্যপুত্র শ্রী রামও কৃষি কাজ জানতেন, তাই তো রামায়ণে আছে শাপগ্রস্তা অহল্যা পাষাণী হয়ে পড়েছিল। রামের পদস্পর্শে অহল্যা প্রাণ পেলেন। অহল্যা কথাটির অর্থ হল যেখানে হল চলে না। অর্থাৎ পতিত জমি।
হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলছেন, “রামরাজ্য” কথাটি রামের সমসাময়িক কালেও ততটা প্রাধান্য পায়নি। এমনকি মহাভারতের যুগেও এর কোন প্রাধান্য ছিল না। মহাভারতে “রামোপাখ্যান” আছে কিন্তু “রামরাজ্যের“ কোন উল্লেখ নেই। রামরাজ্যের কথা প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে গুপ্তযুগ থেকে এবং এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। গুপ্তযুগে “রামরাজ্য” কথাটি প্রচারে বিশেষ কারণ ছিল। গুপ্তযুগ ছিল হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুত্থানের যুগ। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের তীব্র বিরোধ তখনও শেষ হয়ে যায়নি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক ছিলেন বৌদ্ধ। হিন্দুদের এমন কোন রাজা ছিলেন না। যিনি অশোকের সমপক্ষ হতে পারেন বা তাঁর ধারে কাছেও পৌঁছুতে পারেন। ধর্মরাজ্যের নায়ক মহাভারতের যুধিষ্ঠির দ্যূতাসক্ত ও অন্যান্য বহু দোষযুক্ত। রাজা হিসেবেও তিনি উল্লেখযোগ্য কোন র্কীতি স্থাপন করতে পারেননি। সুতরাং হিন্দু ধর্মের পুনরভ্যুত্থানের যুগে অশোকের সমকক্ষ আদর্শ রাজা হিসেবে রামচন্দ্রকে বেছে নেওয়া ছাড়া হিন্দুদের গত্যন্তর ছিল না। এই নির্বাচনে অশোক ও রামচন্দ্রের জীবনের একটি সাদৃশ্য বিশেষ সহায়ক ছিল। অশোক কলিঙ্গ দেশ জয় করেছিলেন অস্ত্রের সাহায্যে এবং সিংহল (লঙ্কা) বিজয় করেন মিত্রতার মাধ্যমে। বিপরীতভাবে, রামচন্দ্র কিষ্কিন্ধ্যা জয় করেন মিত্রতার মাধ্যমে এবং লঙ্কা অস্ত্রের সাহায্যে।
গত ২০ বছরে ভারতে প্রায় ৩ লক্ষ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। বিজেপির শাসনামলে ভারতের কৃষকদের ভাগ্যে পরিবর্তন ঘটেনি, আত্মহত্যাও থেমে নেই। কিন্তু হিসাব মতে রামরাজ্যের স্বপ্নবাজরা তো সবার আগে কৃষকদের পাশে থাকার কথা ছিল। কারণ “রামরাজ্য” তো ছিল কৃষি প্রধান রাজ্য! অথচ আমরা এই যুগে দেখতে পাচ্ছি, বেশিরভাগ রামভক্ত কৃষক নয় কর্পোরেট স্বার্থপন্থী।
২.
বাঙলা ভাষায় রামায়ণ, মহাভারতসহ অসংখ্য বইয়ের প্রথম অনুবাদ হয় সুলতান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়। এমনকি পুরো মধ্যযুগে বাংলাসাহিত্য চর্চা কেন্দ্রীভূত ছিল পূর্ববঙ্গের মাটিতে। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের দ্বারা দখলকৃত পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিদেরও তখন কাব্যচর্চার কেন্দ্র ছিল পূর্ববঙ্গ। কিন্তু হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দৃষ্টিতে বাঙলা ভাষা ছিল ম্লেচ্ছ জাতের ভাষা অর্থাৎ নিচু জাতের ভাষা । ব্রাহ্মণ্য হিন্দু শাসনামলে শিক্ষা ও ধর্মের বাহন রূপে এবং রাজ দরবারের ভাষা রূপে সংস্কৃতের অধিকার ছিলো একচ্ছত্র। সাধারণ মানুষের মুখের বাঙলা ভাষা লেখার মাধ্যম হিসাবে ছিলো অবহেলিত ও ঘৃণিত। সুলতানদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পুরাণ ও রামায়ণ বাঙলা ভাষায় অনুদিত হওয়ার পর বাঙলা ভাষার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করে ব্রাহ্মণরা ফতোয়া দিয়েছিল- যে মানব অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ স্লেচ্ছ ভাষায় শোনে, তার ঠাঁই হবে রৌরব নরকে।
এখানে কিছু কথা বলে রাখলে সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যুগের পরিবর্তনে বাংলা ভাষায় যখন ধর্মীয় পুস্তক লেখা শুরু হয় তখন ধর্মীয় প্রয়োজনের বাহিরে সাধারণত কেউ সাহিত্য রচনা করত না। ফলে অনেকের কাছে বাংলা ভাষায় লেখালেখি এক প্রকার হিন্দু ধর্ম কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এই কারণেই হয়তো বাংলা ভাষায় লেখালেখি হিন্দুয়ানী পরিচয় পায়! কারণ মুসলিমরা সাধারণত ফার্সিতেই বেশিরভাগ লেখালেখি করতেন। তবে পরবর্তীতে মুসলিমরা বাংলা ভাষায় লেখালেখিতে মনোযোগী হন।
যেমন- শায়েস্তা খানের দুই কন্যা ইরান দুখ্ত্ (যিনি পরী বিবি নামে খ্যাত) ও তুরান দুখত (বিবি বিবান) মার্জিত রুচি, শিক্ষা ও মানসিক উৎকর্ষের জন্য বিখ্যাত ছিল। মালিকা নামে একজন মুসলিম মেয়ের কথা জানা যায় যে ঘোষণা করেছিল যে তর্কযুদ্ধে যে পুরুষ তাকে পরাজিত করতে পারবে তাকেই সে বিবাহ করবে। মালিকা তার প্রতিজ্ঞাপালনে সক্ষম হোন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে নারী প্রতিভার নাম সে এই সময়কার বঙ্গদেশের ইতিহাসে পাওয়া যায় তা হল কবি রহিমুন্নেসা। রহিমুন্নেসা ‘পদ্মাবতী’ পুঁথিনামক কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা। পুঁথিটি ১৯৫০ সালে আবিষ্কৃত হয়। রহিমুন্নেসার বাড়ি ছিল চট্টগ্রাম, তিনি মাতার কাছে শিক্ষালাভ শুরু করেন। পরে পুরুষ শিক্ষকের কাছে পড়াশুনা চালিয়ে যান। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও একমাত্র পরিচিত মুসলিম মহিলা কবি হলেন রহিমুন্নেসা। তার রচনায় আরবি ও ফারসির প্রভাবে অধিক প্রভাবিত ছিল না। ১৮০০ খ্রি. কবি রহিমুন্নেসা মৃত্যুবরণ করেন।
কবি রহিমুন্নেসার পিতামহ ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চট্টগ্রামে অজ্ঞাতবাস বরণ করেন। তাই নিয়ে কবি লিখেছেন-
“অগ্রগামী হইয়া ইংরাজ যুদ্ধ দিল।
দৈবদশা ফিরিঙ্গীর বিজয় হইল।
মুখ্য মুখ্য সবের বহুল রত্নধন।
লুটিয়া করিল খয় যত পাপিগণ৷৷”
৩.
এই উপমহাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে একেক অবতার ও দেব-দেবীর পূজা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আবার অনেকের পূজা বন্ধও হয়েছে। ফলে একই দেবীর পূজা শত শত বছর ধরে একই ভাবে জনপ্রিয় তা ভাবার কোন কারণ নেই। উদাহরণ হিসাবে- বর্তমান জৌলুসহীন মনসা, ধরিত্রী দেবীর পূজা ও বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুর্গা পূজা।
মনসামঙ্গল কাব্য হলো মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় মঙ্গলকাব্য, যা দেবী মনসার কাহিনী নিয়ে রচিত। বেহুলা- লক্ষ্মীন্দরের কাহিনী এই মঙ্গলকাব্যের অংশ। এই অঞ্চলের মানুষকে যেহেতু কৃষিকাজ ও নদ-নদীর সঙ্গেই বেঁচে থাকতে হতো, তাই স্বাভাবিকভাবেই সাপের কামড়, রোগ বালাই বাঁচার জন্য মা মনসা ছিল তাদের এক আশ্রয়স্থল। তাই গ্রামবাঙলায় এই পূজার জনপ্রিয়তা ছিল। তবে বর্তমানে নগরায়নের ফলে মনসাদেবীর পূজার জনপ্রিয়তাও কমতে বসেছে।
প্রাচীন ভারতে, বিশেষ করে উত্তর ভারতে দেবী দুর্গা ছিলেন শক্তির প্রতীক। বাংলার মূল দেবতা ছিলেন স্থানীয় দেবদেবী, যেমন ধরিত্রী দেবী, মনসা, শীতলা ইত্যাদি। মধ্যযুগের বাংলায় হিন্দু রাজা ও ধনীদের মধ্যে দুর্গা পূজা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশদের আগমনের পর বাংলায় দুর্গা পূজার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ও নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে পূজা উদযাপন শুরু হয়। ফলে দুর্গা পূজা হয় বিভিন্ন পেশার মানুষের এক মিলন মেলা। পূজা শুধু উদযাপনেই থেমে থাকেনি, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জাতীয়তাবাদী নেতারা দুর্গা পূজাকে সাংস্কৃতিক ঐক্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে সমাজে শীতলা কিংবা মনসা দেবীর পূজার চাইতে দুর্গা পূজার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বহুগুণে বেড়ে যায়।
৪.
অবতার” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ “অवतরণ” থেকে, যার অর্থ “নামা” বা “নেমে আসা। ঈশ্বরের একটি রূপ পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় অবতার রূপে আর্বিভূত হন। হিন্দু ধর্মে অবতারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবতার হলেন- রাম ও শ্রীকৃষ্ণ। শ্রী রামের কাহিনী জানতে হলে আমাদের পড়তে হবে রামায়ণ আর শ্রী কৃষ্ণের কাহিনী আছে মহাভারতে। আর মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে জ্ঞান দিয়েছেন সেটির পুস্তক হল “গীতা”। রাম ও শ্রীকৃষ্ণ দুইজন অবতার হলেও তাদের জনপ্রিয়তা ও সমাজের উপর তাদের প্রভাব এক নয়। রাম অনেক প্রাচীন অবতার ফিগার। রামায়ণের কাহিনী মহাভারতের অনেক আগে হলেও এর ভাষা মহাভারতের চাইতে আধুনিক। কারণ রামায়ণ রচনার সময়কালে এটি মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল এবং পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করা হয়। ফলে সময়ের সাথে সাথে এটি আপডেট হয়। রামায়ণ শুধু ভারতবর্ষেই জনপ্রিয়তা পায়নি, বণিকদের হাত ধরে ভিনদেশের জনগণের কাছেও রামায়ণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ফলে মূল কাহিনী ঠিক থাকলেও বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রামায়ণের দেখা মেলে। অন্যদিকে মহাভারত বিভিন্ন সময়ে রচয়িত ও সংকলিত হয়। ফলে এর ভাষা মোটামুটি অবিকৃত থাকে।
রাম ও শ্রীকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা তফাৎ স্পষ্ট; রাম ভারত ও ভারতের বাহিরে সমানভাবে জনপ্রিয়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা শুধু ভারতে সীমাবদ্ধ। এছাড়া শ্রীকৃষ্ণ ও রামের চারিত্রিক গুণেও আছে ভিন্নতা। মহাভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র শ্রীকৃষ্ণ। তবে মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ এবং বৈষ্ণব পদাবলীর শ্রী কৃষ্ণের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ আছে। মহাভারতের কৃষ্ণ যে রাজনৈতিক চরিত্র তা বৈষ্ণব কবিদের আঁকা শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে তা পাওয়া যাবে না। কারণ কবিদের কৃষ্ণ প্রেমময় কৃষ্ণ, ভক্তিবাদের কৃষ্ণ। লায়লী মজনুর সেই জীবাত্মা ও পরমাত্মার ধারণাই কবিরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মহাভারতের কৃষ্ণ শক্তিমান ও রাজনৈতিক। যিনি অসহায় দ্রৌপদীকে বস্ত্রহরণ থেকে রক্ষা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অস্ত্রধারণ না করলেও তিনিই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলেন। এই কারণে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর গান্ধারী অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন; “স্বজন শ্মশানে কৃষ্ণ তুমি মরবে, তোমাকে মরতে হবে, মরতে হবে, একেবারে একা, অতি হীন মৃত্যু।” শ্রী কৃষ্ণ এই অভিশাপ মাথা পেতে নেন। বাংলাদেশে যে ইসকন নামে সংগঠনকে দেখতে পাই, সেটি এই কৃষ্ণ ভক্ত সংগঠন। যারা শ্রীকৃষ্ণকে সর্বোচ্চ পরমেশ্বর হিসেবে পূজা করে। ইসকনের মূল আধ্যাত্মিক ভিত্তি হল শ্রীমদ্ভাগবত গীতা (মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুনকে দেওয়া শ্রীকৃষ্ণের দার্শনিক জ্ঞান)। ইসকন রামকে অবতার হিসেবে সম্মান করেন। তবে ইসকন রাম নবমী, রামের জন্মতিথি পালন করে থাকলেও তাদের ভক্তিবাদের মূলভিত্তি শ্রীকৃষ্ণ কেন্দ্রিক। ইসকন সরাসরি রামভক্ত সংগঠন নয়।
অন্যদিকে শ্রী রাম এমন এক জনপ্রিয় প্রাচীন চরিত্র, যিনি পিতার দেওয়া প্রতিজ্ঞা ও সম্মান রক্ষার্থে রাজ সিংহাসন ছেড়ে স্বেচ্ছায় ১৪ বছর বনবাস বেছে নিয়েছেন। সৎ মাতার কাছে রাম যেহেতু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নয় সেহেতু তিনি ইচ্ছে করলে রাজ সিংহাসন ধরে রাখতে পারতেন। শ্রী রামের এমন ত্যাগ সনাতন সমাজে তাকে আইডল হিসাবে উপন্থাপন করে। পিতৃভক্তির এমন চরিত্র সমাজে জনপ্রিয় হবে এটাই স্বাভাবিক। আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তাঁর বিখ্যাত কবিতা “তুলু-ই-ইসলাম (উর্দু: طلوع اسلام) ” (ইসলামের উদয়) কবিতায় [কাব্যগ্রন্থ “বাঙ-ই-দারা (উর্দু: بانگ درا) ”] রামচন্দ্রকে “ইমাম ই হিন্দ” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, অর্থাৎ তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ন্যায়ের পথপ্রদর্শক বা নেতা। রাজগৃহে থেকে যাওয়ার সুযোগ থাকার পরও স্বামীর সঙ্গে সীতা বনবাসের সঙ্গী হলেন। এই কারণে সবসময় রামের সাথে সীতার নাম উচ্চারণ করা হয়। অনেকে হয়তো জনপ্রিয় একটি ভক্তিমূলক ভজন শুনে থাকবেন- “রঘুপতি রাঘব রাজা রাম, পতিত পাবন সীতারাম”। এটি মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় প্রার্থনা ভজন ছিল। রাম প্রাচীনকাল থেকে সনাতন ধর্মের জনপ্রিয়।
বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে রামকে যেভাবে কলঙ্কিত করা হচ্ছে, বা রামের নামে যে অত্যাচার করা হচ্ছে সেটি অতীতে ‘দশরথ জাতক’ বই লিখে চরিত্র হরণ চাইতে কম নয়। অতীতে বৌদ্ধদের সাথে সনাতনীদের যখন বিরোধ চলছিল তখন বৌদ্ধরা ‘দশরথ জাতক’ নামক একটা বই রচনা করেন। “বৌদ্ধদের রচিত “দশরথ-জাতক”কে রামচন্দ্র লক্ষ্মণ ও সীতাকে যতদূর সম্ভব নিকৃষ্ট চরিত্র করে দেখানো হয়েছে।
৫.
“জয় শ্রীরাম জয় সীতারাম” ধ্বনি আজকে শুধু রাজনৈতিক চেতনায় ‘জয় শ্রীরাম’ এসে থিতু হয়েছে। খেয়াল করুন, এই স্লোগানে মা সীতার নাম পুরোটাই গায়েব। মধ্যযুগে ভারতের উত্তরাঞ্চলে ভক্তি আন্দোলন ও কীর্তন সংস্কৃতিতে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান জনপ্রিয়তা পায়। তুলসীদাসের “রামচরিতমানস” রচনার পর রামের প্রতি সাধারণ মানুষের ভক্তি আরও প্রসার লাভ করে এবং “জয় শ্রীরাম” স্লোগানটি লোকমুখে জনপ্রিয়তা পায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী “রাম নাম”কে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় ব্যবহার করলেও “জয় শ্রীরাম” স্লোগান হিসেবে জনপ্রিয়তা পায় নাই। এছাড়া বাঙলার হিন্দুরা রামের সাথে সবসময় সীতার নাম উচ্চারণ করেন। এমনকি গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে রামের সাথে সীতার ছবি সবসময় শোভা পেত।
১৯৮০-৯০-এর দশকে ভারতের রাজনীতিতে “জয় শ্রীরাম” স্লোগানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবং বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার প্রেক্ষাপটে এটি একটি রাজনৈতিক স্লোগানে ব্যবহৃত হতে থাকে। ফলে জয় শ্রীরাম স্লোগান এখন শুধু ধর্মীয় ভক্তি প্রদর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীকও হয়ে উঠেছে। দুই বাঙলায় রাম ভক্তের সংস্কৃতি ও ভক্তি কোনটি নতুন নয়। কারণ সনাতনীদের সাথে রাম-সীতা কোননা কোনভাবে জড়িত। কিন্তু রাস্তায় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান যে শুধু আর ধর্মীয় স্লোগান নয় এটি স্পষ্ট। কারণ এই অঞ্চলে রামের সাথে সবসময় সীতাকে স্মরণ করা হয়। বুঝে হোক আর না বুঝে হোক মানুষ সবসময় ধর্মীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন, কিছুদিন আগে কালেমের পতাকা বলে কম বয়সী তরুণদের হাতে অনেকে বাল্কায়েদার পতাকা তুলে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের হিন্দু মুসলমানের দুই ধর্মের আইডিলজিতে একটা র্যাডিক্যাল চ্যাঞ্জ আসছে। অতীতে হিন্দুদের ঘরে রাম লক্ষণ সীতা ও হনুমানের যে ছবি দেখা যেত তাদে রাম লক্ষণের হাতে অস্ত্র থাকলেও তাদের অভিব্যক্তিতে ছিল দয়া, মায়া ও স্নিগ্ধতা। আর হনুমানজি তো হাত জোর করে হাঁটুর কাছে বসে থাকতেন। এমন ছবি যেকোনো ভক্তের মনে নম্রতার বার্তা দেয়। কিন্তু আজকের অনলাইনের যুগে যে রামকে দেখা যায় তিনি মূলত আলফা মেলের ইমেজের রাম। যিনি বডি বিল্ডারদের মতন পেশিবহুল শরীরের অধিকারী। আর সীতাহীন রামের সেই রামের একাকী ছবিতে চেহারায় দয়া-মায়ার বদলে ক্রোধ ফুটে উঠে। আর হাতজোড় করে থাকা বিনয়ী হনুমানজির ছবি হাজির হয়েছে ক্ষিপ্ত হনুমান রূপে। এগুলো কোনটাই কাকতালীয় না, এগুলো সমাজ ও ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব। একই কারণে ধর্মীয় মাহফিলে আমরা দয়া মায়ার পরিবর্তে ঘৃণা আর উস্কানির বয়ান পাই।
এটি অস্বীকার করার করার উপায় নেই যে- বাংলাদেশের অনেক শিক্ষিত হিন্দু তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। অনেকে ধর্মীয় রীতিনীতির বদলে বিজেপির আদর্শের প্রতি ইমান এনেছে। এইক্ষেত্রে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের বাহিরে ধর্মীয় অজুহাতে হামলা বা ২১ সালের রক্তাক্ত শারদের মতন ঘটনা ফুয়েল হিসেবে কাজ করেছে। ডানপন্থী রাজনীতির বীজ যে শুধু হিন্দুদের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছে তা হয় মুসলিমদের মধ্যেও হয়েছে। ফলে বাংলার সাধারণ মানুষের বিপদ আসলে দুই দিকে। জাতীয়তাবাদ যেমন বিভিন্ন ধর্মের বর্ণের মানুষকে একটি গণ্ডিতে নিয়ে আসে, তেমনি রাজনৈতিক স্লোগান বা ঐতিহাসিক কোন ফিগার বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে এক এক কাতারে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। শ্রী রাম যেহেতু জনপ্রিয়, পরিচিত ও ভক্তিবাদের প্রতীক ফলে এই নামে মানুষকে আকর্ষণ করাও সহজ। তবে যারা হিন্দুত্ববাদ বিরোধী তাদের একটি বিষয় স্পষ্টত স্মরণ রাখা দরকার, রামভক্ত মানে ডানপন্থী রাজনীতি না। ডানপন্থী হিন্দুদের জন্য রাম শুধু ভক্তি নয়, রাজনীতির প্রতীকও বটে। কিন্তু একজন সাধারণ ধার্মিক ও ভক্তের কাছে রাম হলেন- পতিত পাবন সীতারাম। অর্থাৎ যিনি (সীতা ও রামের একত্রিক রূপ) পতিত বা পাপী মানুষদেরও উদ্ধার করেন এবং পবিত্র করেন। সুতরাং যারা রামভক্ত যাদের উচিত জয় শ্রীরামের পরিবর্ততে “জয় শ্রীরাম জয় সীতারাম” স্লোগান দেওয়া। এতে রাজনৈতিক দলের আইডেনটিটি পলিটিক্সের সাথে নিজেদের সীমানা টেনে দেওয়া সম্ভব ।
৬.
“অখণ্ড ভারত” বলে কখনো কিছু ছিল না। বর্তমানে আমরা যে দেশ ও জাতীয়তাবাদের দুনিয়ার বাস করছি তার বয়সও চার’শ বছরের বেশি নয়। অতীতে মানুষ বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনেই বাস করত। আর এই সাম্রাজ্য দখলের জন্য বিভিন্ন শক্তি বিভিন্ন সময় একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, কেউবা বিদেশ থেকে এসে যুদ্ধে নেমেছে। তবে যেসব বিদেশী রাজা ও রাজপরিবার ভারতবর্ষে এসেছে স্থানীয়ভাবে বসবাস করেছে তারা ভারতবর্ষের সম্পদের মৌচাকে বসে মধু খেয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশদের মতন মৌচাক ধ্বংস করে সম্পদ পাচার করেনি। যেমন- মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনকাল নিয়ে আমরা আমরা যত আলোচনা-সমালোচনা করিনা কেন আমরা কখনো ব্রিটেনের উপনিবেশের মতন তাদের তুলনা করতে পারব না। দুটো সামান্য উদাহরণ দিই- পলাশী যুদ্ধের পর সিরাজউদ্দৌলার রাজকোষ থেকে পাঁচ কোটি টাকা পেয়েছিলেন লর্ড ক্লাইভ। তার আশা ছিল তিনি আরও বেশি পাবেন। আর যুদ্ধ জয়ের জন্য ক্লাইভের পাওনা হয়েছিল দু’লাখ ৩৪ হাজার পাউন্ড। আর এভাবেই রাতারাতি ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন হয়ে উঠলেন লর্ড ক্লাইভ। আর এই অঞ্চলে ব্রিটিশরা কীভাবে ব্যবসা ধ্বংস করেছিল তার উদাহরণ হল উইলিয়াম বোল্টস। “১৭৬০ সালে উইলিয়াম বোল্টস কোম্পানির চাকরিতে যোগদান করেন বাৎসরিক দুইশ টাকা বেতনে। ছয় বছর ব্যক্তিগত ব্যবসা করে তিনি উপার্জন করেন নয় লক্ষ টাকা। সিরাজুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, বোল্টস মোটেই সর্বোচ্চ মুনাফাখোরদের একজন ছিলেন না। আর কোম্পানি বা এর কর্মচারীরা এই বিপুল মুনাফা মোটেই দক্ষ ব্যবসায়ী হিসাবে আয় করেনি। সমকালীন প্রায় সব নথিপত্রেই দেখা যায়, শাসক হওয়ার ‘সুবিধা’ আর বলপ্রয়োগই তাদের বাণিজ্যের সারকথা। উল্লেখ করা দরকার, বাণিজ্য ও উৎপাদনের একচেটে অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ও কৌশলে পুরো উনিশ শতক জুড়েই বহাল ছিল। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন পর্বে স্থানীয় বণিকশ্রেণির সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আঁতাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে বণিক-শ্রেণি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পুরোনো ঐক্য তারা নষ্ট করে দেয়। এর ফলে দেশীয় রাজ্যগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধের শেষ সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু একবার ক্ষমতায় আরোহণের পর ভারতীয় পুঁজি ইংরেজদের কাছে কোনো সুযোগ তো পায়ইনি, বরং সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে ব্রিটিশরা অল্পদিনের মধ্যেই এই পুঁজিপতি শ্রেণিকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া এবং পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানীয় পুঁজি যে সুযোগ পেয়েছিল এখানে তাও পায়নি।” (বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ- মোহাম্মদ আজম)
অর্থনীতিবিদ উদয়ন পাটনায়েকের গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ ভারত থেকে আত্মসাৎ করেছে। এই সম্পদ পাচার হওয়ার সম্পদ দিয়েই ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়েছে অন্যদিকে ভারতবর্ষ হয়েছে গরীব। অথচ হিন্দুত্ববাদীরা ভারতবর্ষকে খুবলে খাওয়া, লুট করা উপনিবেশিক ইংরেজদের মুসলিম শাসকদের থেকে মুক্তির ত্রাতা হিসেবে কল্পনা করে। তবে এতে ব্রিটিশদের অবদান ও তাদের শিক্ষার প্রভাব কম নয়। ব্রিটিশরা এই অঞ্চল থেকে চলে গেছে কিন্তু তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও উপনিবেশ শিক্ষার উত্তরাধিকার হিসাবে অনেককে রেখে গেছে। আর তাদের মধ্যে হিন্দুত্ববাদীরা অন্যতম।
৭.
বাঙালি হিন্দুদের রামে কী মুক্তি মিলবে? অবশ্যই! তবে এই রাম আলফা মেল, পেশিবহুল শরীরের অধিকারী কাল্পনির রামে না। মানুষের মুক্তি মিলবে রামায়ণের সেই রামে যিনি পিতার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার জন্য,পিতার সম্মানের স্বার্থে যেমন রাজ সিংহাসন ছেড়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন নাই, একই সাথে ন্যায়ের জন্য রাবণের সাথে যুদ্ধ করতেও ছাড়েন নাই। এমনকি যুদ্ধের শেষ মুহূর্তেও তিনি রাবণকে অনুশোচনা করার এবং ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, যা তাঁর বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দেয়। এটাই অবতার রামের শিক্ষা। অথচ আজকে রাম ও মন্দিরের ছবিতে জুতা মারার পরও রাম ভক্তরা কেউ রাস্তায় একটা মানববন্ধন করতে সাহস পায় নাই। অথচ হিন্দু ধর্মে ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ হলেও, অন্যায়ের সামনে কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করাকে ভৎসনা করা হয়েছে। আজ কাপুরুষতাই যেন পরম ধর্ম!


ভাল বিশ্লেষণ করেছেন। হিন্দুরা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে ভয় পায় ইস্লামিষ্টদের সহিংসতার কারণে। এ সময় অনেক ক্ষেত্রে কোন সাধারণ মুসলমান ও এগিয়ে আসে না হিন্দুদের রক্ষা করতে। এটাও হিন্দুদের ভীরুতার একটি কারণ।
LikeLike